হোয়াটসঅ্যাপ কি আপনার তথ্য বিক্রি করে, জানুন আসল সত্য
প্রতিদিনের ব্যক্তিগত কথোপকথন, ছবি, ভিডিও কিংবা জরুরি নথি আদান-প্রদানে হোয়াটসঅ্যাপ এখন অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। পরিবার, বন্ধু থেকে শুরু করে অফিসের কাজ—সব ক্ষেত্রেই জনপ্রিয় এই বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ ব্যবহার করছেন কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু অ্যাপটিতে ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ? হোয়াটসঅ্যাপ কি ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করে, নাকি সেগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে?
হোয়াটসঅ্যাপে ব্যক্তিগত বার্তা ও কলের নিরাপত্তায় রয়েছে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রযুক্তি। এর ফলে সাধারণ ব্যক্তিগত চ্যাট ও কলের বিষয়বস্তু কেবল প্রেরক ও প্রাপক দেখতে বা শুনতে পারেন। হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাও সাধারণভাবে এসব বার্তার বিষয়বস্তু পড়তে পারে না। তবে এই সুরক্ষা থাকার অর্থ এই নয় যে ব্যবহারকারীর অন্য কোনো তথ্য সংগ্রহ করা হয় না।
অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, সেবা সচল রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত ও কারিগরি তথ্য সংগ্রহ করে। কিছু ক্ষেত্রে মেটার অন্যান্য সেবার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানও হতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহ, তথ্য শেয়ার এবং তথ্য বিক্রির মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।
কী কী তথ্য সংগ্রহ করে হোয়াটসঅ্যাপ?
হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের সময় বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য, অ্যাপ ব্যবহারের সময় তৈরি হওয়া কারিগরি তথ্য এবং অন্য ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া কিছু তথ্য। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ফোন নম্বর দিতে হয়। এ ছাড়া প্রোফাইলের নাম, ছবি ও ব্যবহারকারীর দেওয়া অন্যান্য তথ্যও সেবাটির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। অ্যাপ সচল রাখতে ডিভাইসের ধরন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইপি ঠিকানা, ব্যবহারের সময়সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য কারিগরি তথ্যও প্রক্রিয়াকরণ করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যবহারকারীর ফোনের কন্ট্যাক্ট তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের তথ্যও নির্দিষ্ট অনুমতি ও ব্যবহৃত সুবিধার ভিত্তিতে প্রক্রিয়াকরণ হতে পারে। তবে ঠিক কোন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা নির্ভর করে অ্যাপের সংস্করণ, ব্যবহৃত সুবিধা, অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট গোপনীয়তা নীতির ওপর। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব তথ্য সংগ্রহের অর্থ এই নয় যে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত চ্যাটের সব কথাবার্তা পড়ে ফেলতে পারে। ব্যক্তিগত বার্তার বিষয়বস্তু এবং অ্যাপ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য এক বিষয় নয়।
মেটার সঙ্গে কি আপনার তথ্য শেয়ার হয়?
হোয়াটসঅ্যাপ মেটার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ফলে সেবাটি পরিচালনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সুবিধা চালু রাখার জন্য মেটার সঙ্গে কিছু তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, হোয়াটসঅ্যাপের কোনো কনটেন্ট অন্য মেটা সেবায় শেয়ার করা হলে সেই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হতে পারে। আবার ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা মেটার বিভিন্ন সেবা ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও তথ্যের ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে। তবে মেটার সঙ্গে কিছু তথ্য শেয়ার হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো ব্যক্তিগত বার্তা পড়তে পারে। এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন চালু থাকা সাধারণ ব্যক্তিগত চ্যাট ও কলের বিষয়বস্তু এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—তথ্য সংগ্রহ, অন্য সেবার সঙ্গে তথ্য শেয়ার এবং তথ্য বিক্রি এক নয়। হোয়াটসঅ্যাপ তথ্য সংগ্রহ করে বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শেয়ার করে বলেই ব্যবহারকারীর সব ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
ব্যক্তিগত বার্তা কতটা নিরাপদ?
হোয়াটসঅ্যাপের ব্যক্তিগত বার্তা ও কলে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহৃত হয়। এ প্রযুক্তিতে বার্তা প্রেরকের ডিভাইস থেকে এমনভাবে সুরক্ষিত থাকে যে নির্ধারিত প্রাপক ছাড়া অন্য কেউ সাধারণভাবে তার বিষয়বস্তু পড়তে পারেন না। এই সুরক্ষা ব্যক্তিগত লেখা, ছবি, ভিডিও, ভয়েস মেসেজ ও নথির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে ব্যবহারকারী নিজে বার্তা অন্য কাউকে দেখালে, প্রাপক স্ক্রিনশট নিলে কিংবা ডিভাইসের নিরাপত্তা ভেঙে কেউ প্রবেশাধিকার পেলে এনক্রিপশন একাই সব ধরনের ঝুঁকি ঠেকাতে পারে না।
এ ছাড়া চ্যাটের বিষয়বস্তু এনক্রিপ্ট করা থাকলেও অ্যাকাউন্ট ও সেবা ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত সব তথ্য একইভাবে সুরক্ষিত থাকে না। তাই শুধু এনক্রিপশন আছে জেনেই সব ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
গোপনীয়তা বাড়াতে যেসব সেটিংস কাজে আসবে
হোয়াটসঅ্যাপে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কারা দেখতে পারবেন, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। অ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সুবিধা পরিবর্তন করা যায়।
প্রোফাইলের তথ্য নিয়ন্ত্রণ: প্রোফাইল ছবি, ‘লাস্ট সিন’, অনলাইন থাকার তথ্য ও ‘অ্যাবাউট’ কারা দেখতে পারবেন, তা নির্ধারণ করুন।
গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অনুমতি: কে আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করতে পারবেন, তা নিয়ন্ত্রণ করুন।
ডিসঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ: নির্দিষ্ট সময় পর বার্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাওয়ার সুবিধা চালু করতে পারেন। তবে এতে অন্যের সংরক্ষণ করা কপি বা স্ক্রিনশট মুছে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
চ্যাট লক: গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন আলাদা করে লক করে রাখতে পারেন।
টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন: অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বাড়াতে এই সুবিধা চালু করুন এবং যাচাইকরণ কোড কাউকে দেবেন না।
অ্যাপ লক: ডিভাইস সমর্থন করলে আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনো অনুমোদিত পদ্ধতিতে অ্যাপে প্রবেশাধিকার সীমিত করুন।
নিয়মিত এসব সেটিংস পর্যালোচনা করলে ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো সম্ভব।
চ্যাটের ব্যাকআপেও কি ঝুঁকি আছে?
ফোন হারিয়ে গেলে কিংবা নতুন ডিভাইসে হোয়াটসঅ্যাপ চালু করলে পুরোনো কথোপকথন ফিরিয়ে আনতে চ্যাটের ব্যাকআপ কাজে লাগে। তবে ব্যাকআপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াটসঅ্যাপে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড ব্যাকআপ চালু করার সুবিধা রয়েছে। এটি সক্রিয় করলে ব্যাকআপের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে পাসওয়ার্ড বা ৬৪ সংখ্যার এনক্রিপশন কি ব্যবহার করা যায়। এতে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া ব্যাকআপের বিষয়বস্তু পড়া কঠিন হয়।
তবে এই পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন কি হারিয়ে গেলে ব্যাকআপ পুনরুদ্ধার করা কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হতে পারে। তাই নিরাপদ স্থানে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি। ব্যাকআপের এনক্রিপশন চালু আছে কি না, সেটিও সেটিংসে গিয়ে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
তাহলে হোয়াটসঅ্যাপ কি তথ্য বিক্রি করে?
প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে তথ্য সংগ্রহ, তথ্য শেয়ার এবং তথ্য বিক্রির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর কিছু তথ্য সংগ্রহ করে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মেটার অন্যান্য সেবা বা সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের সঙ্গে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও আদান-প্রদান করতে পারে। কিন্তু এ থেকেই ব্যবহারকারীর সব ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, ব্যবহার ও শেয়ার করা হয়, তা জানতে হোয়াটসঅ্যাপের হালনাগাদ গোপনীয়তা নীতি পড়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগাযোগ, অন্যান্য সেবায় তথ্য শেয়ার এবং ক্লাউড ব্যাকআপের ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য, তা বুঝে নেওয়া জরুরি।
ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নয়, ব্যবহারকারীরও। কোন তথ্য শেয়ার করছেন, অ্যাপকে কী অনুমতি দিচ্ছেন এবং অ্যাকাউন্ট কতটা সুরক্ষিত রাখছেন—এসব বিষয়ে সচেতন থাকলে ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
কালের আলো/এসএ/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]