তারকাদের ঝলমলে জীবনের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। নতুন সিনেমা, প্রেম, বিয়ে, সন্তান কিংবা চেহারার পরিবর্তন—তারকাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের প্রায় সবকিছুই আলোচনায় থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সেই আগ্রহের পাশাপাশি বেড়েছে ট্রলিংও।
বিশেষ করে অভিনেত্রীদের পোশাক, বয়স, চেহারা, বিয়ে, মাতৃত্ব থেকে শুরু করে পেশাগত সিদ্ধান্ত—কোনো কিছুই যেন সমালোচনার বাইরে থাকছে না। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্তের দায়ও অনেক সময় শুধু স্ত্রীর ওপর চাপানো হচ্ছে। পুরুষ তারকার ক্ষেত্রে যে বিষয় স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়, একই ঘটনায় নারী তারকাকে শুনতে হচ্ছে কটাক্ষ।
বলিউডের কয়েকজন আলোচিত তারকা দম্পতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ও পুরোনো ঘটনাগুলোতে এমন বৈপরীত্যের চিত্র দেখা গেছে।
মা হওয়ার পর ক্যাটরিনার চেহারা নিয়ে কটাক্ষ
ক্যাটরিনা কাইফ ও ভিকি কৌশল ২০২১ সালে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালে তাঁদের ঘরে আসে ছেলে ভিহান। ৪২ বছর বয়সে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ক্যাটরিনার শরীর ও চেহারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে।
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর ক্যাটরিনার পুরোনো ও বর্তমান ছবি পাশাপাশি রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনা করেন অনেকে। তাঁর ওজন ও চেহারা নিয়েও করা হয় নানা মন্তব্য।
তবে একই সময়ে ভিকি কৌশলের চেহারাতেও বয়স ও সময়ের প্রভাব দেখা গেলেও তাঁকে একই মাত্রায় এমন মন্তব্যের মুখে পড়তে দেখা যায়নি।
পুরুষ অভিনেতার চুলে পাক ধরা কিংবা মুখে বয়সের ছাপ পড়লে অনেক সময় সেটিকে ‘পরিণত লুক’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নারী অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে একই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—তিনি আগের মতো দেখতে নন কেন?
ক্যাটরিনার পাশে দাঁড়িয়েছেন সালমান খান, পরিণীতি চোপড়া থেকে পাকিস্তানি অভিনেতা আলী জাফরও। আলী জাফর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে আরও সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
সালমান খানও তারকাদের ওজন, চেহারা, পরিবার, সিনেমার সাফল্য কিংবা মা হওয়া নিয়ে ট্রলিংয়ের সমালোচনা করেন।
দীপিকার ‘বেবি বাম্প’ নিয়েও প্রশ্ন
রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন ২০১৮ সালে বিয়ে করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের প্রথম সন্তান দুয়ার জন্ম হয়। পরে তাঁরা দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের বাবা-মা হয়েছেন।
প্রথমবার দীপিকার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশের পর শুভকামনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশে তাঁর ‘বেবি বাম্প’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ এমনকি সেটিকে ‘ভুয়া’ বলেও দাবি করেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রণবীরের সঙ্গে ভোট দিতে গিয়ে প্রকাশ্যে আসার পর সেই আলোচনা আরও বাড়ে। পাপারাজ্জিদের ধারণ করা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কেউ প্রশ্ন করেন, দীপিকা আদৌ অন্তঃসত্ত্বা কি না। কেউ আবার তাঁর বেবি বাম্পকে ‘নকল’ বলেন।
এ সময় সাংবাদিক ফায়ে ডি’সুজা দীপিকার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি ভোট দিতে বেরিয়েছেন, নিজের শরীর বা গর্ভাবস্থা নিয়ে কারও মতামত জানতে চাননি। তাঁর পোস্টে আলিয়া ভাট, পূজা ভাট, শাহিন ভাট ও সোনি রাজদানসহ অনেকে প্রতিক্রিয়া জানান।
দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরও একই ধরনের আলোচনা ফিরে আসে। সন্তানের জন্মের পর দুই সন্তানের বয়সের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সন্তান নেওয়া স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্ত হলেও গর্ভাবস্থা, শারীরিক পরিবর্তন কিংবা সন্তান নেওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্নের বড় অংশই অনেক সময় মায়ের দিকেই যায়।
কিয়ারার অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়েও ব্যক্তিগত জীবন টানা
সম্প্রতি ‘টক্সিক’ ছবির অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে আলোচনায় আসেন কিয়ারা আদভানি। বিশেষ করে ‘তবাহী’ গানে কিয়ারা ও যশের কিছু দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সমালোচনা শুধু দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিয়ারা বিবাহিত এবং মা—এই বিষয়টিও টেনে আনেন অনেকে। প্রশ্ন ওঠে, একজন বিবাহিত ও সন্তানের মা অভিনেত্রীর এমন দৃশ্যে অভিনয় করা উচিত কি না।
এখানে আলোচনায় আসে আরেকটি বিষয়। ওই দৃশ্যে কিয়ারা একা নন; তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন যশ। তিনিও বিবাহিত এবং এক কন্যাসন্তানের বাবা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত জীবন টেনে আক্রমণের বড় অংশ গেছে কিয়ারার দিকেই।
কিয়ারার পাশে দাঁড়িয়েছেন ছবির আরেক অভিনেত্রী হুমা কুরেশি। সহশিল্পী যশও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। টালিউড অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ও প্রশ্ন তুলেছেন—বিয়ে ও মাতৃত্বের পর একজন নারী শিল্পীর কাছ থেকে কেন নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রত্যাশা করা হবে?
সাইফের বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কারিনাকে ‘বুড়ি’ কটাক্ষ
সাইফ আলী খান ও কারিনা কাপুর দুজনই দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। বয়সের সঙ্গে দুজনের চেহারাতেই স্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে।
সাইফ নিজেও বয়স বাড়ার পর শরীর ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কারিনাকে বয়স ও চেহারা নিয়ে বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে।
২০২২ সালে তাঁর যোগব্যায়ামের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বলিরেখা ও চেহারা নিয়ে নানা মন্তব্য করা হয়। কেউ কেউ তাঁকে ‘বুড়ি’ বলেও কটাক্ষ করেন।
পরে কারিনা সেই মন্তব্যের জবাব দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—বয়সে বড় হওয়া অপমানের কিছু নয় এবং বয়সের সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতাও বাড়ে।
মা হওয়ার সময় নিয়েও প্রশ্ন শুনেছেন আলিয়া
২০২২ সালে রণবীর কাপুরকে বিয়ের কয়েক মাস পর মেয়ে রাহার জন্ম দেন আলিয়া ভাট। তখন ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময় পার করছিলেন তিনি।
অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশের পর অভিনন্দনের পাশাপাশি তাঁকে শুনতে হয় নানা প্রশ্ন। কেউ জানতে চান, ক্যারিয়ারের এমন সময়ে কেন মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কেউ বলেন, আলিয়া মা হওয়ার জন্য ‘তাড়াহুড়া’ করেছেন। আবার কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে তাঁর অভিনয়জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আলিয়া পরে এসব প্রশ্নের জবাব দেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, সন্তান হওয়ার কারণে তাঁর পেশাগত জীবন কেন বদলে যাবে?
অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে তিনি কাজ থেকে বিরতি নেবেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পরও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন আলিয়া। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি একজন নারী, কোনো ‘পার্সেল’ নন।
রণবীরও একই সময়ে বাবা হয়েছেন এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল দুজনের। কিন্তু জনপরিসরের আলোচনায় বারবার সামনে এসেছে আলিয়ার ক্যারিয়ার এবং তিনি কখন মা হলেন—এই প্রশ্ন।
বিরাটের ব্যর্থতার দায়ও কখনো গেছে আনুশকার ওপর
বিরাট কোহলি ও আনুশকা শর্মা তাঁদের সন্তানদের প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। পরিবারের ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করার ইচ্ছার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
তারপরও তাঁদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে। এমনকি বিরাটের বিদেশে বেশি সময় কাটানোর সিদ্ধান্তের পেছনেও আনুশকার প্রভাব রয়েছে—এমন দাবি করেছেন কেউ কেউ।
বিরাটের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে খারাপ সময় গেলেও একাধিকবার ট্রলের নিশানায় পড়েছেন আনুশকা। মাঠে বিরাটের ব্যর্থতার জন্যও তাঁকে দায়ী করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী।
অথচ একজন ক্রিকেটারের মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর সরাসরি সম্পর্ক থাকার কোনো কারণ নেই। তবুও এমন ঘটনায় আনুশকার ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে আনা হয়েছে।
একই ঘটনায় কেন আলাদা মাপকাঠি?
ঘটনা আলাদা, তারকাও আলাদা। কখনো চেহারা ও বয়স, কখনো মাতৃত্ব, কখনো পেশাগত সিদ্ধান্ত; আবার কখনো স্বামীর ক্যারিয়ার কিংবা পরিবারের যৌথ সিদ্ধান্ত। তবে এসব ঘটনার মধ্যে একটি বিষয় বারবার দেখা যায়—সমালোচনার কেন্দ্রে চলে আসছেন নারী তারকারা।
ক্যাটরিনার শরীর বদলালে প্রশ্ন ওঠে, ভিকির ক্ষেত্রে নয়। দীপিকার বেবি বাম্প নিয়ে চলে বিচার-বিশ্লেষণ। একই অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করেও যশের তুলনায় বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্নের মুখে পড়েন কিয়ারা। সাইফের বয়স বাড়াকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হলেও কারিনার বলিরেখা হয়ে ওঠে কটাক্ষের বিষয়। রণবীর-আলিয়ার যৌথ সিদ্ধান্তেও প্রশ্ন ওঠে আলিয়া কেন তখন মা হলেন। বিরাটের মাঠের ব্যর্থতার আঁচও গিয়ে পড়ে আনুশকার ওপর।
বিয়ে বা সন্তান হওয়ার পর একজন অভিনেত্রীর শরীর বদলাতে পারে। বয়সের সঙ্গে চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। স্ত্রী কিংবা মা হওয়ার পরও একজন নারী নিজের পেশায় আগের মতো কাজ করতে পারেন।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু প্রতিক্রিয়ায় এখনো নারী ও পুরুষ তারকাদের জন্য ভিন্ন ধরনের প্রত্যাশা দেখা যায়। একই সিদ্ধান্তে স্বামীকে যে প্রশ্ন করা হয় না, স্ত্রীকে করা হয়। একই দৃশ্যে পুরুষ সহশিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন সামনে না এলেও নারী সহশিল্পীর ক্ষেত্রে তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বলিউডের এসব ঘটনা তাই শুধু কয়েকজন তারকাকে ঘিরে ট্রলিংয়ের বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও পুরুষ তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, বয়স, শরীর, মাতৃত্ব ও পেশাগত সিদ্ধান্তকে দেখার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এতে সামনে আসে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array