আম রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা, বাধা বিমান ভাড়া-কার্গো সংকট: কৃষিমন্ত্রী
দেশের আম বিশ্ববাজারে অন্যতম রপ্তানিপণ্যে পরিণত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম উপযোগী। তবে নীতিগত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে আয়োজিত ‘আম রপ্তানির শুভ উদ্বোধন’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মূলত প্রবাসী বাঙালিদের লক্ষ্য করে আম রপ্তানি হচ্ছে। তবে প্রকৃত অর্থে রপ্তানি সফল হবে তখনই, যখন বিদেশি নাগরিকরাও বাংলাদেশের আম খেতে শুরু করবেন।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে কৃষিপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলো কৃষি খাতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে থাকে। বাংলাদেশকেও রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।
মন্ত্রী জানান, সম্প্রতি চীন বাংলাদেশ থেকে বড় আকারে কাঁঠাল আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। এ জন্য তারা বাংলাদেশে প্যাকেজিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় জাতের আমের স্বাদ বিশ্বমানের। দেশীয় জাতের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সংরক্ষণক্ষম ও আকর্ষণীয় জাত উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের কাজ করতে হবে।
আম রপ্তানির প্রধান বাধা হিসেবে বিমান ভাড়া ও কার্গো সংকটের কথা তুলে ধরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, পচনশীল কৃষিপণ্যের জন্য আলাদা কার্গো সুবিধা জরুরি। বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নতুন বিমান যুক্ত হলে ভবিষ্যতে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ বাড়বে। তবে কার্গো ফ্লাইট চালু রাখতে নিয়মিত সংযোগ ও পর্যাপ্ত রপ্তানি নিশ্চিত করতে হবে।
কীটনাশকের ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজার এখন শুধু স্বাদ নয়, নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাও চায়। তাই রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’-এর পরিচালক আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। সঠিক তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় উঠে আসতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, ইতালিসহ ৩৬টি দেশে বাংলাদেশের আম রপ্তানি হচ্ছে। আম্রপালি, ফজলি, হিমসাগর ও হাড়িভাঙ্গাসহ সাতটি প্রিমিয়াম জাত আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানি করা হচ্ছে।
তবে রপ্তানির বড় বাধা হিসেবে তিনি বিমানের অতিরিক্ত ফ্রেইট চার্জ ও কার্গো স্পেস সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, তৈরি পোশাক খাতের চাপের কারণে অনেক সময় আমের চালান অফলোড হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মনসুর বলেন, থাইল্যান্ড বা পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের এয়ার ভাড়া প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। এছাড়া বিমানবন্দরে কোল্ড চেইন ও আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার অভাবেও রপ্তানিকারকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দুই দশকেও একটি ডেডিকেটেড কার্গো ফ্লাইট চালু না হওয়া বড় ব্যর্থতা। বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর বাণিজ্যিক উইংও আমের বাজার সম্প্রসারণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা শেখ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আম যেহেতু পচনশীল পণ্য, তাই একে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে নির্দিষ্ট কার্গো স্পেস বরাদ্দ করা প্রয়োজন। কৃষি ও বিমান মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের মিষ্টি আমের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আম রপ্তানি বাড়াতে সংরক্ষণ, ক্যানিং, আধুনিক প্যাকেজিং ও ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে কার্গো ভাড়ায় বিশেষ ভর্তুকি বা সাবসিডি দেওয়ার বিষয়েও সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ওজন কারচুপি বন্ধের ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array