এমআইএসটির ড্রোনে চোখ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার, আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিশেষ গুরুত্ব
দেশের প্রযুক্তিগত শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশেও রেখেছে অনন্য অবদান। রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী পরিচালিত এই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণামুখী কার্যক্রম এবার সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। বুধবার (১৩ মে) তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন। সামরিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এমআইএসটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত রোবটিক্স, ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প ঘুরে দেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
আমন্ত্রিত শিক্ষক হিসেবে এমআইএসটির নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ বক্তব্য রেখেছেন। যেখানে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পারমাণবিক সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত মাত্রা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এমআইএসটিতে অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যেও তিনি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হওয়ার বিষয়েও জোর দিয়েছেন। দেশের প্রযুক্তি নির্ভর উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার গৌরবময় অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ এমআইএসটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র। এমআইএসটির গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ, প্রকল্প ও একাডেমিক কার্যক্রমকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’
পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত
রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) আমন্ত্রিত শিক্ষক হিসাবে পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছেন, পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এমআইএসটির নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আওতায় জাতীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন।

ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে বাংলাদেশের দায়িত্ব, পারমাণবিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং বাংলাদেশে পারমাণবিক সুরক্ষার বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে বিশদ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।’ পারমাণবিক সুরক্ষায় বৈশ্বিক উদ্বেগ প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক স্থাপনা, উপাদান, প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সুরক্ষা কেবল কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হুমকি, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বলতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এখন পারমাণবিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।’ বাংলাদেশের অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত নীতিমালা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অপরিহার্য।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার সুরক্ষায় পেশাদারিত্ব, সতর্কতা, প্রযুক্তিগত সচেতনতা এবং সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় দায়িত্ববোধ, উচ্চমানের প্রস্তুতি এবং আন্তঃসংস্থাসমূহের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে পারমাণবিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরে তিনি বলেন, পারমাণবিক সুরক্ষা এখন বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বাস্তবায়নের অংশ। ভৌত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ হুমকি প্রতিরোধ, জরুরি সাড়া প্রদান, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ, জনসচেতনতা এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এই ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তিনি এই বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নীতিগত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তৃতা শেষে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং পারমাণবিক সুরক্ষার প্রায়োগিক, নীতিগত ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন। পরে এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে এমআইএসটিতে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানসমৃদ্ধ দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণামুখী কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব একটি পবিত্র জাতীয় অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এমআইএসটিতে অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন-‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব কেবল একটি পেশাগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি পবিত্র জাতীয় অঙ্গীকার। দেশপ্রেম কোনো আবেগমাত্র নয়; বরং এটি শৃঙ্খলা, সততা, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রমাণ করার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জাতীয় সংকটময় সময়গুলোতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সবসময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিরুদ্ধে যেকোন ষড়যন্ত্র, বিশৃঙ্খলা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।’ জনগণের আস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি- যোগ করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।
এ সময় এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মোঃ হাকিমুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণরত তরুণ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্ম কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি লাখো মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ফসল। ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিলগ্নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দিকনির্দেশনা ও সাহস জুগিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক আহ্বান তরুণদের সংগঠিত করেছিল এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মনোবলকে শক্তিশালী করেছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেছে। তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করা তরুণ কর্মকর্তাদের জাতীয় দায়িত্ব।
সামরিক নেতৃত্বকে প্রযুক্তি ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে
বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল ট্যাংক, কামান, বিমান বা প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বর্তমান সময়ে সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, তথ্যযুদ্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। এখন কোন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই তার আর্থিক ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক যোগাযোগ, জনমত ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আঘাত করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, পারমাণবিক নিরাপত্তা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। পারমাণবিক নিরাপত্তা শুধু কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত নিরাপত্তা চিন্তার অংশ। তরুণ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সচেতন, দায়িত্বশীল ও পেশাগতভাবে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। উপদেষ্টা দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (অও) সিদ্ধান্ত সহায়তা ব্যবস্থা, নিরাপদ ট্যাকটিক্যাল কমিউনিকেশন, কমান্ড কন্ট্রোল ও সার্ভেইলেন্স সিস্টেম এবং তথ্য বিভ্রান্তি প্রতিরোধে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে
তিনি বলেন, সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সবকিছু বিদেশ থেকে ক্রয় করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতায় নকশা, পরীক্ষা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও সুরক্ষা করতে পারে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এই লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
একজন সামরিক কর্মকর্তা কেবল একজন কমান্ডার নন; তিনি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের তরুণ সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব। তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, একজন সামরিক কর্মকর্তা কেবল একজন কমান্ডার নন; তিনি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সৈনিকরা তাদের কর্মকর্তাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম অনুসরণ করে। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে হতে হবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল। দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়ানো, যুদ্ধে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা এবং বিভ্রান্তির সময়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন কর্মকর্তার মৌলিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উগ্রবাদ, বিভাজনমূলক প্রচারণা, গুজব, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বাস, সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মধ্যপন্থার দেশ। ধর্ম মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসকে শক্তিশালী করে; কিন্তু ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা জাতীয় ঐক্য নষ্ট করতে পারে। তাই তরুণ কর্মকর্তাদের চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িকতা, মব মানসিকতা এবং বিভ্রান্তিকর বয়ানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনা সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও প্রশ্ন করা জ্ঞানের অংশ; কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি। জুলাইয়ের জাতীয় চেতনা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও নবায়নের আহ্বানকে সামনে এনেছে। ১৯৭১ এবং জুলাইকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে না। একটি আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, অন্যটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনর্জাগরণের আহ্বান।

এমআইএসটি থেকে অর্জিত শিক্ষা বাহিনীর কাজে লাগাতে হবে
অর্জিত জ্ঞানকে কেবল সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করতে হবে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘ইউনিট ও ফরমেশনে ফিরে গিয়ে এমআইএসটি থেকে অর্জিত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে বাহিনীর কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন, সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থে জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’ তরুণ কর্মকর্তাদের পাঠাভ্যাস, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিতর্ক, সামরিক ইতিহাস অধ্যয়ন এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধসমূহ থেকে শিক্ষা নেওয়ারও আহ্বান জানান উপদেষ্টা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পখাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বড় দায়িত্ব ও প্রকল্পে নিয়োজিত হলে সততা, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত পেশাগত জীবন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এটি গড়ে উঠবে শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তা, দেশপ্রেম, জ্ঞান, সাহস, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে।’ ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম তরুণ কর্মকর্তাদের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তরুণ কর্মকর্তাদের শিক্ষা যেন শুধু যোগ্যতার সনদে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন পেশাগত উৎকর্ষ, সৎ নেতৃত্ব, জাতীয় দায়িত্ববোধ, উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা এবং সাহসের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। আল্লাহ যেন সবাইকে প্রিয় বাংলাদেশকে সেবা করার শক্তি, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা দান করেন, এই প্রার্থনা করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array