কম্বোডিয়ায় ১০ দিনে বাংলাদেশিসহ ৭২১ বিদেশি বহিষ্কার
অবৈধ অভিবাসন, আন্তঃদেশীয় অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণা দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। দেশটিতে মাত্র ১০ দিনের বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশিসহ ২০ দেশের ৭২১ জন বিদেশি নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। বহিষ্কৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নারী রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বসবাস, অনলাইন প্রতারণা, জাল নথি ব্যবহার, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) কম্বোডিয়ার সংবাদমাধ্যম খেমার টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত টানা ১০ দিন এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারী বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
১০ দিনের অভিযানে ২০ দেশের নাগরিক বহিষ্কার
কম্বোডিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পরিচালিত এই অভিযানে মোট ২০টি দেশের নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন ইন্দোনেশিয়া, চীন, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ক্যামেরুন, জাপান, ঘানা, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, উগান্ডা, ভারত, মিয়ানমার, ফ্রান্স, লাইবেরিয়া, সুইজারল্যান্ড, উজবেকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের কারণে এসব বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযানের আওতায় অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পাশাপাশি বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী এবং অবৈধভাবে কাজ করা বিদেশিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের ফেরত
অভিযানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের বহিষ্কারের বিষয়টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন প্রতারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৯০ জন চীনা নাগরিককে বিশেষ বিমানে করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই অভিযোগে ৩৫৫ জন ইন্দোনেশীয় নাগরিককে টেকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বহিষ্কার করা হয়।
এই দুই দেশের নাগরিকদের বহিষ্কারের সংখ্যা মোট অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, অনলাইন প্রতারণা ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতারণার অভিযোগে বহিষ্কৃত হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা বলা হলেও প্রত্যেকের মামলার বিচারিক পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
জাল নথি থেকে মাদক কারবার, রয়েছে নানা অভিযোগ
বহিষ্কৃত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে শুধু অনলাইন প্রতারণার অভিযোগই ছিল না। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া, জাল নথি ব্যবহার, বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া কম্বোডিয়ায় অবস্থান এবং অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।এ ছাড়া অপহরণ ও চাঁদাবাজি, ভুয়া ভিসা কিংবা কিউআর কোড ব্যবহার এবং মাদক কারবারের মতো গুরুতর অভিযোগও অভিযানের আওতায় এসেছে।
এসব অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও বহিষ্কারের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। অভিবাসন আইন লঙ্ঘন, পরিচয়সংক্রান্ত জালিয়াতি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আসায় কম্বোডিয়ায় বিদেশিদের অবস্থান ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত নিয়ম প্রয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে দেশটিতে প্রবেশ, অবস্থান কিংবা কাজ করার অভিযোগের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচালিত অভিযান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সার সোখার নির্দেশনায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সোক ভেসনার তত্ত্বাবধানে বিভাগের তদন্ত ও পদ্ধতি বিভাগ বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। অভিযানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম যাচাই করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক সীমান্ত তল্লাশিচৌকিসহ বিভিন্ন পথে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের শনাক্ত করা, অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসন বিভাগের ভূমিকা এ অভিযানের মাধ্যমে সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে কম্বোডিয়া সরকার অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে।
কম্বোডিয়াকে অপরাধ ও প্রতারণার কেন্দ্র হতে দিতে চান না হুন মানেত
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জানিয়েছেন, দেশটিকে অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণার কেন্দ্র হতে দেওয়া হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাঁদের বহিষ্কারের বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা, জাল পরিচয় ব্যবহার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সংঘটিত অপরাধ অনেক ক্ষেত্রে একাধিক দেশের নাগরিক ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে। ফলে এসব অপরাধ মোকাবিলায় তদন্ত, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা
মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ২০ দেশের ৭২১ জন বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কারের ঘটনা কম্বোডিয়ার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমন কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার অবৈধভাবে অবস্থান, অনুমোদনহীন কর্মসংস্থান এবং অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে চীনা ও ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের বড়সংখ্যায় বহিষ্কার করার বিষয়টি এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। একই সঙ্গে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বহিষ্কারের ঘটনা বিদেশে অবস্থানরত অভিবাসীদের বৈধ কাগজপত্র, কাজের অনুমতি এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার গুরুত্বও সামনে এনেছে। তবে বহিষ্কৃত বাংলাদেশি নাগরিকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ ছিল এবং তাঁদের প্রত্যাবাসনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিবেদনে আলাদা করে তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। সূত্র: খেমার টাইমস
কালের আলো/এসএ/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]