আম উৎপাদনে শীর্ষে তবুও রপ্তানিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ
ফলের রাজা আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। বাংলাদেশ শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশের তালিকার শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মূল তালিকায় নাম নেই। কারণ রপ্তানি হয় নামমাত্র। অথচ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে লক্ষাধিক টন আম রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা মনে করেন, বাংলাদেশ মূলত বেশি বিমানভাড়া এবং বড় অবকাঠামোগত ও কৌশলগত দুর্বলতার কারণে রপ্তানিতে পিছিয়ে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বার্ষিক ২৫ থেকে ২৮ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন করে বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম থেকে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। কিন্তু বিশ্ব আম রপ্তানি বাজারের শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না।যদিও গত বছর বিশ্বের ২৯টি দেশে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। সবকিছু হিসাবে নিলে এ থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে একশ কোটি টাকারও নিচে।
সম্প্রতি খামারবাড়ির কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বিএআরসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে ২৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। তবে সে সময়ে রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। যা দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি। সংখ্যার হিসাব করলে বাংলাদেশ এখন কাগজে-কলমে বিশ্বের ২৬টি দেশে আম রপ্তানি করে। পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড নিরাপদ পদ্ধতিতে আম উৎপাদন ও রপ্তানি করে। শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত মানসম্মত ও নিরাপদ আম রপ্তানি করে শীর্ষে উঠে এসেছে নেদারল্যান্ডস। শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেই ৩৬ শতাংশ আম রপ্তানি করে দেশটি। ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যাান্ডের মতো দেশগুলোও রয়েছে শীর্ষ উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়। অথচ শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার পরও ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা দৃশ্যমান নয়।
প্রবন্ধ উপস্থাপক আরিফুর রহমান আরও বলেন, উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে নিরাপদ আম উৎপাদন না করা, উৎপাদনে আমদানিকারক দেশের শর্ত পরিপালন না করা, সংগ্রহোত্তর গুণগত মান বজায় রেখে গ্রেডিং, প্যাকিং করে কুলিং ভ্যানে আম পরিবহন না করা, আমে উপস্থিত পেস্টিসাইডের রেসিডিউ অ্যানালাইসিস ও ফলের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব না থাকা; প্রয়োজনীয় উপকরণ ফ্রুট ব্যাগ ও অন্যান্য উপকরণ প্রতিযোগিতামূলক দামে না পাওয়া, কম সেলফ লাইফ, সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে যথাযথ প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার না করা, নতুন বাজার সৃষ্টি করতে না পারা, ব্রান্ডং ইমেজ তৈরি না করা রপ্তানি বাজার ধরতে না পারার বড় কারণ।
জানা যায়, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, সুইডেনসহ আরও কিছু দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছে। পাশাপাশি গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়। এ বছর নতুন করে মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- সব নিয়ম মেনে যতটুকু রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন হচ্ছে সেটাও রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না মাত্রাতিরিক্ত বিমান ভাড়ার কারণে। এই দেশ থেকে আম রপ্তানিতে প্রতি কেজির বিমান ভাড়া প্রায় ৫০০ টাকার ওপরে। ফলে উৎপাদনের পর কোনো একটি দেশে আম পাঠাতে ৭০০ টাকার মতো খরচ হয়। এতে প্রত্যাশিত পরিমাণে আম বিদেশে পাঠাতে পারছেন না রপ্তানিকারকরা।
দেশের অন্যতম শীর্ষ আম ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, গত বছরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিমান ভাড়ার কারণে হয়নি। এ বছর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। আমরা খুব হতাশ।
তিনি বলেন, কয়েকদিন হলো আমরা সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শুরু করেছি। তবে, শুরুতে উড়োজাহাজের ভাড়া বেড়ে সব রেকর্ড ভেঙেছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো প্রতি কেজি আম যুক্তরাজ্যে পাঠাতে ৫০৫ টাকা নিচ্ছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা একই দূরত্বে সরকারি বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের ভাড়া হচ্ছে ৫৮০ টাকা।
আম রপ্তানির ক্ষেত্রে প্লেন ভাড়ার প্রসঙ্গটি এখন সরকারেরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের কয়েকদিন আগে চলতি বছরের আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠাতে প্লেন ভাড়া বেশি গুনতে হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্লেন ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রী হওয়ার আগে আমিও এ দুঃখের সঙ্গী ছিলাম। তখন কার কাছে যে বলি এই দুঃখের কথা, সে জায়গাটাও ছিল না। ওমুক সাহেবের কাছে গেলে বলে, এটা আমার কাজ নয়, তমুক সাহেবের কাছে দৌড়ান। এই সাহেবদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের জুতা যে কত জোড়া ক্ষয়ে গেছে সে হিসেব নেই। এ সময় মন্ত্রী রপ্তানিকারকদের উদ্দেশে বলেন, এ বাস্তবতা আমি জানি। যে কারণে আমি আপনাদের কাছে কথা দিচ্ছি, কৃষিমন্ত্রী হিসেবে থাকতেই ইনশাআল্লাহ এ সমস্যার সমাধান হবে।
কালের আলো/এমএএএমকে




আপনার মতামত লিখুন
Array