এলএনজি সরবরাহে নতুন করে ধাক্কা লাগায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ৩টার দিকে এলএনজি কার্গোর মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়তে থাকে এবং সন্ধ্যার পর লোডশেডিং দ্রুত বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এক্সিলারেটের এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও ভাগ করে লোডশেডিং করতে হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এক টার্মিনাল বন্ধ, চাপ পুরো গ্যাস ব্যবস্থায়
এলএনজি কার্গোর অভাবে বুধবার বিকেলে এক্সিলারেটের টার্মিনালের মজুত শেষ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ওই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়। নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত আমদানি করা এলএনজির ওপর মূলত সামিটের টার্মিনালের সরবরাহের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
এর আগে সাগর উত্তাল থাকায় সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকেও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল। পরে ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে সামিট আবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা টার্মিনালের সক্ষমতার কাছাকাছি নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফেরার পরই আবার এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট নতুন করে বাড়ল।
চাহিদা ৩৮০, সরবরাহ ২১৯ কোটি ঘনফুট
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টায় দুই এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল ৬৬ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ১৬২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুটসহ মোট সরবরাহ ছিল ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। ছয় ঘণ্টা পর, সন্ধ্যা ৬টায় এলএনজি সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৫৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহও সামান্য কমে হয় ১৬২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। ফলে মোট সরবরাহ নেমে আসে ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে।
সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে বুধবার সন্ধ্যায় সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ১৬১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে চাহিদা সামাল দেওয়া হলেও বর্তমান ঘাটতি বিদ্যুৎ, শিল্প ও অন্যান্য খাতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ পরিবর্তন
গ্যাস সরবরাহ কমার প্রভাব বুধবার সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। তখন লোডশেডিং ছিল ১১৭ মেগাওয়াট। দুপুর ২টায় চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ২০৬ মেগাওয়াটে। সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং বেড়ে হয় ১ হাজার ৬৭ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় চাহিদা আরও বেড়ে ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ নেমে আসে ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে। তখন লোডশেডিং দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াটে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাত ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াটে। রাত ৯টায়ও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, বুধবার সকাল ১০টায় যেখানে লোডশেডিং ছিল মাত্র ১১৭ মেগাওয়াট, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে তা বেড়ে ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। প্রায় ২২ গুণের এই বৃদ্ধি একই দিনে বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর গ্যাস সরবরাহের প্রভাব কতটা গভীর, তা স্পষ্ট করে।
গ্যাস কমলে কেন বাড়ে লোডশেডিং?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসনির্ভর কেন্দ্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না। একই সময়ে সন্ধ্যায় আবাসিক ও অন্যান্য খাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ে—দুইয়ের চাপ একসঙ্গে পড়লে ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা দ্রুত বাড়ায় ঘাটতিও বেড়েছে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array