খুঁজুন
                               
, ,
           

কিশোর অপরাধের বয়সসীমা নিয়ে প্রশ্ন; সম্মিলিত প্রয়াসেই নির্মূলের অঙ্গীকার র‌্যাবের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
কিশোর অপরাধের বয়সসীমা নিয়ে প্রশ্ন; সম্মিলিত প্রয়াসেই নির্মূলের অঙ্গীকার র‌্যাবের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

দেশজুড়েই ভয়াবহ আকার নিয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। বড়দের ছত্রছায়ায় অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে টিনেজারদের। আধিপত্য বিস্তার থেকে শুরু করে, চাঁদাবাজি, মাদক, খুনাখুনিসহ হরেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অকালেই ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় অনেক প্রাণ।

ভিনদেশী এই সংস্কৃতির রাশ টেনে ধরতে শুন্য সহিষ্ণুতার নীতি নিয়েই দীর্ঘদিন যাবত আভিযানিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ২০১৭ সাল থেকে এখন অবধি ৩৭৩ জন কিশোর অপরাধীদের নিয়ে এসেছে আইনের আওতায়। কিন্তু ভয়াবহ এই সমস্যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয় মোটেও।

জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতার মাধ্যমেই সম্মিলিতভাবেই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমেই হালের বিষফোঁড়া এই গ্যাং কালচারকে সমূলে মূলোৎপাটন করার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে র‌্যাব। জনসচেতনতামূলক প্রচারণার বার্তা দিতেই তৈরি করেছে মর্মস্পর্শী এক টিভিসি। নিজেদের সুদৃঢ় অঙ্গীকার ফুটে উঠেছে ‘সবার হোক একটাই পণ, কিশোর অপরাধ করবো দমন’ শীর্ষক স্লোগানেও।

বৃহস্পতিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মধুবাগে অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এই টিভিসি উদ্বোধন করেন।

এই অনুষ্ঠানেই কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ এক বার্তা উচ্চারিত হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার) অকাট্য যুক্তি আর বস্তুনিষ্ঠতার আলোকচ্ছটায় দ্যুতিময় উপস্থাপন করেছেন প্রসঙ্গটির। বিষয়টি নিয়ে মোটা দাগে ভাবনা-চিন্তার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও।

কন্ঠ মিলিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম, জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন ও র‌্যাব ডিজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন থেকে শুরু করে সবাই। একই সঙ্গে প্রত্যেক অভিভাবককেও নিজ নিজ সন্তানের প্রতি যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সচেতনতার পরেও সুপথে না এলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন র‌্যাব ডিজি।

সময় এসেছে কিশোর অপরাধের বয়সসীমার ভাবনা-চিন্তার
১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে চিন্তা-ভাবনার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যখন এসএসসি পাস করেছি তখন বয়স ছিল ১৫ বছর। বর্তমানে যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে ১৮ বছর বয়সে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। আমাদের মনে হয় ১৮ বছরের এই সময়সীমা চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক একটি আইনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় সমন্বয় করে এটি করা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে কিশোর অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বেগ পেতে হচ্ছে, তাই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনার কথা বলেন মন্ত্রী।

‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে, এটি ধরে রাখার প্রথম শর্ত হচ্ছে নিরাপত্তা’
উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘আমাদের কিশোররা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের শঙ্কার বিষয় ছিল কোভিডকালীন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে, সবাই বসে থাকবে। তবে এ সময়ে কিশোরদের নিয়ে যে শঙ্কাটা ছিল ততখানি হয়নি। আমাদের দেশ অনেক দেশের তুলনায় ভালো আছে।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ-র‌্যাব, শিক্ষক ও সমাজ তার কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারপরেও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি কেন? তাই বিষয়টি নিয়ে খেয়াল না করলে আমাদের সন্তানকে হারিয়ে ফেলবো। দেশ-জাতির সবাই নিগৃহিত হবে। সমাজের শাসন যদি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যতই কড়াকড়ি হোক আমরা হারিয়ে যাব।

তাই সময় থাকতে সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দিন, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে খেয়াল করুন। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। তবে আপনার সন্তানদের প্রতি যদি খেয়াল না রাখেন এটি আমরা কখনোই পারবো না।’

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গিবাদের মতো কিশোর গ্যাংও এই দেশ থেকে নির্মূল করা হবে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘মা-বাবা যদি সন্তানের প্রতি খেয়াল না করে শুধু মাদক ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অভিযানে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে যেই তরুণ প্রজন্ম, তারা যেন পথ না হারায়, এজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’

শিশু-কিশোরদের মনোজগতে প্রবেশ করতে হবে
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, ‘বাবা-মায়ের অতি আদর কিংবা সময় না দেওয়া বাচ্চাদের মনে প্রভাব ফেলে। শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের শারীরিক নির্যাতন করা বৈধ নয়, কাউন্সিলিংয়ে জোর দিতে হবে। শিশু-কিশোরদের মনোজগতে প্রবেশ করতে হবে।

আমরা কিন্তু বাবা-মারা সন্তানের বন্ধু হতে পারিনা। বন্ধু হতে পারলে তাদের যে সমস্যাটা সেটা যেন আমাদের কাছে শেয়ার করতে পারে সেরকম একটা সুযোগ তৈরি হলে কিন্তু এতো অঘটন ঘটবে না।

উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমরা যদি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব দেখি। তার শৈশব কিন্তু মানবিকতাপূর্ণ একটি জীবন ছিল। তিনি শৈশব থেকেই মানবাধিকারের চর্চা করেছেন। সারা জীবন মানবাধিকারের জন্য লড়াই করেছেন।

আমাদের ভেতরে কেন মূল্যবোধ জাগ্রত হবেনা। কেন পরিবার থেকে ছেলে, বাচ্চাকে শিক্ষা দেওয়া হবে না সৎ পথে চলতে। মিথ্যা কথা না বলতে। আমাদের প্রত্যাশা আগামী প্রজন্ম মানবিক চেতনায় বড় হয়ে উঠবে। আমরা যে বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই, সেই ডিজিটাল বাংলাদেশকে তারা যেন বিশ্বের বুকে একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে তুলতে পারে।’

প্রত্যেক আইনে দরকার সমন্বয়
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ দেশের আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এছাড়াও দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, আমাদের উপকূলীয় সুরক্ষা এবং আভ্যন্তরীণ যেকোন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্বে আমাদের মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, একটা রাষ্ট্রের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। সেই লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট হিসেবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) দক্ষতার সাথে তাদের কর্মকান্ড পরিচালিত করছে।

কিশোরের সজ্ঞা একেক জায়গায় একেক ধরনের, প্যানাল কোডে এক ধরনের। এক সময় ৯ বছর ছিল, এখন ১৪ বছর, শিশু আইনে আছে এক ধরনের ১৬ বছর পর্যন্ত; শ্রম আইনে আছে এক ধরনের ১৮ পর্যন্ত। এটাকে একটি সমন্বয়ের মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। তথাপি বিভিন্ন আইনে ব্যঞ্জনা একেক রকম। আমাদের দেখতে হবে অপরাধটা কোন আইনে করেছে। প্যানেল কোড মতে যদি এখন ১৪ বছর হয় সেটা অনেক ভালো। কারণ এই বয়সে এখন সবাই বুঝে। আধুনিক যুগে টিভি, ফেসবুক, ইউটিউব দেখে এই বয়সে ম্যাচিউড হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় প্রত্যেকটা আইনের মধ্যে একটি সমন্বয় আনা দরকার।’

কিশোররা কেন অপরাধ করে তার উৎস খুঁজে বের করতে হবে উল্লেখ করে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এই জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, ‘অপরাধ শুধু নিয়ন্ত্রণ করলে হবেনা; তাদের কারা অপরাধী বানাচ্ছে, কারা তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, কারা তাদের দিয়ে মাদক বিক্রি করাচ্ছে সেসব লোকদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ের কিশোর অপরাধ দমন করতে হবে জানিয়ে মোস্তফা কামাল উদ্দীন বলেন, আমাদের সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে অপরাধ দমন করা সম্ভব না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো, তবে সমূলে উৎপাটন করা যাবে না।

কিশোর আইন প্রসঙ্গ ও প্যারেন্টাল কন্ট্রোলে জোর আইজিপির
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘কিশোর গ্যাং’ গত তিন চার বছর ধরে আমাদের আইনশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দেশ উপযোগী, সময় উপযোগী আইন প্রণয়ন করছেন। আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন।

উচ্চ আদালত, হাইকোর্ট আপিল বিভাগ বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক দেশের উপযোগী অনেক বিধান এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন। ফলে সভ্য দেশের সমস্ত লক্ষণ ফুটে ওঠার বিষয় অনেক স্পষ্ট। সেভাবেই আমাদের কিশোর আইন হালনাগাদ করা হয়েছে। কিশোর আইন হালনাগাদ করার ফলে যেটা হয়েছে যে এখন ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের যে কেউ হচ্ছে শিশু।

যেটি ব্রিটিশ আমলের আইন এভাবে ট্রিট করে না। ব্রিটিশ আমলের আইন ছিল এরকম যে, শিশু আইন ছিল ৮ বছর মাত্র। তারপরেও যদি কোন অপরাধ করার ক্ষেত্রে ৮ বছরের শিশু এমন কোন আচরণ করতো যে সে বুঝে অপরাধটা করছে তাহলে তাকেও বয়স্ক অপরাধের সমান বিবেচনায় নিয়ে তার বিচার করা হতো। কিন্তু বর্তমান দেশে আইন পরিবর্তন করার ফলে যেটা হয়েছে ১৮ বছরের মত পূর্ণ যুবকের পর্যায়ে পৌঁছে যায় তাকেও কিন্তু এখন শিশু হিসেবে বিচার করা হয়। এই কারণে কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এখন সেভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘এখন বর্তমানে আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়স পর্যন্ত বিচার পদ্ধতি, গ্রেফতার পদ্ধতি সব কিছু আলাদা। গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে প্রবেশন অফিসারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আবার মুশকিল হচ্ছে যে, বাংলাদেশে কোথায় কোন প্রবেশন অফিসার আছে আমরা জানি না। এই আইন বলবৎ করতে কত সংখ্যক অফিসার থাকতে হবে, বিস্তারিত বলা নেই।

এসব প্রবেশন অফিসাররা কাজ করে আবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমরা কাজ করি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। দু’টি ভিন্ন মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে সমন্বয়ের দরকার, আমরা সমন্বয়ের চেষ্টা করছি।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আইজিপি বলেন, যদি যথেষ্ট সংখ্যক প্রবেশন অফিসার না থাকে তাহলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সেই পরিমাণ প্রবেশন অফিসার নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার বললেই কিন্তু নিয়োগ হয় না। এটা প্রাইভেট সেক্টর না। বর্তমানে সরকারিভাবে একজন পিয়ন নিয়োগ করতে হলেও ১৩ টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আর একধাপ যদি একমাস লাগে তাহলে ১৩ মাস। প্রচলিত পদ্ধিততে পিয়ন নিয়োগেও কোনোক্রমে দুই বছরের আগে আমাদের ক্ষমতা নেই। চাইলেও প্রবেশন অফিসার নিয়োগ হয়ে যাবে না।

বর্তমানে এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের রয়েছে। বর্তমানে আইন অনুযায়ী একজন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো যাবে না। পাঠাতে হবে কিশোর সংশোধানাগারে। আর সেগুলোর সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। এখন বাংলাদেশে কত কিশোর অপরাধ বা অপরাধী আছে তাদের সংখ্য কত, কারেকশন সেন্টারের সংখ্যা কত, কার ক্যাপাসিটি কত এগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

নিজের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড.বেনজীর আহমেদ বলেন, কিশোর ছেলে-মেয়েরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে এখানে প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের বিষয়টাও রয়েছে। প্রতিটা পরিবারকে খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চারা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে এবং কী করছে। দেশ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৪১ সালের উন্নত ও ধনী বাংলাদেশের উপযোগী একটি জেনারেশন আমাদেরই তৈরি করতে হবে।

চলমান থাকবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা
র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ছোটদের সঙ্গে বড়রাও থাকে। ছোট-বড় মিলে বিরোধ হয়, পরে আলাদা গ্রুপ সৃষ্টি হয়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি বা সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন আমাদের জন্য একটি অ্যাসেট। এই অ্যাসেট ধরে রাখতে পারলে সন্তানদের বিচ্যুতি থেকে ঠেকানো সম্ভব। কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার দায় সবার রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে ধাবিত করতে সচেতনতা সৃষ্টিতেও তিনি আহ্বান জানান।

ডিজি বলেন, যেহেতু আমাদের সকলের দায় তাই আমরা চাই সকলে মিলে এই দায়বদ্ধতা থেকে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকপথে পরিচালনা করতে পারি। আমরা যেন গর্ববোধ করতে পারি আমাদের সন্তানের জন্য সেইভাবেই তাকে গড়ে তুলতে হবে। উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সন্তানরা ভূমিকা রাখতে পারে এরকম দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে তাদেরকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই করোনা দুর্যোগেও জীবন এবং জীবিকার একটি সুষ্ঠু সমীকরণ রচনা করে আমরা উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রেখেছি। যে উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা হয়েছে সেই উন্নয়নের চাকাকে যেন কোন ক্রমেই কেউ যেন পিছনের দিকে ঠেলে দিতে না পারে সেদিকে সবার সতর্ক থাকার দরকার আছে।

যুব সমাজকে যদি ধ্বংস করা দেওয়া যায়, আমাদের এই শিশুদের যদি ধ্বংস করে দেওয়া যায় তাহলে বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে। যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমরা ২০৩০ সালে, ২০৪১ সালে। সে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। যদি আজকে আমাদের শিশুদেরকে সুপথে -সঠিকপথে পরিচালিত করতে আমরা ব্যর্থ হই, যোগ করেন র‌্যাব মহাপরিচালক।

চৌধুরী মামুন বলেন, ‘কিশোর অপরাধীদের গ্রেফতার করলে প্রবেশন অফিসারের কাছে দিতে হয় উল্লেখ করে র‌্যাব ডিজি বলেন, ‘বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে গ্রেফতারের পর প্রবেশন অফিসার পাওয়া অনেক কঠিন ও জটিল।’

কিশোর অপরাধ দমনে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে মানে এই নয়, আভিযানিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। যদি কেউ সচেতনতার মাধ্যমে সুপথে না আসে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা চলমান থাকবে, হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন তিনি।

আশ্বাস দিতে হবে আমরা আছি তোমাদের পাশে
র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল কে এম আজাদ বলেন, ‘সবার হোক একটাই পণ, কিশোর অপরাধ করবো দমন’ শীর্ষক টিভিসির মাধ্যমে শুরু হলো র‌্যাবের ‘কিশোর গ্যাং’ বিরোধী আনুষ্ঠানিক ক্যাম্পেইন।

‘বাংলাদেশ আমার অহংকার’ এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের আকুন্ঠ সমর্থন, প্রেরণা ও ভালোবাসা নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার বজ্র কঠিন শপথ নিয়ে এগিয়ে চলছে র‌্যাব ফোর্সেস।’

তিনি বলেন, ‘আজকের অনুষ্ঠানের মূল ফোকাস হচ্ছে কিশোর। এই কিশোর শব্দটা শোনার সাথে সাথেই আমাদের সবার মনে একটি প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। একদল তরুণ-তরুণী যারা হাস্যেজ্জ্বল, দুরন্ত, যারা জয় করতে পারে যেকোন বাঁধা, তাঁরা অজেয়।

আজকে আমরা ‘কিশোর গ্যাং’ কালচারের কথা বলছি। এটি মূলত আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমাদের কিশোররা বিদেশী কিছু অপসংস্কৃতি কিছুটা অনুসরণ করছে মাত্র। যা আমাদের পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতার জন্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান নামে একজন ছাত্রকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে মূলত কিশোর গ্যাং আলোচনায় আসে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মূলহোতাসহ এতে জড়িত অনেককেই আইনের আওতায় এনেছে র‌্যাব। কিশোর গ্যাং নামের এই অপসংস্কৃতি রোধকল্পে, এই সকল গ্যাং কালচারে জড়িত অনেক আসামিকে র‌্যাব ফোর্সের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা গ্রেফতার করেছে। ফলে অনেকাংশেই বর্তমানে এই গ্যাং’কে অনুসরণ করা কিশোররা নিষ্ক্রিয় আছে।

তবে এটাকে এই মুহুর্তে একেবারেই শেষ বলা যাবে না। তাই র‌্যাব কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বস্তুনিষ্ঠ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আজকের এই অবতারণা। আমরা চাচ্ছি আমাদের আভিযানিক বিভিন্ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন জনসচেতনতা ও বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছি।’

‘স্বাধীন বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের কোন অস্তিত্ব থাকবে না’ দৃঢ়কন্ঠে এমন উচ্চারণ করে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল কে এম আজাদ আরও বলেন, ‘গত মার্চ থেকে র‌্যাব ফোর্সেসের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন সারাদেশে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছে এবং বর্তমানেও অব্যাহত আছে। মার্চ থেকে এই পর্যন্ত ২৩৪ জনকে র‌্যাব বিভিন্নভাবে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে।

আমরা মনে করি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ নয়। আমরা তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে পরিবর্তন ঘটতে চাই। আমরা তাদের মধ্যে প্রবেশ করে কুলষিত যা আছে তা বের করে দিতে চাই। এজন্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি জনসমাজে যারা বসবাস করছি বয়োজ্যেষ্ঠ, শিক্ষক এবং আমাদের সমাজের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে এই পথ ভুল পথ। তাদের আশ্বাস দিতে হবে আমরা আছি তোমাদের পাশে।’

কালের আলো/এমএএএমকে

ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ল ট্রেন, নতুন সেবা মহানগর এক্সপ্রেসের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ল ট্রেন, নতুন সেবা মহানগর এক্সপ্রেসের

ঢাকা থেকে কক্সবাজার রেলপথে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বাড়াতে এই রুটে যুক্ত হয়েছে মহানগর এক্সপ্রেস। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনটির গন্তব্য কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে মহানগর এক্সপ্রেস। ট্রেনটির প্রথম যাত্রা উপলক্ষে স্টেশনে উপস্থিত ছিলেন রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সূচি অনুযায়ী, সপ্তাহের রোববার ছাড়া প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ছাড়বে ট্রেনটি। রাত ২টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে যাত্রাবিরতির পর রাত ৩টায় আবার যাত্রা শুরু করে পরদিন সকাল ৬টার দিকে কক্সবাজারে পৌঁছানোর কথা।

ফেরার পথে সকাল ৯টায় কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়বে মহানগর এক্সপ্রেস। চট্টগ্রামে যাত্রাবিরতির পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ট্রেনটি বিমানবন্দর, নরসিংদী, ভৈরব বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, ফেনী ও চট্টগ্রাম স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেবে। ফেরার পথেও এসব স্টেশনে থামার কথা রয়েছে। তবে সীতাকুণ্ডের কুমিরা স্টেশনে যাত্রাবিরতি রাখা হয়নি।

রেলওয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মহানগর এক্সপ্রেসের ভাড়া আসনশ্রেণিভেদে ৬৮৫ থেকে ১ হাজার ৫৭০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভাড়া ২৪০ থেকে ৫৪৭ টাকা। ট্রেনটিতে শোভন চেয়ার, স্নিগ্ধা, এসি সিট ও এসি বার্থ শ্রেণির আসন রয়েছে। যাত্রীরা বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট, রেল সেবা অ্যাপ এবং অনুমোদিত স্টেশন কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন।

এর আগে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস চলাচল করত। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচল করত সৈকত এক্সপ্রেস ও প্রবাল এক্সপ্রেস। মহানগর এক্সপ্রেসের রুট সম্প্রসারণে কক্সবাজারগামী ট্রেনের সেবা আরও বিস্তৃত হলো।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নতুন এই সেবার ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মধ্যবর্তী জেলাগুলোর যাত্রীদের কক্সবাজার যাতায়াত সহজ হবে। এতে পথে পরিবহন পরিবর্তনের ঝামেলা কমার পাশাপাশি পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে সময়সূচি মেনে ট্রেন পরিচালনা, টিকিটের পর্যাপ্ততা ও যাত্রীসেবার মান বজায় রাখা জরুরি।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

সাসাকাওয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ, আলোচনায় ভ্যাকসিন কারখানা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৪২ অপরাহ্ণ
সাসাকাওয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ, আলোচনায় ভ্যাকসিন কারখানা

জাপানের নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের অনারারি চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওর মেইজি কিনেনকানের হানাগাসুমি রেস্তোরাঁয় এ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতে সাসাকাওয়ার দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন উৎপাদনের একটি কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।

নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ও বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-২ কামরুল ইসলামসহ অন্যরা।

জাপানের পক্ষে নৈশভোজে অংশ নেন নিপ্পন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাকাশি আরিকাওয়া ও সংস্থাটির অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

বিমান বাহিনী প্রধানের ইউরোপ সফর: আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৩৯ অপরাহ্ণ
বিমান বাহিনী প্রধানের ইউরোপ সফর: আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

আধুনিক বিমান বাহিনীর সক্ষমতা কেবল অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বা সমরাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ উড়োজাহাজের কার্যকারিতা বজায় রাখা, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রতি জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র সফর করেছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। সফরে তিনি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিমান শক্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

  • জার্মানিতে উড়োজাহাজ ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পরিদর্শন
  • চেক প্রজাতন্ত্রে ভবিষ্যৎ বিমানশক্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ
  • বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

গত ১৮ থেকে ২০ অক্টোবর জার্মানি সফরকালে বিমান বাহিনী প্রধান গ্রোব এয়ারক্রাফট এসই-এর আমন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটির টুসেনহাউজেন-ম্যাটসিসে অবস্থিত উড়োজাহাজ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিষয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে গ্রোবের তৈরি প্রশিক্ষণ বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব বিমানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সফর বিদ্যমান উড়োজাহাজের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতেও সহায়ক হতে পারে।

জার্মানি সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দেশটির অন্যতম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডিল ডিফেন্সের উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন। প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করে। বিশেষ করে তাদের IRIS-T SLM ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ মিসাইল ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহারের উপযোগী। একটি দেশের সমন্বিত ও স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিমান বাহিনী প্রধান ডিল ডিফেন্সের উৎপাদন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ স্থাপনের দিক থেকে এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ।

জার্মানি সফর শেষে গত ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন চেক প্রজাতন্ত্র সফর করেন। চেক বিমান বাহিনীর কমান্ডার এবং ফিউচার এয়ার ফোর্স কনফারেন্সের চেয়ারম্যানের আমন্ত্রণে তিনি প্রাগে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ফিউচার এয়ার ফোর্স কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আধুনিক আকাশযুদ্ধের পরিবর্তিত প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে মতবিনিময় করেন। আলোচনায় মাল্টিরোল লাইট এয়ারক্রাফট, আধুনিক প্যাসিভ ও অ্যাক্টিভ সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সশস্ত্র চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি), কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যৎ বিমান শক্তি গড়ে তুলতে প্রযুক্তি সংগ্রহের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, কার্যকর প্রশিক্ষণ, আধুনিক রণকৌশল এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা উন্নয়ন অপরিহার্য। প্রাগের সম্মেলন এসব বিষয়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ তৈরি করেছে।

বিমান বাহিনী প্রধানের এই সফরের দুটি অংশ পরস্পরের পরিপূরক। জার্মানিতে তিনি উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আকাশযুদ্ধ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এ ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিমান বাহিনী প্রধানের জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র সফর কেবল আনুষ্ঠানিক সফর বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

এটি আধুনিক বিমান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচিত করেছে।

কালের আলো/এমএএএমকে