মায়ের কানের দুল বিক্রির টাকায় শুরু, আজ ১০ জনের কর্মসংস্থানের পথপ্রদর্শক মিতু
ছবি সংগৃহীত
কোলে ছয় মাসের সন্তান, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সংসার ভাঙার কঠিন বাস্তবতা, আর্থিক সংকট আর সামাজিক কটূক্তি—সব মিলিয়ে জীবন তখন যেন এক অন্ধকার অধ্যায়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল, কিন্তু ছিল না পর্যাপ্ত অর্থ, ভালো কম্পিউটার কিংবা নিশ্চিত কোনো পথ। সম্বল বলতে ভাইয়ের একটি পুরোনো, প্রায় অচল ল্যাপটপ আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছাশক্তি।
সেই কঠিন সময়ে মেয়ের স্বপ্ন পূরণে নিজের কানের দুল বিক্রি করে দিয়েছিলেন মা। বলেছিলেন, ‘যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো।’ মায়ের সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই শুরু হয় মিতু আক্তারের নতুন পথচলা। ডিজিটাল মার্কেটিং ও সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) শেখার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু, সময়ের ব্যবধানে তা তাঁকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিংয়ের জগতে। এখন তিনি নিজেই একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি পরিচালনা করছেন, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন তরুণ-তরুণী।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও গ্রামের মিতু আক্তারের গল্প কেবল একজন ফ্রিল্যান্সারের সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার, মায়ের ত্যাগের মর্যাদা রাখার এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার গল্প।
ভাঙা ল্যাপটপেই স্বপ্নের প্রথম পাঠ
মিতু আক্তারের শৈশব কেটেছে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের বেজগাঁও গ্রামে। বাবা মো. আবুল হোসেন শেখ পেশায় সার্ভেয়ার বা আমিন। মা শিউলি বেগম সংসারের দেখভাল করতেন। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন মিতুর জীবনও অন্য অনেকের মতোই এগোচ্ছিল। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বিয়ে এবং পরের বছর ১০ অক্টোবর পুত্রসন্তান সাফাত নূর আলিফের জন্ম—জীবনে যুক্ত হয়েছিল নতুন দায়িত্ব। কিন্তু ২০১৯ সালের দিকে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হন তিনি। পারিবারিক টানাপোড়েনের একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। তখন ছেলের বয়স মাত্র ছয় মাস। সন্তানের দায়িত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চাপ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছিল তাঁকে।
উচ্চশিক্ষার সনদ না থাকায় প্রচলিত চাকরির বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করাও সহজ ছিল না। এর মধ্যে সামাজিক কটূক্তি ও নানা প্রতিকূলতা তাঁকে আরও কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে হার মানার পরিবর্তে ঘরে বসে শেখা ও কাজ করার পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। ২০২০ সালের শেষ দিকে ভাইয়ের একটি পুরোনো ল্যাপটপ অনেক অনুরোধ করে নেন মিতু। সেটি মেরামত করে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যে ল্যাপটপটি আবারও নষ্ট হয়ে যায়। নতুন করে কাজ শেখার স্বপ্ন তখন প্রায় থমকে যাওয়ার উপক্রম।
মেয়ের স্বপ্নে মায়ের কানের দুল
জীবনের সেই সংকটময় সময়ে মিতুর সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ান তাঁর মা শিউলি বেগম। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে মায়ের কাছে সাহায্য চান তিনি। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের কানের দুল বিক্রি করে সেই টাকা তাঁর হাতে তুলে দেন মা।
প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিতু আক্তার বলেন, ‘আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মাকে বোঝালাম যে আমাকে কোনোভাবে টাকার ব্যবস্থা করে দিলে আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করব। মা আমার কথায় কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের কানের দুল বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো।” সেদিন আমার মা-ই আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।’
মায়ের সেই ত্যাগ মিতুর কাছে কেবল আর্থিক সহায়তা ছিল না; ছিল নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখার শক্তি। সেই অর্থ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। পরে ক্রিয়েটিভ আইটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভর্তি হয়ে ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রশিক্ষণ নেওয়া থেকে শুরু করে বাস্তবে কাজ শেখা—প্রতিটি ধাপেই ছিল সীমাবদ্ধতা। কখনো প্রযুক্তিগত সমস্যা, কখনো আর্থিক অনিশ্চয়তা, আবার কখনো ব্যক্তিগত জীবনের চাপ। তবু শেখার আগ্রহ ধরে রাখেন মিতু।
প্রথম ১২০ ডলার বদলে দিল পথচলা
দক্ষতা অর্জনের পর আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভারে কাজ খুঁজতে শুরু করেন মিতু। একসময় ইতালির এক গ্রাহকের কাছ থেকে পান প্রথম কাজ। পারিশ্রমিক ছিল ১২০ ডলার। অঙ্কটি হয়তো অনেকের কাছে বড় কিছু নয়, কিন্তু মিতুর কাছে সেটিই ছিল নিজের চেষ্টায় আয় করার প্রথম বড় স্বীকৃতি। প্রথম কাজ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে তাঁর। অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাড়ে কাজের পরিধি, তৈরি হয় গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পেশাগত দক্ষতা। পরবর্তী সময়ে ফাইভারে লেভেল-২ পর্যায়ে পৌঁছান এবং আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে স্বীকৃতি পান।
মিতুর এই অগ্রযাত্রার পেছনে ছিল নিয়মিত শেখা, কাজের মান ধরে রাখা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে টিকে থাকতে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নতুন কৌশল শেখার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেন তিনি।
একসময় একা কাজ করার গণ্ডি পেরিয়ে একজন অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ জন তরুণ-তরুণী দূর থেকে কাজ করছেন। এসইও, গ্রাফিক ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন সেবা দিয়ে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ, যে নারী একসময় নিজের কাজ শেখার জন্য একটি সচল ল্যাপটপ জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছেন, তিনিই এখন অন্যদের কাজের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন।
থেমে থাকেনি পড়াশোনাও
জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি নিজের শিক্ষাজীবনও নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন মিতু। একসময় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাঁকে ভাবিয়ে তুললেও পরে সেটিকে আর বাধা হিসেবে দেখতে চাননি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। সন্তানের দায়িত্ব, পেশাগত কাজ এবং পড়াশোনা—তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।
মিতুর এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং জীবনের কোনো পর্যায়ে এসে নতুন করে শেখা শুরু করাও যে সম্ভব, তাঁর অভিজ্ঞতা সেটিই তুলে ধরে।
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মিতু বলেন, ‘আমার জীবনসংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে মনের জোর আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা পেরিয়েই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। আমি কেবল নিজের জীবনের অন্ধকারই দূর করিনি, সমাজের নানা ভ্রান্ত ধারণাকে উপেক্ষা করে নিজের পথ তৈরি করেছি।’
আত্মনির্ভরতার সঙ্গে ফিরেছে আত্মবিশ্বাস
মিতুর কাছে সাফল্য মানে শুধু ফ্রিল্যান্সিং থেকে আয় করা নয়; নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সামর্থ্য অর্জনও। তিনি জানিয়েছেন, বিচ্ছেদের পর বাবার বাড়িতে ফিরে না গিয়ে নিজেই বাসা ভাড়া নিয়ে ছেলেকে সঙ্গে রেখে জীবন শুরু করেন। সন্তানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে মায়ের কানের দুল আবার তৈরি করে দিয়েছেন। কিনেছেন একটি স্কুটি, শিখেছেন গাড়ি চালানো এবং সংগ্রহ করেছেন ড্রাইভিং লাইসেন্স। পাশাপাশি নিজের সঞ্চয় থেকে জমিও কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিগগিরই নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মিতু বলেন, ‘একসময় কাজের সূত্রে প্রতারণার শিকার হয়েছিলাম, চারপাশের সবাই যখন বলেছিল “তুমি পারবে না”, ঠিক তখনই নিজের ভেতরের শক্তিকে খুঁজে পেয়েছি। আজ আমার একমাত্র সন্তান সম্পূর্ণ আমার জিম্মায় এবং তার সব দায়িত্ব এখন আমার নিজের কাঁধে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রমাণ করে দিয়েছি যে পর্দা কোনো বাধা নয়, পর্দা রক্ষা করেও সফলভাবে কাজ করা যায়। … তবে আমি মেয়েদের বলব, কেউই সবকিছু জেনে জন্মগ্রহণ করে না। সময় ও অনুশীলনের মাধ্যমে যে কেউ শিখতে পারে।’
এবার অন্য নারীদের এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মিতু উপলব্ধি করেছেন, অনেক নারীই দক্ষতা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা সামাজিক বাধার কারণে কাজ শুরু করতে পারেন না। তাঁদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।
বিশেষ করে যেসব নারী ঘরে বসে কাজ শিখে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চান, তাঁদের মৌলিক ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা শেখানো ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছেন মিতু। তাঁর লক্ষ্য, নারীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, যাতে তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত শেখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা অর্জন করলে তরুণ-তরুণীরা পেশাগতভাবে এগিয়ে যেতে পারেন বলে মনে করেন মিতু। তবে এ জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন, কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মানসিকতা।
নিজের শেখার যাত্রায় ক্রিয়েটিভ আইটির অবদানের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, শেখার আগ্রহের পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেশাগত দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি কানের দুলের গল্প, অনেক দূর যাওয়ার প্রেরণা
মিতু আক্তারের জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত সংকট, আর্থিক অনিশ্চয়তা, নষ্ট ল্যাপটপ আর সামাজিক কটূক্তির মধ্যেও তিনি নিজের জন্য বিকল্প পথ খুঁজেছেন। মায়ের বিক্রি করে দেওয়া কানের দুলের অর্থ দিয়ে শেখার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন তাঁর নিজের পেশা গড়া এবং অন্যদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার গল্পে পরিণত হয়েছে। তবে তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং সংকটের মধ্যেও শেখার সুযোগ খুঁজে নেওয়া এবং নিজের অর্জনকে অন্যদের কাজে লাগানোর ইচ্ছা।
একসময় যাঁর সামনে প্রশ্ন ছিল কীভাবে নিজের ও সন্তানের দায়িত্ব সামলাবেন, আজ তাঁর সামনে নতুন লক্ষ্য—আরও বেশি নারীকে দক্ষ করে তোলা, তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি করা এবং আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করা।
মায়ের সেই কানের দুল তাই মিতুর কাছে এখন শুধু একটি স্মৃতি নয়; এটি তাঁর জীবনের এমন এক অধ্যায়ের প্রতীক, যেখানে বিশ্বাস, ত্যাগ আর অধ্যবসায় মিলে নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছিল।
কালের আলো/এসএ/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]