পিআর দাবিতে অনড় ইসলামি দলগুলো
কালের আলো রিপোর্ট:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকী আর মাত্র মাস কয়েক। আগামী ফেব্রুয়ারিতেই ভোটগ্রহণের ঘোষণা আগেই দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচন কমিশনও একই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সব ছাপিয়ে রাজনীতিতে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি। শুরু থেকেই দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই পদ্ধতির বিরোধীতা করলেও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
একই দাবিতে অনড় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি ইসলামি দল। এটিসহ পাঁচ দফা দাবিতে তারা রাজধানী থেকে শুরু করে সারা দেশে কর্মসূচি পালন করছে। শুক্রবার (১০ অক্টোবর) পিআর পদ্ধতিতে (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) আগামী জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানীতে গণমিছিল করে জামায়াতসহ বিভিন্ন ইসলামী দল। গণমিছিলে নেতারা বলেন, ‘পিআর নিয়ে জনগণকে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ পিআরের পক্ষে। আর জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার বিষয়ে টালবাহানাও জনগণ মেনে নেবে না।’ তবে একই দিনে রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত জেলা বিএনপির সদ্য প্রয়াত সদস্য সচিব আনিছুর রহমানের শোকসভা ও দোয়া মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘দেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি চালু করার মতো কোনো পরিবেশ নেই এবং বিএনপি সেটিতে বিশ্বাসী নয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা এক শ্রেণির গোষ্ঠী নির্বাচনের সময় প্রলম্বিত করার উদ্দেশে এই দাবি তুলছেন।’
- এখন জনগণ পিআর পদ্ধতির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে
মিয়া গোলাম পরওয়ার
সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জানা যায়, শুক্রবার (১০ অক্টোবর) জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে গণমিছিল করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তার আগে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাদের মিছিলটি কাকরাইল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। একই দাবিতে বিকাল সাড়ে ৪টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে থেকে গণমিছিল বের করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে মিছিলটি বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম ও মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমাদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

জুমার পর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন দলের আমির মামুনুল হক। তিনি দাবি আদায়ে আগামী ১২ অক্টোবর সারা দেশের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই দাবিতে জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে গণমিছির বের করে খেলাফত মজলিস। এতে নেতৃত্ব দেন নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী ও মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আব্দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা।
এখন জনগণ পিআর পদ্ধতির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে : মিয়া গোলাম পরওয়ার
সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘এখন জনগণ পিআর পদ্ধতির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এই পদ্ধতি সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার আছে। কিন্তু দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলের ঘোষিত কর্মসূচি সম্পর্কে, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অধিকার কারও নেই।’
- ইসলামি শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন জরুরি
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম
আমির
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
এদিন জুমার নামাজের পর ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে গণমিছিলের আগে এক সমাবেশে বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। পাঁচ দফা দাবি আদায়ে এ কর্মসূচির আয়োজন করে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এখন পর্যন্ত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ)’ নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদেরও দায়ী করেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো বিশেষ দলের প্রতি দুর্বল হয়ে, কারও চাপে মাথা নত করে প্রশাসনে কোনো দলের পছন্দের লোককে বেছে বেছে পদায়ন করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ওসি, ডিসি, ইউএনও, আমলা, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকের ভূমিকা এখনো জাতির সামনে প্রশ্নবিদ্ধ।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে ছোট-বড় সব দল যেন সমান সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। ১৫ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষরের আগে পিআর পদ্ধতির বিষয়টি চূড়ান্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। যেসব সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, সেগুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি গণভোটের মধ্যে পিআর প্রস্তাবও যুক্ত রাখার দাবি জানান। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ যদি পিআর পদ্ধতির পক্ষে মতামত দেয়, সব দলকে সেটা মানতে হবে। জনগণ বিপক্ষে মত দিলে জামায়াত পিআরের দাবি থেকে সরে আসবে।
- দেশে পিআর পদ্ধতি চালু করার মতো কোনো পরিবেশ নেই
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন
সদস্য, স্থায়ী কমিটি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
জাতীয় ঐক্য তৈরির স্বার্থে জামায়াত ‘বেশ কিছু’ সংস্কার প্রস্তাবে ছাড় দিয়েছে দাবি করে পরওয়ার বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন পূরণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে যেন ঐক্যের প্রচেষ্টায় বিঘ্ন না ঘটে।’
‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগের মতো ১৪ দলীয় জোটভুক্ত সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল, যাঁর দলকে গত বছর অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
সমাবেশে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘অনেকে দ্রুত নির্বাচন চান, কিন্তু সংস্কারে সহযোগিতা করেন না। জনগণের দাবিকে তাঁরা তোয়াক্কা করেন না। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি, কোথায় কী নাড়াচাড়া হচ্ছে, এর খবর আমাদের কাছেও আছে। যারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলকে রক্ষা করার কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে, তারা ভারতের দালাল। এই দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আরেকটি বিপ্লব করতে জামায়াত প্রস্তুত আছে।’
১৫ নভেম্বরের মধ্যে গণভোট এবং আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের অন্দরমহল বা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে যদি নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যারা চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত, বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে।’ ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় এ সমাবেশে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদও বক্তব্য দেন। সমাবেশ শেষে বেলা আড়াইটার দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি কাকরাইলে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে স্লোগান ছিল ‘এই মুহূর্তে দরকার, পিআর আর সংস্কার’, ‘অবিলম্বে গণভোট, দিতে হবে, দিয়ে দাও’, ‘জামায়াতের ৫ দফা মানতে হবে, মেনে নাও’, ‘পিআর ছাড়া নির্বাচন, মানি না, মানব না’, ‘এই মুহূর্তে দরকার, পিআর, বিচার, সংস্কার’ ইত্যাদি।
ইসলামি শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন জরুরি: চরমোনাই পীর
বর্তমানে দেশে ইসলামি শক্তিকে ক্ষমতায় আনার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। তিনি বলেন, এই সুযোগ কাজে লাগাতে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি বাস্তবায়ন জরুরি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠন ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশ হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চরমোনাই পীর এ কথা বলেন।

ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই পিআর পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক নির্বাচনী পদ্ধতিতে জনগণের প্রকৃত মতামত সংসদে প্রতিফলিত হয় না। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে বৈষম্য, অস্থিরতা ও অন্যায় প্রভাব বিস্তার পায়।
জনগণের ভোটের অনুপাতে দলগুলো মধ্যে আসন বণ্টনকেই গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি বলে মন্তব্য করেন চরমোনাই পীর। তিনি বলেন, এতে ভোটের মূল্য সংরক্ষিত থাকবে। ছোট ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবে। জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। সমাবেশে সৈয়দ রেজাউল করীম আরও বলেন, ‘আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, প্রতিনিধিত্বশীল, শান্তিপূর্ণ ও শ্রমিকবান্ধব রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই। সেই পথের একমাত্র সমাধান হলো পিআরভিত্তিক নির্বাচন। শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসলামি শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে হবে।’
ইসলামি শ্রমনীতি বাস্তবায়ন ছাড়া কখনোই শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না বলে মন্তব্য করেন সমাবেশের বিশেষ অতিথি ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে চায়, যেখানে মানুষ ও কুকুর খাদ্যের জন্য লড়াই করবে না, মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব থাকবে না।’ ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন ও মাহবুবুর রহমান, মহাসচিব হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল কে এম বিল্লাল হোসাইন ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাফেজ সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/জেএন/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array