রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৮৮ হাজার কোটি টাকা
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড হলেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে লক্ষ্য ও অর্জনের ব্যবধান এখনও বড় রয়ে গেছে।
রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যে আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এসব টাস্কফোর্স করসংক্রান্ত আপিল, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ এবং বকেয়া আদায়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে অতিরিক্ত আদায় হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
জুন মাসের প্রথম ২০ দিনেই আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ফলে ২০ জুন পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা, যা ইতোমধ্যে গত অর্থবছরের পুরো বছরের রাজস্ব আদায়কে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে রাজস্ব আহরণের এই রেকর্ডের আড়ালে রয়েছে বড় বাস্তবতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। ফলে মে মাস পর্যন্ত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব ঘাটতি কেবল একটি সংখ্যাগত সমস্যা নয়; এটি সরাসরি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ঋণনির্ভরতার ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ যেমন বেতন-ভাতা, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধ কমানোর সুযোগ সীমিত। ফলে রাজস্ব কম হলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করার চাপ তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি সরকারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ জাতীয় বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থ আসে এনবিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্ব থেকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় বাজেটের বাধ্যতামূলক খাত হওয়ায় এসব ব্যয় কমানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
ফলে রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে উন্নয়ন খাতে। অর্থসংকট দেখা দিলে সাধারণত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নেয় সরকার। চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, বাস্তবায়ন গতি এবং নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রবণতা থেকে সরকার এখনও বের হতে পারেনি। তার মতে, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কর প্রশাসনে সংস্কার ছাড়া টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array