খুঁজুন
                               
, ,
           

বিরোধী দল শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫৫ অপরাহ্ণ
বিরোধী দল শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল

জাতীয় প্রেস ক্লাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর/ছবি: জিএম মুজিবুর

বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান বিরোধী দলের বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে বিরোধী দলের সমালোচনা সংসদের ভেতরেই হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সেই পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় জুলাই সনদ প্রণয়ন সম্ভব হয়েছে।

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি কখনোই সংস্কারবিরোধী নয়।

বরং দলটি সবসময় প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি, জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করেনি।

তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অনাগ্রহী– এ ধরনের প্রচারণা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, গণভোটে উত্থাপিত চারটি বিষয়ের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির সম্মতি ছিল। তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কিছু বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে কারণেই ওই অংশে দলটির আপত্তি রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই ঘোষণার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে সংস্কার নাকি সংশোধন– এ ধরনের শব্দগত বিতর্ক অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করছে।

বিরোধী দলের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেটি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। সেখানে আলোচনা শেষে একমত না হলে বিরোধিতা করা যেতে পারে। কিন্তু এখন যেভাবে বিরোধী দলের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের সমালোচনা করা এবং ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা। তবে সেই সমালোচনা গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। রাস্তায় আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও সেটি যেন কোনোভাবেই সংঘাতের দিকে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন। এ অবস্থায় সরকারকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে শুধু নেতিবাচক প্রচারণা চালালে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। দেশের স্বার্থে সংঘাত নয়, সহনশীলতা ও ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। পাশাপাশি বেকার সাংবাদিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি।

সরকারের মেয়াদ মাত্র পাঁচ মাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত অল্প সময়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় ও সহযোগিতা দিলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হবে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবার ও সন্তানদের রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখভালের বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দেবে।

আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক ও সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

৫ আগস্ট রাজধানীতে যান চলাচলে ডিএমপির নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫০ পূর্বাহ্ণ
৫ আগস্ট রাজধানীতে যান চলাচলে ডিএমপির নির্দেশনা

রাজধানীর শাহবাগের ৩৬ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উন্মুক্ত কনসার্ট এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও খেজুর বাগান ক্রসিং থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত এলাকায় যান চলাচল সীমিত থাকবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) (৫ আগস্ট) ভোর ৫টা থেকে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া পর্যন্ত বিকল্প ট্রাফিক রুট নির্ধারণ করেছে।

শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখী যানবাহনের জন্য

ফার্মগেট থেকে শাহবাগ: হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং থেকে বামে মোড় নিয়ে হেয়ার রোড বা মিন্টো রোড ব্যবহার করতে হবে।

গোলাপশাহ মাজার, হাইকোর্ট ও মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ: কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে।

সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ: মিরপুর রোড–নিউ মার্কেট–আজিমপুর–চাঁনখারপুল–বকশীবাজার ক্রসিং হয়ে গন্তব্যে যেতে হবে। অথবা বাটা ক্রসিং/কাটাবন ক্রসিং থেকে ডানে বা বামে মোড় নিয়ে হাতিরপুল বা নীলক্ষেত-পলাশী ক্রসিং ব্যবহার করতে হবে।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও শেরেবাংলা নগর এলাকার জন্য:

মিরপুর রোড থেকে ফার্মগেট/সোনারগাঁও: গণভবন ক্রসিং থেকে বামে মোড় নিয়ে লেক রোড–উড়োজাহাজ ক্রসিং–বিজয় সরণি ক্রসিংয়ে ডানে মোড় নিয়ে ফার্মগেটের দিকে যেতে হবে।

ফার্মগেট থেকে ইন্দিরা রোড হয়ে গণভবন: খেজুর বাগান ক্রসিং থেকে ডানে মোড় নিয়ে উড়োজাহাজ ক্রসিং–বামে মোড় নিয়ে লেক রোড হয়ে গণভবন ক্রসিংয়ের দিকে যেতে হবে।

ধানমন্ডি ২৭ থেকে ফার্মগেট: আসাদগেট–গণভবন ক্রসিংয়ে ডানে ইউটার্ন নিয়ে লেক রোড–উড়োজাহাজ ক্রসিং–বিজয় সরণি হয়ে ফার্মগেট যেতে হবে।

আসাদগেট থেকে ফার্মগেট: গণভবন ক্রসিং থেকে ডানে মোড় নিয়ে লেক রোড–উড়োজাহাজ ক্রসিং–বিজয় সরণি হয়ে ফার্মগেট পৌঁছাতে হবে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে/ইন্দিরা রোড থেকে ধানমন্ডি: খেজুর বাগান ক্রসিং থেকে ডানে মোড় নিয়ে উড়োজাহাজ ক্রসিং–বামে মোড় নিয়ে লেক রোড–বামে মোড় নিয়ে আসাদগেট হয়ে সোজা ধানমন্ডির দিকে যেতে হবে।

মিরপুর রোড থেকে ধানমন্ডি ২৭: শ্যামলী–শিশুমেলা–গণভবন–আসাদগেট হয়ে সরাসরি ধানমন্ডি ২৭-এর দিকে যাতায়াত করা যাবে।

এছাড়া উড়ালসড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) ব্যবহারকারীদের যানজট ও দুর্ভোগ এড়াতে ফার্মগেট এক্সিট র‌্যাম্পের পরিবর্তে এফডিসি (হাতিরঝিল) র‌্যাম্প ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে ডিএমপি।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন

মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। ইতিহাস বদলে দিয়ে রক্তনদী বেয়ে আসে এই গণ-অভ্যুত্থান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফার সামনে মুখথুবড়ে পড়ে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার। বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরাচারের অবসান ঘটে চব্বিশের ৫ আগস্ট। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি। চব্বিশের ওই দিনে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে নিয়ে যান ছোট বোন শেখ রেহানাকে। শেখ হাসিনার পলায়নের খবরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে কারফিউ ভেঙে উল্লাসে মেতে ওঠে ছাত্র-জনতা। রাজপথে নেমে আসে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সর্বস্তরের লাখো লাখো মানুষ।

কেউ মাথায় বেঁধে লাল কাপড়, কেউ বা লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা বেঁধে এই উৎসবে শামিল হন। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে জয়ের উচ্ছ্বাস ছিল তাদের চোঁখে-মুখে। এ যেন নিজ দেশে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার উল্লাস। নতুন বিজয়ের স্বাদ। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া এসব মানুষের সারিতে ছিলেন শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দিনমজুর, রিকশাচলক, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্লোগানে স্লোগানে তারা বলেন, বাংলাদেশ থেকে এক ‘স্বৈরাচারের’ পতন হয়েছে। স্বৈরাচারের বিদায়ে সন্ধ্যার পরও আনন্দ মিছিল চলে দেশজুড়ে। ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করেন ছাত্র-জনতা। পরবর্তীতে ৫ আগস্টকে গণ-অভ্যুত্থান দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ‘জুলাই চেতনায় গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে আজ বুধবার (৫ আগস্ট) সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’। এ উপলক্ষে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার।

ঐতিহাসিক এই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ের ধারার সূচনা হয়েছিল মূলত সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এটি পরে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। প্রায় ১৫০০ মানুষকে হত্যার প্রেক্ষিতে বিগত প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশকে শাসন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সেই দিন, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা ঘোষণা দেন এবং সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে সকল হত্যার তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন।

চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কারফিউ অমান্য করে রাজধানীর কেন্দ্রে একত্রিত হয়। শেখ হাসিনার পতনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে আগ্রাসন প্রদর্শন করে। ‘মার্চ টু ঢাকা’ ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও দেশবাসী রাজধানী অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। দুপুর নাগাদ ভিড় করে হাসিনার সরকারি বাসভবনে। এরপর শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক বিমানে করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান। ফ্যাসিবাদের জননী শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে চুপসে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে তারা সরে যান। ওই সময়ে রাজধানীতে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন এবং জাতীয় সংসদ ভবনে হাজার হাজার মানুষ ঢুকে পড়েন। সেখানে তারা সরকার পতনে উৎসব করেন। ভুয়া ভুয়া স্লোগানও দেন। শ্রীলংকার মতোই প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও বেডরুমে ছবি তোলেন। নিয়ে যান বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র। এমনকি আসবাবপত্র, পুকুরের মাছ, হাঁস, ক্ষেতের ফসলও নিয়ে যান তারা। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের চেয়ারে বসে ছবিও তোলেন। কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা দেননি।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং পরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জনসাধারণ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করার সাথে সাথে ঢাকা জুড়ে উদযাপনের কুচকাওয়াজ শুরু হয়। সন্ধ্যায় গণভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর ড.ইউনূস এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনার পর একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। জামায়াত হয় দেশের প্রধান বিরোধী দল। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করছেন।

জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলায় রায় ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আলোচিত ছয়টি রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এসব মামলার অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ উদ্বোধন হচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদ ও যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে আজ বুধবার (৫ আগস্ট) উদ্বোধন হচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। এদিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট)। মঙ্গলবার (৪ আগষ্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বুধবার সকাল ৯টায় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের জন্য জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ রাখা হবে এবং প্রথম দিনটি শুধু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এরপর থেকে এটি সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী এলে ব্যবস্থাপনা কঠিন হতে পারে বলে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক (স্লট) প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই দর্শনার্থীদের আগে থেকে অনলাইনে বুকিং করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আজ যেসব কর্মসূচি রয়েছে
এদিন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বেলা ১২টায় জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এমপি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ০১ মিনিটে শাহবাগস্থ জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেবেন।

দিবসটি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। এছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সামরিক জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরসহ সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রগুলো শিশুদের জন্য দিনব্যাপী উন্মুক্ত রাখা হবে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে। একইসঙ্গে রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি ভবন ও স্মৃতিস্তম্ভ জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার সমগ্র ভূখণ্ডে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে আজ একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের দুর্গম রেতলাং এলাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক সফল সামরিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে তাদের তৎপরতা পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এসব কার্যক্রম শুধু স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করেনি; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। এই বাস্তবতায় পরিচালিত অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

রেতলাংয়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই অভিযানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্গম পথ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী এবং আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল অভিযান পরিচালনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে। বিশেষত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র প্রায়ই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। পাশাপাশি কৃষি, বনজ সম্পদ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি শুধু একটি সফল সামরিক অভিযান নয়; বরং পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কার্যক্রম। সামরিক কৌশলবিদ সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War-এ উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত বিজয় অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি, তথ্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষায়িত বাহিনীর দক্ষতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই আজকের নিরাপত্তা অভিযানের সফলতার প্রধান ভিত্তি।

রেতলাং অভিযানের আরেকটি তাৎপর্য হলো এটি স্থানীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যখন রাষ্ট্র জনগণের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সামরিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অভিযানের ফলাফলে নয়, বরং সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা, জনআস্থা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক সাফল্য কোনো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা কখনোই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যথায় সাময়িক নিরাপত্তা অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।

কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia–FARC) নামের মার্ক্সবাদী গেরিলা সংগঠন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ, গ্রামীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে পর্যটন, কৃষি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং বহু অঞ্চল ধীরে ধীরে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যটন উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় না করলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের সফল অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। সামরিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক অভিযান ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অনেক নিরাপত্তা হুমকি জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। তাই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। পরিবেশসম্মত পর্যটন, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য, ফল ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান তত বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও তত শক্তিশালী হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্কই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পাশাপাশি বজায় থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য অপরিহার্য।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং কৌশলগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের যেকোনো অঞ্চলে তার আইনগত কর্তৃত্ব ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে এই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তায় রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশীদার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

অতএব, সামরিক সাফল্যকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।ড. মোঃ মিজানুর রহমান
Mizan12bd@yahoo.com