ভাষণে মুগ্ধতা ছড়ালেন প্রধান উপদেষ্টা, জুলাই সনদে স্বাক্ষরে বাংলাদেশে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
কালের আলো রিপোর্ট:
অবশেষে কাক্সিক্ষত জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর হয়েছে। এরই মধ্যে দিয়ে যেন বাংলাদেশে সূচনা ঘটলো নতুন এক অধ্যায়ের। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সনদে স্বাক্ষর করলেন। নানা মতভেদ পেরিয়ে প্রণীত জুলাই সনদে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪ দল স্বাক্ষর করেছে। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহুর্তে ঐতিহাসিক এই মাহেন্দ্রক্ষণের স্বাক্ষী হলো গোটা দেশ। জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরকে ‘নতুন বাংলাদেশের সূচনা’ বলে মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টা। নানা বিষয়ে মতানৈক্য পেরিয়ে জুলাই সনদে দলগুলোকে এক করতে পারার কৃতিত্ব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদেরও দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান।
এদিন ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের কাতারে থাকা তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। তারা অনুষ্ঠানেও যায়নি। অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও সনদে স্বাক্ষর করেনি গণফোরাম।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.ইউনূস আশা প্রকাশ করেছেন, যে ঐক্যে জুলাই সনদে সই হলো, এই সুরই দেশকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এক থাকার আহ্বান জানান তিনি। রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজ ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা যেরকম সনদ করলাম, তেমনি রাজনীতির ব্যাপারে, নির্বাচনের ব্যাপারে আপনারা রাজনৈতিক নেতারা বসে একটা সনদ করুন- কীভাবে নির্বাচন করবেন। যেমন-তেমন করে নির্বাচন করলে তো আবার পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়া। এতকিছু করে লাভটা কী হলো তাহলে? এই কথা লিখে আমার লাভ কী হলো? কথা লিখলাম, কথা মানলাম না, কাজের মধ্যে গিয়ে মানলাম না। কাজেই আমার অনুরোধ, আপনারা আবার ঐকমত্য কমিশন বলেন, কমিটি বলেন, নিজেরা বসুন-নির্বাচনটা কীভাবে সুন্দরভাবে করবেন, উৎসবমুখর করবেন, ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবেন।’
এর আগে বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। এতে যোগ দেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ।
শুক্রবার বিকেল ৪টায় জুলাই সনদ সাক্ষর অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল। তার আগে বেলা ১টার দিকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে একদল লোক অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাঁদের সরিয়ে দেয়। এরপর পুলিশ ও ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ মধ্যে সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে সব বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে শুরু হয় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান।

যেন আমরা বলতে পারি যে আমাদের অনেক স্রোত, কিন্তু মোহনা একটি : অধ্যাপক আলী রিয়াজ
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে ৮ মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার মধ্য দিয়ে দেশের নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করে নিজের বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের মতের পার্থক্য থাকবে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য না থাকলে তা গণতান্ত্রিক হয় না। মতের পার্থক্য থাকবে, পথের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু এক জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ সেই অভীষ্ট জায়গা গণতন্ত্র বলে উল্লেখ করেন তিনি। অধ্যাপক আলী রীয়াজ নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, ‘বহু স্রোত যেন মোহনায় এসে মেলে, যেন আমরা বলতে পারি যে আমাদের অনেক স্রোত, কিন্তু মোহনা একটি। সেটি হচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরি করা। আমাদের বহু স্রোত, আমরা সকলে এক জায়গায় যে আমরা যেকোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাই দাঁড়িয়ে থাকব।’
- এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের সূচনা
- ঐক্যের সুর, ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব
- অন্য দেশ আমাদের কাছ থেকে শিখবে, সে সামর্থ্য আমাদের আছে
- যেন আমরা বলতে পারি যে আমাদের অনেক স্রোত, কিন্তু মোহনা একটি : অধ্যাপক আলী রিয়াজ
জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এই দিন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অভূতপূর্ব এবং অনন্য সময়। একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি হচ্ছে আমাদের দীর্ঘ পথের যাত্রার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শের যে রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা তা, ৫৩ বছর ধরে বারবার হোঁচট খেয়েছে। এরপরও দেশের নাগরিকেরা গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় আজকে এই জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় এক বছর ধরে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এই জাতীয় সনদে উপনীত হয়েছে। এই জুলাই জাতীয় সনদ কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি নয়, এটা নাগরিকের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ও রাষ্ট্রের একটি সামাজিক চুক্তি বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদানের মধ্য দিয়ে এই সনদ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সবার যে চেষ্টা, তা এক দিনে সাফল্য অর্জন করবে না এবং একটি দলিল কেবল সেই নিশ্চয়তা দেবে না বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে জাতীয় দলিল তৈরি হয়েছে, তার বাস্তবায়ন ঘটবে। দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন ঘটবে। নাগরিকদের মতামতের মধ্য দিয়ে এই দিক দিশা নির্দেশক বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে পরিচালনা করবে।’

ভাষণে মুগ্ধতা ছড়ালেন প্রধান উপদেষ্টা, বললেন আমাদের জন্য আজকে নবজন্ম
নিজের দীর্ঘ ভাষণে আবারও মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস। জুলাই সনদ স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের নবজন্ম হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। ঐক্যবদ্ধ শপথে দৃপ্ত পদক্ষেপে শাণিত করলেন সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার। তরুণরাই এদেশের নেতৃত্ব দিবে, তাঁরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে আশাবাদী উচ্চকিত কণ্ঠে জানালেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান। নিজের ভাষণে তিনি বললেন বলেন, ‘আমাদের জন্য আজকে নবজন্ম। আমাদের নবজন্ম হলো আজকে। এই স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশের সূচনা করলাম। সেটা যেন সঠিকভাবে আমরা যেতে পারি। আমরা একমত হয়েছি সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
এই অগ্রযাত্রায় পথ দেখানোর ভার তরুণদের দিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘যেই তরুণেরা এই দিনটিকে সম্ভব করেছে, এ বাংলাদেশের আনাচকানাচে এই পরিবর্তনের জন্য যারা জীবন দিয়েছে তারা-এই তরুণেরাই আবার বাংলাদেশকে নতুন করে গড়বে। এই চিন্তাধারার আলোকে তারা এই দেশকে গড়বে। তারা এই দেশের নেতৃত্ব দেবে। তারা আমাদের পথ দেখাবে।’ ভাষণের আগে জুলাই জাতীয় সনদে সই করেন মুহাম্মদ ইউনূস। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও সই করেন সনদে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের যাত্রার শুরুটা ‘ভয়ে ভয়ে’ হয়েছিল মন্তব্য করে এই কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সমস্ত জাতি একসঙ্গে হয়ে, সমস্ত রাজনৈতিক নেতা একসঙ্গে হয়ে তাঁরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করছেন। এ রকম ঘটনা ঘটবে, এ রকম কেউ আমরা চিন্তাও করতে পারিনি। যখন ঐকমত্য কমিশন গঠন করলাম, মনে মনে আশা ছিল যে হয়তো দুই-একটা বিষয়ে তাদের এক করতে পারব।’
নানা বিষয়ে মতানৈক্য পেরিয়ে জুলাই সনদে দলগুলোকে এক করতে পারার কৃতিত্ব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবেন। তাঁদের নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে। লোকে চিন্তা করবে যে তাঁরা কীভাবে এটা করেছিলেন!
জুলাই সনদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এখানে স্বাক্ষর করলাম সবাই মিলে, সেটা দিয়ে বাংলাদেশ পরিবর্তন হবে। এই পরিবর্তন সম্ভব হলো ওই গণ-অভ্যুত্থানের কারণে। এটা হলো দ্বিতীয় অংশ। সেটা তারা করেছিল বলেই আজকে আমরা এই সুযোগ পেলাম। আমরা পুরোনো কথাবার্তা সব ফেলে নতুন কথাগুলো আমাদের জীবনে নিয়ে আসলাম। আমাদের জাতীয় জীবনে নিয়ে আসলাম। আমাদের সংবিধানের পরিবর্তনের মধ্যে নিয়ে আসলাম। আমাদের অন্যান্য বিষয়ে সরকার চালানোর বিষয়ে নিয়ে আসলাম। অনেক বিষয় এসেছে পরিবর্তনের ভেতরে। এই পরিবর্তন এখন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা সেই পথে অগ্রসর হব।’ আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা এরই মধ্যে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থেকে সেদিকে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঐক্যের সুর, ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের কথা বলেছি। যে সুর আজকে আমরা এখানে বাজালাম, সেই সুর নিয়ে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব। ঐক্যের সুর, ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা নির্বাচনের দিকে যাব। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে এবং এই ঐক্য যেন বজায় থাকে। আজকে ঐকমত্যে আমরা যে রকম সনদ করলাম। রাজনীতির ব্যাপারেও, নির্বাচনের ব্যাপারেও আপনারা রাজনৈতিক নেতারা বসে, বিভিন্ন দলের নেতারা বসে একটা সনদ করেন, কীভাবে নির্বাচন করবেন। সবাই মিলে এমনভাবে নির্বাচন করব, দুনিয়ার কেউ এসে বলতে পারবে না এখানে ক্ষতি হয়েছে। বাইরের লোক এসে কেন আমাদের বলবে, তোমরা এটা ঠিক করো নাই, ওটা ঠিক করো নাই। আমরা কী জাতি হলাম যে বাইরের কথার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?’
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আরও বলেন, ‘আমার অনুরোধ, আপনারা আবার ঐকমত্য কমিশন বলেন, কমিটি বলেন, নিজেরা বসুন-নির্বাচনটা কীভাবে সুন্দরভাবে করবেন, ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবেন। বিশ্বের জন্য উদাহরণ হবে, আমরা সে রকম নির্বাচনটা করতে চাই। আমরা ইনশা আল্লাহ পারব। আজকে সেই পারার একটা চিহ্ন আমরা এখানে রেখে গেলাম।’ ঐকমত্যের মাধ্যমে যে ‘কঠিন কঠিন কাজ’ সমাধান করা যায় মন্তব্য করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা এক বর্বর জগতে ছিলাম। যেখানে আইনকানুন ছিল না। মানুষের ইচ্ছায় যা ইচ্ছা তা করতে পারত। এখন আমরা সভ্যতায় আসলাম। এখন তো কাগজে আমরা প্রমাণ করলাম, সেই সভ্যতা আমরা নিয়ে আসলাম এবং কাজে প্রমাণ করতে হবে যে আমরা সেই সভ্যতা অর্জন করেছি।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নায়কদের স্মরণ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তরুণদের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমাদের তরুণেরা ছাড়া পৃথিবীতে এত তরুণ দিতে পারে, এত তাজা শক্তি দিতে পারে, এত সৃজনশীল মানুষ দিতে পারে, এত বিশ্বস্ত মানুষ দিতে পারে—খুঁজে পাওয়া যাবে না। কাজেই সে দেশকে গঠন করার দায়িত্ব আগামী সরকারকে নিতে হবে। পরবর্তী সরকারগুলোকে নিতে হবে। সেটার জন্যই প্রস্তুতি হচ্ছে এই আমাদের সনদ।’ জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে থাকবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা কীভাবে ঐকমত্যে এসেছি, কী কী বিষয়ে বিবেচনা করেছি, কীভাবে এসেছে, তার জন্য যে তাঁরা বিতর্কগুলো করেছেন দিনের পর দিন এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য, সেগুলোর ভিডিও ইস্যুভিত্তিক তৈরি করে করে ছাত্রদের হাতে দিয়ে দেওয়া হবে, তারা যেন অনুপ্রাণিত হয়।’
‘অন্য দেশ আমাদের কাছ থেকে শিখবে, সে সামর্থ্য আমাদের আছে’
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে আসে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মালিকানা ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়টিও। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর আমাদেরই অঞ্চল। আমাদেরই বাংলাদেশের অংশ। এই অংশ অত্যন্ত সম্পদশালী অংশ। আমরা পূর্ণ ব্যবহার করতে চাই সম্পদকে। আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমরা তর্কবিতর্কের মধ্যে যেতে চাই না। সে জন্যই আজকে সনদ হলো। এই সনদ তর্কবিতর্কের অবসান করবে।’ জুলাই জাতীয় সনদ সই করার অনুষ্ঠান থেকে গোটা জাতি অনুপ্রাণিত হবে মন্তব্য করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘অন্য দেশ আমাদের কাছ থেকে শিখবে, সে সামর্থ্য আমাদের আছে। আজকে যেই সনদ সই করল, এটা বহু দেশ শিখতে আসবে, এটা আমি গ্যারান্টি দিয়ে আপনাদের বলে রাখলাম। এই যে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলেন, এ রকম আরও বহু উদাহরণ আমরা সৃষ্টি করতে পারি। সেই পথে আমরা যেন যাই।’

সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতারা
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা হলেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামূল বশির, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম ও মিডিয়া সমন্বয়ক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, আমার বাংলাদেশ পাটির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ ও মহাসচিব মোমিনুল আমিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন ও সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব, গণ অধিকার পরিষদের (জিওপি) সভাপতি নুরুল হক ও সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান, ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, জাকের পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম ভুইয়া ও গাজীপুর জেলা ছাত্র ফ্রন্টের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হাসান শেখ, জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সমন্বয়ক আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মঞ্জুরুল আরেফিন লিটু বিশ্বাস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী ও মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়্যারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম (বাবলু) ও মহাসচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ (সেলিম), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল কাদের ও মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী এবং আমজনতার দলের সভাপতি কর্নেল (অব.) মিয়া মশিউজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array