খুঁজুন
                               
, ,
           

৬ হাজার ৩১৪ দিন পর মাতৃভূমিতে রাজসিক প্রত্যাবর্তন, নতুন যুগের সূচনা দেশের রাজনীতিতে

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৮:২৮ অপরাহ্ণ
৬ হাজার ৩১৪ দিন পর মাতৃভূমিতে রাজসিক প্রত্যাবর্তন, নতুন যুগের সূচনা দেশের রাজনীতিতে

জারিফ নিহাল/আব্দুল হামিদ/শফিকুল ইসলাম পলাশ,কালের আলো:

দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৬ হাজার ৩১৪ দিন। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও স্বশরীরে রাজনৈতিক অনুপস্থিতিরও অবসান। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় শক্ত হাতে প্রবাসে নির্বাসিত জীবনেই ধরে রেখেছেন দলের নেতৃত্ব। সামাল দিয়েছেন নানা চ্যালেঞ্জ। শৃঙ্খলা রক্ষায় কখনও কঠোর হয়েছেন। অভিভাবকত্বে আগলে রেখেছেন, এক সুতোয় গেঁথেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে অবশেষে তিনি ফিরেছেন নিজের মাতৃভূমিতে। সিক্ত হয়েছেন কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায়। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বসিত ছিল গোটা দেশ। তাকে একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন নেতা-কর্মী-সমর্থক-অনুরাগী ও সাধারণ মানুষ। বিমানবন্দরের সামনে এসে জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটি স্পর্শ করেন। জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটিতে দাঁড়ান। পরে নিচু হয়ে মাটি হাতে নেন। এক দলা মাটি পরম মমতায় নেড়েচেড়ে দেখেন। এ যেন অভূতপূর্ব এক দৃশ্য। কোন শব্দ বা বাক্যে এই অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন। কোনভাবেই পূর্বপরিকল্পিত ছিল না পুরো ঘটনা প্রবাহটি। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর হঠাৎ তিনি সামনে থাকা একটি ফুলবাগানের ভেতরে চলে যান। সেখানে ঘাস ও কিছু গাঁদা ফুলের গাছ ছিল। সেখানেই জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটিতে দাঁড়ান এবং এক দলা মাটি হাতে নেন, সফরসঙ্গীদের হাতে তুলে দেন।

মেয়ের জামাইকে ফুলের মালায় বরণ শাশুড়ির, ফোনে ধন্যবাদ জানালেন প্রধান উপদেষ্টাকে
এর আগে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রথমে ফুল দিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মির্জা ফখরুল ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে একে একে আলিঙ্গন ও কুশল বিনিময় করেন। পরে তারেক রহমানকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন তার শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু। তিনি বিমানবন্দরে একটি সোফায় বসে ছিলেন। তারেক রহমান কুশল বিনিময় করতে এলে মেয়ের জামাইকে তিনি পরিয়ে দেন ফুলের মালা। এরপর দুজন কুশল বিনিময় করেন। পরে তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান নানীকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করেন। সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে সোফায় বসে তার মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতনি কিছুক্ষণ কথা বলেন।

তারেক রহমান দেশে নেমেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করেন। বিএনপি সূত্র বলছে, ফোনে তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টাও তাকে দেশে স্বাগত জানান। দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে বাসে ওঠেন তারেক রহমান। ওই বাসে করেই তিনি ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। বাসে তার সঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করেন। এসময় জাইমা হাত নেড়ে উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। ১৯৬ নম্বর বাড়িটির অবস্থান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজার পাশে।

ক্ষমতা ও সম্মানের বিষয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
দেশের মাটিতে পা রেখেই ক্ষমতা ও সম্মানের বিষয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সম্পর্কিত পবিত্র কোরআনের আয়াত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার পর ফেসবুক পোস্টে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের অর্থ শেয়ার করেন, সঙ্গে একটি ভিডিও। ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান লেখেন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’

বুলেটপ্রুফ বাসে করেই গণসংবর্ধনাস্থলে, অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা
মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই জ্যেষ্ঠ সন্তান বিজয়ের মাসে লাল-সবুজ রঙের একটি বুলেটপ্রুফ বাসে করেই গণসংবর্ধনাস্থলে যান। বাসটির সামনে লেখা ছিল-‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই বাসের সামনে বসে তিনি নেতাকর্মীদের অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়িয়ে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান। তাদের সালাম দেন। এসময় বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। উচ্ছ্বাস-আনন্দ আর নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। দেড় যুগেরও বেশি সময় পর নেতাকে কাছ থেকে দেখার অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও উৎসুক জনতার ভিড় ছিল বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থল ৩শ ফিট পর্যন্ত। যে কারণে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছাতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে তারেক রহমানের গাড়ি বহরের। বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানের গাড়িবহর সভামঞ্চের কাছাকাছি যায়। পরে নেতাকর্মীদের ভিড়ে গাড়ি আর সামনে এগোতে পারেনি।

বিমানবন্দর থেকে জনস্রোত পেরিয়ে ৩টা ৫০ মিনিটে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে রাজধানীর পূর্বাচলে ‘৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে’ আয়োজিত এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। দলের সিনিয়র নেতারা ও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীরা এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন। গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজধানীর ৩০০ ফিটে তারেক রহমানের সংবর্ধনা মঞ্চে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ও সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমান যুগপৎ আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গেও কুশল বিনিময় করেন। এ সময় মঞ্চে তার জন্য বরাদ্দ রাখা বিশেষ চেয়ার সরিয়ে রেখে সাধারণ একটি চেয়ার টেনে বসেন।

‘আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে, সেই হাসপাতালের ঘরে’
গত ক’দিন যাবত ৩০০ ফিটের জনসভার মঞ্চে অবস্থান নেওয়া লাখো লাখো মানুষ ও দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে এরপর বক্তব্য শুরু করেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র চব্বিশের আন্দোলনের লড়াকু যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদিকে স্মরণ করলেন। যেকোন মূল্যে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ দিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালে শয্যাশায়ী বেগম খালেদা জিয়ার বিছানার পাশে মন পড়ে থাকার কথা জানালেন। গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বললেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে, সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন— অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সেজন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি এবং টেলিভিশনগুলোর মাধ্যমে যারা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন-আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’

গণসংবর্ধনা শেষ করে সন্ধ্যা ৫টা ৫২ মিনিটের দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তারেক রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের শীর্ষ নেতারা। তারেক রহমান হাসপাতালে আসার কিছুক্ষণ আগে সেখানে পৌঁছান তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। তারেক রহমানকে বহনকারী বাসটি এভারকেয়ার হাসপাতাল গেটের সামনে পৌঁছালে তিনি বাস থেকে নেমে যান। এরপর সেখান থেকে হেঁটে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করেন। তারেক রহমানের আগমন ঘিরে সকাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের গেটে অবস্থান নেন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীরা। নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে তারেক রহমানকে বহন করা গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে ঢোকার সময় কর্মী-সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এ সময় দলীয় পতাকা, ফেস্টুন নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় স্লোগান দিতে নিষেধ করা হয়েছিল। মায়ের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর পর গুলশানের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল ত্যাগ করেন তারেক রহমান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায় পৌঁছান। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার নেতাকর্মী ‘স্বাগতম তারেক রহমান’ স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে তোলেন।

ঢাকায় এসেছে বাক্সবন্দি জেবু
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে তার পোষা বিড়াল জেবুও দেশে ফিরেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মালিক তারেক রহমানের সঙ্গে সেও ঢাকায় নেমে আসে। তবে তাকে একটি লাইভ এনিমেল লেখা প্লাস্টিকের বক্সের ভেতরে করে দেশে আনা হয়। দুপুরে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দলীয় ফেসবুক পেজে বিড়ালটির বাক্সবন্দি ছবি প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ছবির ওপরে একটি ক্যাপশন দিয়ে বলা হয়, জেবু দেশে ফিরেছে। ছবিতে দুজন ব্যক্তিকে জেবু যে বাক্সে রয়েছে সেটি বহন করতে দেখা যাচ্ছে। এর আগে লন্ডন থেকে উড়াল দেওয়ার আগে তারেক রহমানের বহুল প্রশংসিত পোষা বিড়াল জেবু আনুষ্ঠানিকভাবে নিজস্ব ফেসবুক পেজ চালু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় এসেছে। তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের দত্তক নেওয়া লোমশ সাইবেরিয়ান বিড়ালটির নাম জেবু। জেবু নামেই তাকে এখন সকলে ডাকে। হালকা-হাস্যকর এবং ব্যঙ্গাত্মক সুরে লেখা এই পেজটি ইতোমধ্যেই অনলাইনে বিড়ালপ্রেমীদের মনে দাগ কেটেছে।

এই বছরের শুরুতে জেবু প্রথম জনসাধারণের কল্পনায় স্থান করে নেয়, যখন তারেক রহমানের মোবাইলের দিকে তীব্রভাবে তাকিয়ে থাকা বিড়ালের একটি ছবি ভাইরাল হয়। যা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আনন্দিত করে এবং বিশেষ করে তরুণ বাংলাদেশি এবং নিবেদিতপ্রাণ বিড়ালপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। জেবুর অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বিড়ালটি আমার মেয়ের। কিন্তু এখন এটি সকলের বিড়ালে পরিণত হয়েছে। আমরা সকলেই এটিকে ভালোবাসি এবং আদর করি।’

সবার প্রতি তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা দলের নেতাকর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও সাংবাদিকদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাতে দলের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর সুদুর লন্ডন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে (৩০০ ফিট মহাসড়ক) অগণিত মানুষের সমাগম ঘটে। ঐতিহাসিক ও নজীরবিহীন জনসমাগমে ঢাকা মহানগরী যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অভ্যর্থনা জানাতে আসা দেশবাসীকে তারেক রহমান আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

নোয়াখালীর মাটির ঘর থেকে জর্জিয়ার সিনেটে নাবিলাহ

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৭ অপরাহ্ণ
নোয়াখালীর মাটির ঘর থেকে জর্জিয়ার সিনেটে নাবিলাহ

নোয়াখালীর এক গ্রামের মাটির ঘর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট সিনেট—দূরত্বটা কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি একটি অভিবাসী পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রজন্মের পরিবর্তনের গল্প। সেই গল্পের অন্যতম মুখ নাবিলাহ ইসলাম পার্কস। বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান নাবিলাহ ২০২২ সালে জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস তৈরি করেন। তিনি হন জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী।

তবে এই জায়গায় পৌঁছানো তাঁর জন্য সরল কোনো পথ ছিল না। কংগ্রেসে যাওয়ার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। ২০২০ সালে জর্জিয়ার ৭ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মাত্র ৩০ বছর বয়সে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত না হলেও সেই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পথচলা থামাতে পারেনি।

নোয়াখালী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাবা-মায়ের সংগ্রাম

নাবিলাহর শিকড় বাংলাদেশের নোয়াখালীতে। তাঁর বাবা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আইআরএসে ফাইল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করেন। মা জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন শ্রমঘন কাজে যুক্ত ছিলেন; একসময় হার্ডিজে রান্নার কাজের পাশাপাশি ওয়্যারহাউসেও কাজ করেছেন। জর্জিয়ার সরকারি জীবনীতে তাঁর পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে আসা ‘working-class immigrants’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের সেই সংগ্রাম নাবিলাহর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাতেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তাঁর মায়ের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি ঘটনা তাঁকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার দিকে নিয়ে যায়।

কাজ করার সময় তাঁর মায়ের দুটি ডিস্কে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসা ব্যয়ের স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। নাবিলাহ তখন পরিবারের হয়ে বিষয়টি মোকাবিলায় যুক্ত হন। ২০২০ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কিশোর বয়সেই মায়ের চিকিৎসা ও বীমা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করতে হয়েছিল।

কংগ্রেসের লড়াইয়ে প্রথম বড় পরীক্ষা

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শেষ করার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনে কাজ শুরু করেন নাবিলাহ। ২০২০ সালে তিনি জর্জিয়ার ৭ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রার্থী হন।

তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর। বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নিয়ে আসে। সে সময় তিনি স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

তবে সেই নির্বাচনে তিনি জয়ী হননি। ২০২০ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ছয়জনের মধ্যে তিনি তৃতীয় হন এবং প্রায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পান।

পরাজয়ের পর নতুন পথে যাত্রা

কংগ্রেস নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পরও রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন নাবিলাহ। জর্জিয়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটারদের নিয়ে সংগঠনের কাজ করেন। পরে ২০২২ সালে জর্জিয়া স্টেট সিনেটের ৭ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে প্রার্থী হন।

সেবার তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় আসে বড় পরিবর্তন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি জর্জিয়া স্টেট সিনেটে প্রবেশ করেন এবং একই সঙ্গে তৈরি করেন ইতিহাস—প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ওই কক্ষে নির্বাচিত হন তিনি।

জর্জিয়া স্টেট সিনেটের সরকারি জীবনী অনুযায়ী, নাবিলাহ ২০২২ সালে নির্বাচিত হন এবং ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস, চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলিজ, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ভেটেরানস, মিলিটারি অ্যান্ড হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন।

ইতিহাস গড়া সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি

স্টেট সিনেটে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়ার পর নাবিলাহ ২০২৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তবে চলতি বছরের মার্চে তিনি সিনেট থেকে পদত্যাগ করেন। জর্জিয়া রেকর্ডার ও অন্যান্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচনী প্রচারে পূর্ণ সময় দেওয়ার জন্য তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৩ মার্চ ২০২৬ তাঁর সিনেট থেকে সরে দাঁড়ানোর দিন ছিল। এর আগে তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রার্থীতা দাখিল করেছিলেন।

বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের জন্য আলাদা তাৎপর্য

নাবিলাহর রাজনৈতিক পথচলায় বাংলাদেশের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়। জর্জিয়া স্টেট সিনেটের সরকারি জীবনীতে তাঁর বাবা-মাকে বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ছোটবেলায় তিনি বাবা-মাকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে এবং একাধিক চাকরি সামলাতে দেখেছেন।

তাঁর জীবনের পথচলায় তাই উঠে আসে অভিবাসী পরিবারের অর্থনৈতিক সংগ্রাম, স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।

কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে ব্যর্থতা থেকে শুরু করে স্টেট সিনেটে ইতিহাস তৈরি—নাবিলাহ ইসলামের যাত্রা দেখিয়েছে, একটি নির্বাচনে পরাজয় রাজনৈতিক পথচলার শেষ নয়। নোয়াখালীর শিকড় থাকা এক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁর উত্থান এখন বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আলোচনায়ও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

কালের আলো/জেএন

জীবন সায়াহ্নে আড্ডায় খুঁজে পান বেঁচে থাকার আনন্দ

গাইবান্ধা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ণ
জীবন সায়াহ্নে আড্ডায় খুঁজে পান বেঁচে থাকার আনন্দ

বয়স বাড়ে, কর্মজীবন থেমে যায়, কমে আসে ব্যস্ততা। যে মানুষটি একসময় পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের নানা কাজে ছুটে বেড়িয়েছেন, জীবনের এক পর্যায়ে তাকেই খুঁজতে হয় কথা বলার একজন মানুষ, একটু আড্ডা কিংবা পুরোনো দিনের গল্প শোনার কোনো আপন ঠিকানা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সেই ঠিকানাই নিজেদের জন্য তৈরি করেছেন একদল প্রবীণ। নাম দিয়েছেন ‘বেলা শেষের যাত্রী’।

সন্ধ্যা নামলেই উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চৈতন্য বাজারের একটি ছোট্ট টিনের ঘরে জড়ো হন তারা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে গল্প। কখনো মুড়িমাখা, কখনো চানাচুর-ঝাল। কেউ পত্রিকা পড়েন, কেউ প্রথম যৌবনের স্মৃতি মনে করে গান ধরেন। আবার কেউ নাটকের সংলাপ শুনিয়ে মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। চাকরিজীবনের স্মৃতি, জীবনের পাওয়া-না পাওয়া কিংবা ফেলে আসা মানুষের গল্পও ফিরে আসে সেই আড্ডায়।

‘এসো বন্ধুরা, জীবনের পড়ন্ত বিকালে ফেলে আসা অতীত জীবনের গল্প করি’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৯ সালে পাঁচজন সদস্য নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে।

বিআরডিবির অবসরপ্রাপ্ত উপপরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল ও তাঁর কয়েকজন সমবয়সী বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হয় এ পথচলা। কর্মজীবন শেষে তিনি উপলব্ধি করেন, অবসরের সঙ্গে শুধু অফিসের ব্যস্ততাই শেষ হয় না; অনেক সময় কমে যায় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও।

সেই শূন্যতা থেকেই নিজেদের বয়সী মানুষদের নিয়ে একটি মিলনস্থল তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। এরপর একে একে যুক্ত হন শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, চিকিৎসক, কৃষি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

সংগঠনের সবচেয়ে কম বয়সী সদস্যের বয়সও ষাটোর্ধ্ব। অধিকাংশ সদস্যের বয়স ৬৫ থেকে ৭৪ বছরের মধ্যে। এরই মধ্যে পাঁচজন সদস্য মারা গেছেন। তাদের অনুপস্থিতিও এখন আড্ডার গল্পের অংশ হয়ে আছে।

বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, এ আয়োজনের মাধ্যমে একাকিত্ব ও অবহেলার অনুভূতি দূরে সরে যায়। বেঁচে থাকার জন্য নতুন উদ্যম পাওয়া যায়। মনে হয়, ‘আছি তো আমরাও।’ আনন্দ ও মানসিক শক্তি পাওয়া যায়, ভালো লাগা তৈরি হয়।

এই আড্ডার গভীরতা হয়তো এখানেই। এখানে কেউ কারও কাছে বয়স লুকান না। বরং বয়সের সঙ্গে জমে থাকা স্মৃতিগুলোই পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ব্যস্ত জীবনে যে কথাগুলো বলা হয়নি, যে গল্পগুলো শোনার মানুষ পাওয়া যায়নি, সেগুলোই সন্ধ্যার পর জায়গা করে নেয় ছোট্ট ঘরটিতে।

কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, প্রবীণ মানেই অবহেলার মানুষ নন। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা সমাজের বড় সম্পদ। কর্মজীবন শেষ হলেও একজন মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। এই বয়সে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কথা বলার জায়গা, আপনজনের সঙ্গ এবং নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।

তিনি বলেন, ‘বেলা শেষের যাত্রী’ সেই জায়গাটিই তৈরি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়লে প্রবীণদের একাকিত্ব কমবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ পাবে।

তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু বলেন, প্রবীণরা আমাদের সমাজের অভিজ্ঞতার বাতিঘর। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নতুন প্রজন্মকে অনেক কিছু শেখাতে পারে। ‘বেলা শেষের যাত্রী’র মতো উদ্যোগ তাদের একাকিত্ব দূর করার পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধনও শক্তিশালী করছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে।

পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগটি এখন ৪০ জনের বেশি প্রবীণের মিলনস্থল। তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়—দিনের শেষে কয়েকটি পরিচিত মুখ, কিছু গল্প, একটু হাসি আর মন খুলে কথা বলার সুযোগ।

জীবনের বেলা হয়তো পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। কিন্তু তাদের আড্ডায় এখনো সন্ধ্যা নামে গল্প, গান আর হাসি নিয়ে। ‘বেলা শেষের যাত্রী’ তাই শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; বয়সের শেষ প্রান্তেও মানুষ যে সঙ্গ, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার আনন্দ ভাগ করে নিতে চায়, এটি তারই এক জীবন্ত গল্প।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

বাউফলে নদীভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম, ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পটুয়াখালী সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৮ অপরাহ্ণ
বাউফলে নদীভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম, ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ধুলিয়া, নাজিরপুর, কারখানা ও কাছিপাড়া ইউনিয়নের একের পর এক এলাকা বিলীন হওয়ার পথে। বর্ষা ও জোয়ারের পানির তীব্র স্রোতে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের শত শত মানুষ।

কাছিপাড়া ইউনিয়নে কারখানা নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় বিলীন হতে পারে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর তীর থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট। এছাড়া হিসাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর তীর থেকে বিদ্যালয় দুটির দূরত্ব যথাক্রমে ৭০ থেকে ৮০ ফুট।

স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে যেভাবে নদীভাঙন বাড়ছে, তাতে বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের প্রায় ৫০ ফুট জায়গা গত এক মাসেই নদীতে বিলীন হয়েছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নোমান বলেন, নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত বিদ্যালয় রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সে।

কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল চন্দ্র দাস বলেন, বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত বছর বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন কিছুটা ঠেকানো হলেও প্রায় এক মাস আগে আবার ৫০ ফুট জায়গা নদীতে বিলীন হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি মসজিদ ও বাজারও হুমকির মুখে পড়বে। বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার মতো আশপাশে কোনো জায়গা নেই বলেও জানান তিনি।

এদিকে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে ধুলিয়া ইউনিয়নের আয়তনও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ধুলিয়া লঞ্চঘাট, স্থানীয় লঞ্চঘাট বাজার, হাজারো একর ফসলি জমি ও শত শত বসতবাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে সাইক্লোন শেল্টারসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ ও সেতু নির্মাণের দাবিতে ধুলিয়ায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানববন্ধনও হয়েছে। ইউএনও সালেহ আহমেদ ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে নাজিরপুর ইউনিয়নের বড় ডালিমা, নিমদী, কচুয়া ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতভিটা, আবাদি জমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক ও বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

নাজিরপুর ইউনিয়নের ধানদী পয়েন্টসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাঙন রোধে সম্প্রতি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইউএনও সালেহ আহমেদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদও এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।

নদীভাঙনে যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একের পর এক বসতঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ভাঙনকবলিত মানুষের অভিযোগ, বছরের পর বছর জিও ব্যাগ ফেলা ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষার আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবিতে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে এসব এলাকা বাউফলের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙনকবলিত এলাকায় বার্জের মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলা হবে। এতে বস্তাগুলো পরিকল্পিতভাবে একটির ওপর আরেকটি বসানো সম্ভব হবে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থায়ী হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি