খুঁজুন
                               
, ,
           

জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

বরিশাল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

বুধবার (৫ আগস্ট) বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনা স্মরণ করা হচ্ছে। আমরা চাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ ও চেতনা দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকুক।’

তিনি বলেন, ‘হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে অর্জিত এই চেতনাকে যেন কোনো অপশক্তি ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সচেতন, ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ থাকতে হবে।’

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে দীর্ঘদিন ধরে একটি গোষ্ঠী ও একটি পরিবার কুক্ষিগত করে রেখেছিল। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ দেশের তরুণ প্রজন্ম, ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী প্রলোভন, পদ-পদবির লোভ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি অনেককে মন্ত্রী বানানোর প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের সচেতন মানুষ সেই প্রলোভনে পা দেয়নি। তারা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখেছে এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটল থেকেছে।’

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, এটি কেবল কয়েকজন সাহসী তরুণের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের মূল শক্তিই ছিল জনগণের ঐক্য, সাহস এবং গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস।’

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত ডিআইজি ড. মো. সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার, জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার, পুলিশ সুপার এ.জেড.এম. মোস্তাফিজুর রহমান, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এবায়দুল হক চাঁন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক এবং সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার।

বরিশাল বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার শুরুতে জুলাই শহীদ যোদ্ধাদের স্মরণে একটি তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রদর্শন করা হয়।

কালের আলো/আর/এমএইচ

দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ
দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ঢাকা

বুধবার (৫ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আত্মগোপনে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে আজ (বুধবার) সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ।

ঢাকা গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করে যে, আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্গঠনে এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ভারত সরকারকে উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই আলাপচারিতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি মারাত্মক অপমান।

ফ্যাসিবাদী শাসন দ্বারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক লোকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা পলাতক দোষী সাব্যস্ত গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তার অপরাধী সহযোগীদের ইতিহাসের জোয়ারকে বিপরীত করার একটি বৃথা প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এ ধরনের জঘন্য প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং এখনো করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশের জনগণ দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে যে, জাতি আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র হবে না। সাজাপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তার মাফিয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনো স্থান পাবে না।

বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়েছে, সার্বভৌম সাম্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও দূরদর্শী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ।

দুঃখজনকভাবে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে দোষী সাব্যস্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ করা হলেও এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিপরীতে, যে কোনো অজুহাতে তাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ দেওয়া আমাদের জনগণের অনুভূতির জন্য গভীরভাবে ক্ষতিকর এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি

দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ইতিহাসে প্রতিবেশীর প্রতি আধিপত্যবাদী আচরণের বহু দৃষ্টান্ত থাকলেও, অতি সম্প্রতি ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে প্রদর্শিত কূটনৈতিক অনাচার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একপাক্ষিক ও স্বৈরাচারভিত্তিক সুবিধাবাদী কাঠামোর অবসানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাকে মেনে নিতে সাউথ ব্লকের নিদারুণ মানসিক অস্বস্তি আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে জানিয়েছিলেন—ভারতের মাটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য ‘অধীর আগ্রহে’ অপেক্ষা করছে। কিন্তু কূটনীতির খাতা খুলতেই প্রকাশ পেল দিল্লির সেই পুরানো ছদ্মবেশ। কথা ও কাজের যোজন যোজন দূরত্ব প্রমাণ করে, ভারত এখনো তাদের গতানুগতিক ছদ্ম-কূটনীতি ও আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক খেলা থেকে সরে আসতে পারেনি।

আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জোট ব্রিকস (BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে যে আনুষ্ঠানিক দাওয়াতপত্র পাঠানো হয়েছে, তার ভাষা ও প্রটোকল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরম অবমাননা।

আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন না করে, কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ‘বিমসটেক (BIMSTEC)-এর চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রথাগত ডিপ্লোমেটিক কাস্টমসের এটি কেবল চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকৃতি জানানোর অসৎ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ, সম্বোধন এবং বাক্যবিন্যাস নিখুঁত হিসাব-নিকাশের পর নির্ধারিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি প্রবীণ সংস্থায় এই ধরনের ভুল দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে কিংবা এটি একটি ‘প্রযুক্তিগত অসাবধানতা’—এই যুক্তি শিশুসুলভ। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি নয়, বরং সাউথ ব্লকের একটি ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে যখন একাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে চেপে ধরেন এবং প্রশ্ন তোলেন—কেন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদবি এড়িয়ে তাঁকে বিমসটেক প্রধান হিসেবে কার্ড পাঠানো হলো? তখন তিনি কোনো যৌক্তিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “প্রস্তুতি চলছে, কারিগরি বিষয় নিয়ে পরে কথা বলা যাবে।” মুখপাত্রের এই বিভ্রান্তিকর ও পাশ কাটানো উত্তরই প্রমাণ করে যে, এটি কোনো ‘টাইপিং ভুল’ ছিল না। এটি ছিল ঢাকাকে একটি বার্তা দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সার্বভৌম নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভূরাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা ছোট করে উপস্থাপন করা।

দিল্লির মূল সমস্যা হলো—তারা এখনো ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছে না, অথবা বুঝতে পেরেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করছে। শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকে দিল্লি বাংলাদেশের ভূখণ্ড, প্রটোকল, অর্থনৈতিক বাজার এবং ট্রানজিট সুবিধা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করেছে, যার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে সীমান্তে ফেলানীদের লাশ, অসম তিস্তা চুক্তি আর বাণিজ্য বৈষম্য। সেই সময় বাংলাদেশকে ভারতের একটি ‘অঙ্গরাজ্য সমতুল্য’ প্রটোকলে মূল্যায়ন করার যে বদঅভ্যাস সাউথ ব্লকে তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকেরা বের হতে পারছেন না।

ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মনস্তত্ত্ব এখনো হাসিনাকেন্দ্রিক সেই পুরনো একপাক্ষিক অক্ষেই আটকে আছে। তারা ভুলে গেছে যে, গণ-অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত হয় জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছায়, দিল্লির সাউথ ব্লকের কোনো প্রেসক্রিপশনে নয়। ভারত যদি ভেবে থাকে যে আগের মতোই অবমূল্যায়ন আর অসৌজন্যমূলক প্রটোকল দিয়ে ঢাকাকে পদানত রাখা যাবে, তবে তারা মহা ভুলের স্বর্গে বাস করছে।

দিল্লিকে বুঝতে হবে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আর ২০০৯ বা ২০১৪ সালের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ স্তরের সার্বভৌম গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সমমর্যাদার ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশ আর কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত যখন একের পর এক কূটনৈতিক ভুল করছে, তখন বিশ্বরাজনীতিতে অন্যান্য পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে সমমর্যাদার সম্পর্কে এগিয়ে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য পথ এবং ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য ভারতকে দিনশেষে বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে ভারত কেবল নিজের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাকেই চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিচিতি সব সময় দুই ধারায় বিভক্ত ছিল—একপক্ষ ছিল নতজানু ও দাসত্বপ্রবণ, আর অপরপক্ষ ছিল স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি কেবল সার্ক (SAARC) গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং বড় কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও সেই একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রতিবেশীর সব ধরনের আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক চাপকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করেছিলেন।

তাদের যোগ্য উত্তরসূরি এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা-মাতার সেই বীরত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির পথেই হাঁটছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে দাসত্ব নয়। দেশের কোটি কোটি জনগণের স্পষ্ট অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে কূটনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি দিতে ভারতের হাত কাঁপে, যে প্রটোকলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে কোনো আঞ্চলিক সংস্থার ছায়ায় ঢেকে দেওয়ার চক্রান্ত হয়—সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হবে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাশীল নীতির পরিপন্থী। সুতরাং দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘প্রহসনের বন্ধুত্ব’ বিএনপি বা তারেক রহমান কোনো দিন বরদাশ করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না।

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হতে পারত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে যাওয়া পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সুসংহত করার এক সোনালী সুযোগ। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মেঘ কাটিয়ে দুটি প্রতিবেশী দেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারত। ঢাকাও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যদি সমমর্যাদা নিশ্চিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্বার্থে ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু দিল্লি তাদের ঐতিহ্যগত ‘দাদাগিরি’ ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে সেই ঐতিহাসিক সুযোগটিকে ধূলিসাৎ করে দিল।

একটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাওয়াত পাঠানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়েও তারা যে সংকীর্ণতা ও কূটচালের পরিচয় দিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ভারত এখনো সম মর্যাদার প্রতিবেশীকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তারা সম্পর্ক উন্নয়ন বলতে বোঝায় আধিপত্য বজায় রাখা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? কূটনীতিতে নীরবতা অনেক সময় সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাই ভারতের এই অরুচিকর এবং অপমানজনক আমন্ত্রণের বিপরীতে নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ বাংলাদেশের সামনে নেই।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ভারতের এই দাওয়াতপত্রকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকলবিরোধী আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

নয়াদিল্লিকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, বিমসটেক চেয়ার হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমমর্যাদা দেওয়া হলেই কেবল ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নেবে।

ভারত সফর থেকে বিরত থাকা কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত হবে না, বরং এটি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় একটি অতি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ (Diplomatic Protest)। সাউথ ব্লককে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে—’নতুন বাংলাদেশ’ তার আত্মসম্মান, প্রটোকল এবং সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে একটি সুসংহত, সুস্থ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। কোনো প্রটোকলভিত্তিক কারসাজি বা কূটনৈতিক হেয় করার প্রয়াস বাংলাদেশের সচেতন জনগণ মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দেশবাসীর আজ পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যদি দিল্লির এই অপমানজনক দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে ভারত সফর থেকে বিরত থাকেন, তবে তা হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দিল্লির এই অসৌজন্যমূলক ও আধিপত্যবাদী আচরণের এর চেয়ে কঠোর, সময়োপযোগী এবং সমুচিত জবাব আর কিছুই হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ আর কখনো নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১০ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশ আর কখনো নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশ আর কখনো কোনো দেশের ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা নির্ভরশীল রাষ্ট্র হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন হলো দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’-এর এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই বছর আগের পরিস্থিতির স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বিদেশে অবস্থানকালেও শিশু-কিশোরদের প্রাণহানি, সরকারের দমন-পীড়ন এবং দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।’

তিনি মন্তব্য করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এভাবে তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করা হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম নৃশংস ও অন্ধকার সময়।’

তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন সময়ে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে সহিংসতা কমাতে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছিল।

পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘সে সময় প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটানো—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরাও সাম্প্রতিক নির্বাচনকে উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য বলে মূল্যায়ন করেছেন, যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

কূটনৈতিক সাফল্য প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে যে হারিয়ে যেতে বসেছিল, তা আবার পুনর্দখল করছে।’

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। বাংলাদেশ আর কখনো অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে না।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিজয়ের কথা উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় এই ‘অসম্ভব মিশন’ জয় করা সম্ভব হয়েছে। এটি নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল।

তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা রেখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের তরুণরা ভয়াবহ এক দানবের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন ভালোবাসা, মেধা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।’

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ