নৌবাহিনীর সদস্যদের স্বপ্নপূরণ, চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু
বাংলাদেশ নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজ। এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তবতা। প্রায় ২ বছর ৯ মাস আগে এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণের পর নৌবাহিনীর সদস্যরা অনুরোধ জানিয়েছিলেন একটি মানসম্মত ও আধুনিক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার। অবশেষে এলো এক কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ। আক্ষরিক অর্থেই এক দুর্বোধ্য স্বপ্নের বাস্তবায়ন। চট্টগ্রামের বানৌজা ঈসা খান সংলগ্ন বন্দরটিলা এলাকায় বুধবার (২৯ এপ্রিল) নবনির্মিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হলো। নৌবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জন্য একেকটা ক্ষণ হিরণ্ময়।
স্বপ্নপূরণের স্বাক্ষী হয়েই এদিন নবনির্মিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। স্বভাবতই উচ্ছ্বাস আনন্দের বাতাবরণেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। ছিলেন পুরোপুরি ফুরফুরে মেজাজে, প্রাণবন্ত হয়েই। স্বপ্নের সুরভি ছড়িয়েই উচ্চারণ করলেন-‘এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না, এটি ছিল এক দীর্ঘ চ্যালেঞ্জিং যাত্রা। আমাদের সকলের সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল এটিকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছে।’
ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায়ের সূত্রপাত করে তিনি বলেন, ‘নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে নৌ সদস্যরা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন একটি মানসম্মত মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। নৌ সদস্যদের এই স্বপ্নের মূল চালিকাশক্তি ছিল বিগত দিনের এক বাস্তব প্রয়োজনীয়তা, যা আমি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে অনুধাবণ করেছি। আজ সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন সমগ্র নৌ পরিবারের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আর এজন্য আমি মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি, আলহামদুলিল্লাহ।’
চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত
চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করলো বাংলাদেশ নৌবাহিনী। চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজ। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত এই মেডিকেল কলেজটি উপকূলীয় অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর নীতিমালা অনুসরণ করে ইতোমধ্যে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে ৫০ জন বেসামরিক শিক্ষার্থী নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এমবিবিএস কোর্স শুরু হয়েছে।

এই মেডিকেল কলেজটির মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যখাতের জন্য দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করা, যারা সমাজের সকল স্তরে সকল পরিস্থিতিতে কার্যকর চিকিৎসা প্রদান করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি দুর্যোগকালীন চিকিৎসা এবং সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় গবেষণা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে চিকিৎসা সেবায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হবে।
- চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত
- নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজ স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন
- নৌবাহিনী দেশ গড়ার ক্ষেত্রে দীপ্ত স্বাক্ষর রেখে চলেছে
প্রতিষ্ঠানটিতে আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, উন্নত শ্রেণিকক্ষ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বয়ে মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুদক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া এই কার্যক্রমে নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে পরিচালিত নেভি মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম দেশের স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজ স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌবাহিনী প্রধান বলেন, চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত এ মেডিকেল কলেজ স্বাস্থ্যখাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দক্ষ, নৈতিক ও পেশাদার চিকিৎসক তৈরির মাধ্যমে এটি সশস্ত্র বাহিনীর চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং একইসঙ্গে দেশের সাধারণ জনগণের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
নৌবাহিনী দেশ গড়ার ক্ষেত্রে দীপ্ত স্বাক্ষর রেখে চলেছে
এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমরা জানি একটি জাতির প্রকৃত শক্তিই তার প্রতিরক্ষা সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে না বরং তা নিহিত থাকে উন্নত শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও মেধাবী প্রজন্ম তৈরির সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মূল দায়িত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং দেশের সমুদ্রসীমা নিশ্চিত করা। তবে এর পাশাপাশি জাতীয় যেকোন ক্রান্তিলগ্নে সরকারের নির্দেশনায় আমরা যেকোন সেবায় আত্মনিয়োগ করতে এবং যেকোন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে বদ্ধপরিকর। আপনারা দেখেছেন বিগত ২০২৪ এর জুলাই আগস্ট থেকে শুরু করে অদ্যাবধি নৌ সদস্যরা দেশের প্রয়োজনে আত্মনিয়োগ করেছেন, অসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করে চলেছেন।’

সমুদ্রসীমা রক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রদানের মাধ্যমে নৌবাহিনী দেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার দীপ্ত স্বাক্ষর রেখে চলেছে বলেও মন্তব্য করেন নৌবাহিনী প্রধান। তিনি বলেন, ‘সেই সফলতারই এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হলো নেভি মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রাম। এই প্রতিষ্ঠান কেবল নৌ সদস্যের সন্তানদের জন্যই নয় বরং দেশের সকল মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্নপূরণে এক নব দিগন্তের সূচনা করবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কেবল এই কলেজ থেকে দক্ষ চিকিৎসকই তৈরি হবে না বরং এখান থেকে গড়ে উঠবে একদল মানবিক দায়বদ্ধ পেশাজীবী যারা গভীর জ্ঞান, উন্নত নৈতিক মূল্যবোধ ও অদম্য কর্তব্যপরায়ণতায় আর্তমানবতার সেবায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করবে।’
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array