এআই ব্যবসায় বড় বাজি মেটার, নতুন শেয়ার ও ‘মিউজ’ ঘিরে পরিকল্পনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করতে নতুন ধরনের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা করছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ করতে সক্ষম এআই এজেন্ট ‘মিউজ’কে ঘিরে বড় ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয়, নগদ অর্থপ্রবাহের চাপ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছে মেটা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন শ্রেণির নন-ভোটিং ক্লাস সি শেয়ার ইস্যু করার পরিকল্পনা করেছে মেটা। এই শেয়ারে ভোটাধিকার থাকবে না। নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অধিগ্রহণ, কর্মীদের ধরে রাখা এবং এআই খাতে বড় বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গের নিয়ন্ত্রণও অক্ষুণ্ন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছয় সপ্তাহে মিউজে ১ কোটি ব্যবহারকারী
মেটার নতুন এআই এজেন্ট অ্যাপ ‘মিউজ’কে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ। জাকারবার্গ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় চালুর ছয় সপ্তাহের মধ্যে ১ কোটির বেশি মানুষ মিউজে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন।
এআই এজেন্ট সাধারণ চ্যাটবটের মতো শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবহারকারীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা, তথ্য খোঁজা এবং একাধিক ধাপের কাজ এগিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরিই এ ধরনের প্রযুক্তির লক্ষ্য।
মেটার ধারণা, ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষ মিউজ ব্যবহার করতে পারেন। ব্যবহারকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়লে এই প্ল্যাটফর্মের বাণিজ্যিক মূল্যও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর তুলনায় মিউজ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বেশি আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাকারবার্গের ভাষ্য অনুযায়ী, মিউজ পরিচালনার ব্যয় মেটার অন্যান্য নতুন পণ্যের তুলনায় বেশি। ফলে ব্যবহারকারী বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত আয় তৈরির দিকেও নজর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৭ সাল থেকে আয়ের আশা
মেটার অর্থপ্রধান সুসান লি জানিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে এআই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত আয়ে অবদান রাখতে শুরু করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এই খাত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে বলে আশা করছে মেটা।
এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে উন্নত চিপ, বৃহৎ ডেটা সেন্টার এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে এই বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের মূলধনি ব্যয়ের পূর্বাভাসও সংশোধন করেছে। আগে এ খাতে ১৩ হাজার কোটি থেকে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। নতুন পূর্বাভাসে ব্যয়ের সীমা ১৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আয় বাড়লেও নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ
মেটার আর্থিক ফলাফলে একদিকে আয় বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে এআই খাতে বিপুল ব্যয়ের প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মেটার আয় হয়েছে ৬৪৬০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের ৬৩৩৭ কোটি ডলারের পূর্বাভাসের চেয়ে এই আয় বেশি। বছরের শেষ প্রান্তিকে ৭৩০০ কোটি থেকে ৭৬০০ কোটি ডলার আয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে একই সময়ে নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে মেটার ফ্রি ক্যাশ ফ্লো বা ব্যয় ও বিনিয়োগের পর অবশিষ্ট নগদ অর্থপ্রবাহে ২১২ কোটি ডলারের ঘাটতি দেখা গেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সূচক ছিল ইতিবাচক ১০৬৩ কোটি ডলার। এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এআই ব্যবসায় ভবিষ্যতে বড় আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সেই লক্ষ্য অর্জনে এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
মেটাভার্সে কমছে গুরুত্ব?
মেটার রিয়ালিটি ল্যাবস বিভাগ ভার্চ্যুয়াল জগৎ বা মেটাভার্স প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। তবে এখন এআইসহ অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর রিয়ালিটি ল্যাবস বিভাগের লোকসান প্রায় ১৫০০ কোটি ডলারে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মেটা। বিনিয়োগ পুনর্বণ্টন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লোকসান কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বোঝা যায়, মেটার দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি কৌশলে এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে মেটাভার্সের মতো আগের উদ্যোগ থেকে সম্পদ সরিয়ে এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
এআই ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে মেটা। শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি মামলায় মেটাকে ২৫০০ কোটি ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আইনি চাপের পাশাপাশি এআই এজেন্টের নিরাপত্তা, ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। মিউজের মতো এআই এজেন্টকে ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ করার সুযোগ দিলে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের পরিধিও বাড়তে পারে। ফলে প্রযুক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তথ্যের সুরক্ষা, ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হবে।
এআইয়ে বিনিয়োগ কতটা সফল হবে?
মেটার সামনে এখন দুটি বড় লক্ষ্য—এআই প্রযুক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এবং বিপুল বিনিয়োগ থেকে টেকসই আয় নিশ্চিত করা। নতুন শেয়ার ইস্যুর পরিকল্পনা অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে পারে, আর মিউজের দ্রুত ব্যবহারকারী বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ ব্যবসার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে শুধু ব্যবহারকারী বাড়লেই এআই ব্যবসা লাভজনক হবে না। প্রযুক্তি পরিচালনার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জন এবং নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ঝুঁকি মোকাবিলা করাও গুরুত্বপূর্ণ। মেটার নতুন পরিকল্পনা সফল হলে এআই প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। আর ব্যয় যদি আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার পাশাপাশি আর্থিক চাপ সামলানোও বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।
কালের আলো/এসএ/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]