আবেগে তারেক রহমানের চোখে জল স্পর্শ করেছে সবাইকে
কালের আলো রিপোর্ট:
২০০৬ থেকে ২০২৫। মাঝখানে কেটে গেছে ১৯ বছর। দীর্ঘ সময়ে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জীবনে ঘটে গেছে অনেক কিছুই। ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার, রিমান্ডে অসহনীয় নির্যাতন, জামিনে মুক্তি পেয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য চলে যাওয়া, সেখান থেকে ভার্চ্যুয়ালি দল পরিচালনা, দলের ঐক্য-বন্ধন টিকিয়ে রাখা, ফ্যাসিস্ট রেজিমে একের পর এক মিথ্যা মামলা, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া, পাতানো সব মামলা থেকে দণ্ড ও সাজামুক্ত হওয়া অত:পর দেশে রাজসিক প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক মুহুর্ত-সব মিলিয়ে রাজনীতিতে অনেক চড়াই-উতরাই সঙ্গী হয়েছে তাঁর। নিজেকে রূপান্তরের এমন নানা দিক তাকে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য এক উচ্চতায়। করে তুলেছে আরও সংযত, ধৈর্য্যশীল ও আদর্শনিষ্ঠ। দীর্ঘ নির্বাসিত প্রবাস জীবনে বাবার কবরের পাশে দাঁড়ানো হয়নি ১৯ বছর।
বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার এক দিন পর শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) তিনি গেলেন বাবার কবর জিয়ারত করতে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত মাজার জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়েই। এরপর জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া-মোনাজাত করা হয়। কবর জিয়ারত শেষে তাদের বিদায় জানিয়ে সেখানে একা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন একজন তারেক রহমান। চশমা খুলে বারবার টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলেন বাবার জন্য চোখের পানি।
তারেক রহমানের এই কান্না স্পর্শ করেছে কাছের থেকে দূরের সবাইকে। আবেগাপ্লুত তারেক রহমান পরে আবারও মোনাজাত করেন। তৈরি হয় আবেগঘন এক পরিবেশের। এর আগে এদিন বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে তারেক রহমান শহীদ জিয়ার মাজারে পৌঁছান এবং জিয়ারত করেন। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
- বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া-মোনাজাত
- তারেক রহমানের এই কান্না স্পর্শ করেছে কাছের থেকে দূরের সবাইকে
- নিজেকে জনগণের একদম কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছেন
- তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন : মির্জা ফখরুল
- আজ শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতে যাবেন
- অংশ নেবেন এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রমে
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিএনপি’র তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান শেষবার তাঁর বাবার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের কারণে আর আসা সম্ভব হয়নি।
বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। ফলে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুর থেকে তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর জিয়া উদ্যান এলাকায় নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ব্যানার-ফেস্টুন হাতে কয়েক হাজার নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। দুপুরের দিকে গুলশানের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার গাড়িবহর। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তিনি জিয়া উদ্যানে পৌঁছান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তার নিজস্ব নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা কবরের মূল বেদিতে সাধারণ নেতাকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি।
বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের পর ওই বাসে করেই বিকাল ৫টা ৪ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশ্যে রওনা হন তারেক রহমান। আগের দিন যে বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি বিমানবন্দর থেকে এসেছিলেন এদিনও সেই বাসেই শেরেবাংলা নগর ও সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান তিনি। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে একাত্তরের বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানান। শুক্রবার বিকাল ৫টা ৪ মিনিটে জিয়া উদ্যান থেকে স্মৃতিসৌধের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টার মতো। এ সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে বিকেল ৫টা ৬ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করে দলের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। পরে রাত ১০টার দিকে স্মৃতিসৌধে পৌঁছে একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা সেরে রাত ১০টার দিকে ঢাকা উদ্দেশে রওনা হন তিনি। লাল-সবুজ পতাকার রঙে সাজানো বাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে তারেক রহমান কর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। কখনও ইশারায় তাঁর জন্য দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে দোয়া চাইতেও দেখা যায় তাকে। এই সাধারণ পরিবহনে চড়ে বাবার কবর জিয়ারতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত কৌশলী এবং আবেগপ্রবণ। তবে এই যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হাজার হাজার নেতাকর্মী বাসের একদম গা ঘেঁষে স্লোগান দিচ্ছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা মানুষের এই স্রোত ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান নিজেকে জনগণের একদম কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, যা একজন গণতান্ত্রিক নেতার জন্য কাম্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস অত্যন্ত তিক্ত, যেকোনো মুহূর্তে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা অপ্রীতিকর কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কাও অনেকের মাঝে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন : মির্জা ফখরুল
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমনে দেশের রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন মির্জা ফখরুল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রত্যাবর্তনে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে উল্লেখ করে দলের মহাসচিব বলেন, এ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মির্জা ফখরুল আরও বলেন, মানুষ এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে এবং এ স্বপ্নের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন তারেক রহমান। তিনি জনগণের কল্যাণে যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন।
এসময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছেন। আর আজ তারেক রহমানের হাত ধরে সেই গণতন্ত্র পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হবে।’
জনমনে নির্বাচনকেন্দ্রিক যে জটিলতা বা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল তা তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে কেটে গেছে বলে মন্তব্য করেন মির্জা আব্বাস। তিনি জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্টতা নিয়ে এসেছে। মানুষ এখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
আজ শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতে যাবেন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতে যাবেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সূত্রে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) জানিয়েছে, এ সময় তার সঙ্গে থাকবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা। কবর জিয়ারত শেষে তারেক রহমান নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন কার্যক্রমে অংশ নেবেন। এরপর তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের খোঁজখবর নিতে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন বলেও দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এর আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, শনিবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভোটার নিবন্ধন আবেদন করবেন তারেক রহমান। গত সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, শনিবার নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় খোলা থাকবে এবং ওইদিনই তারেক রহমান ভোটার হওয়া, ভোটার আইডি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সব কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।
কালের আলো/জেএন/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array