সৌদির কারাগারে হাজারো বাংলাদেশি, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের তথ্য খুঁজছে সরকার
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন। দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রায়ের অনুলিপি চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ওই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং কী কারণে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পায়নি ঢাকা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ গ্রহণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিস্তারিত জানতে চায় ঢাকা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে জানতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। নথি পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। সৌদি সরকার বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা বাংলাদেশকে পাঠায় উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ওই দুই বাংলাদেশির নাম তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে সরকার।
তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে। অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা বাংলাদেশের উদ্দেশ্য নয়। তবে বিদেশে কোনো বাংলাদেশি দণ্ডিত হলে, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা জরুরি। এ ধরনের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। সাজা মওকুফের সুযোগ থাকলে কূটনৈতিক চ্যানেলে সে বিষয়েও আলোচনা করা হয় বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ছয় মাসে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু
গত ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় নিহত হন বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদ। শুক্রবার সকালে তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। পরে মরদেহ ও সরকারের আর্থিক সহায়তা তাঁর স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শাহেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। তাঁর বাবা মো. রফিকুল ইসলাম এবং মা শাহেরা বেগম। তিনি সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ছুটি শেষে রিয়াদ হয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে বিমানবন্দরে অবস্থানকালে হামলার শিকার হন তিনি।
ওই হামলায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের আরেক বাংলাদেশি কর্মী মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরিও নিহত হন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আহত হন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের তথ্য অনুযায়ী, আহতের সংখ্যা ছিল ২৪।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে দেশটিতে যুদ্ধ বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশি কর্মীদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নিহত ১১ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শাহেদ তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শাহেদের মরদেহ দেশে এসেছে। অন্যদের মরদেহও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশিকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও নবায়নের বিষয়েও সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সংঘাতের কারণে যেসব কর্মী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, তাঁদের ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মিশনের গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন থেকে প্রবাসীরা যথাযথ সহায়তা পান না—এমন অভিযোগের বিষয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রতিটি মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। প্রবাসীরা সাধারণত এসব উইংয়ে অভিযোগ জানান। সেখানে প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তা করা দূতাবাস ও সরকারের দায়িত্ব। কোনো মিশনের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং সংকটকালে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশটির কারাগারে বন্দী বাংলাদেশিদের অবস্থা এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই নাগরিকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে সরকার।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]