দুর্গাপূজার ছুটি ও বিচ কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় পর্যটকের ঢল
শারদীয় দুর্গাপূজা, টানা পাঁচ দিনের ছুটি এবং দুই দিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল ঘিরে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ছুটির গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে সব কক্ষ বুকিং হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। আয়োজক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের ধারণা, উৎসব ও ছুটি উপলক্ষে কুয়াকাটায় দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে। বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
টানা পাঁচ দিনের ছুটি, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর বিচ কার্নিভাল
মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটায় পর্যটকদের আগমনের সম্ভাবনা বেড়েছে। এর মধ্যে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দুই দিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির যৌথ আয়োজনে কার্নিভালে থাকছে স্থানীয় ও দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিচ ম্যারাথন, বিচ ফুটবলসহ নানা আয়োজন। এসব অনুষ্ঠান ঘিরে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, উৎসবের আয়োজন কুয়াকাটার পর্যটনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। কুয়াকাটা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আবাসিক হোটেল মালিক জহিরুল ইসলাম মিরন জানান, কুয়াকাটায় ৩০০টির বেশি আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা আছে। বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের অনেক বাসাবাড়িও হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
হোটেল সরোয়ার প্যারাডাইসের ব্যবস্থাপক রিপন সাব্বির বলেন, তাঁদের হোটেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। অনেকে ফোন করে কক্ষ চাইলেও সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের সহকারী ব্যবস্থাপক আল আমিন খান উজ্জ্বল জানান, তাঁদের কটেজ ও ভিলার প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে অবশিষ্ট কক্ষগুলোও বুকিং হয়ে যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
কিছু হোটেলে ভাড়ায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ছাড়
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএ মোতালেব শরীফ বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি কুয়াকাটায় পর্যটক আগমনের অন্যতম সময়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হলেও তৃতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর অনেক কক্ষ এখনো ফাঁকা রয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কিছু হোটেল কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছে। ফলে আবাসনের ধরন ও বাজেট অনুযায়ী পর্যটকদের সামনে বিভিন্ন বিকল্প থাকছে।
পর্যটকদের সেবায় প্রস্তুত হাজারো কর্মী
পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার কর্মীরাও প্রস্তুতি নিয়েছেন। হোটেল প্রেসিডেন্ট পার্কের স্বত্বাধিকারী ও কুয়াকাটা পৌর যুবদলের সভাপতি মো. কাজী ফারুক জানান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর প্রায় ১৬টি পেশার পাঁচ থেকে সাত হাজারের বেশি শ্রমিক পর্যটকদের সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। এ ছাড়া শতাধিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের পাশাপাশি পর্যটন খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও দুই শতাধিক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তা ও সৈকতের পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ প্রস্তুতি
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সৈকতের পরিবেশ সুন্দর রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক সোমবার বিকেলে মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সৈকত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখতেও কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, দুর্গাপূজার ছুটি ও বিচ কার্নিভাল উপলক্ষে কুয়াকাটাকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। মহিপুর থানা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি
ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশ ও বন বিভাগের পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, বিচ কার্নিভালে স্থানীয় ও দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী এবং চলচ্চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজন ঘিরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার ছুটি ও বিচ কার্নিভালকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটার পর্যটন খাতে ব্যস্ততা বেড়েছে। আগাম বুকিং, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা, কর্মীদের প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এই পর্যটননগরী।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]