ভারতের ‘স্থগিত’ ঘোষণা মানলেন না আদালত, সিন্ধু চুক্তি নিয়ে কী হবে এবার?
সিন্ধু নদীর উৎপত্তি চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের পশ্চিমাংশে মানসসরোবর হ্রদের কাছাকাছি। হিমালয় পেরিয়ে নদীটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত আরব সাগরে গিয়ে মিশেছে। সিন্ধু ও এর প্রধান পাঁচ উপনদী—ঝিলম, চেনাব, বিয়াস, শতদ্রু ও রাভি—মিলে গড়ে উঠেছে বিশাল সিন্ধু নদীব্যবস্থা।
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত বলেছে, ভারত একতরফাভাবে চুক্তিটি ‘স্থগিতাবস্থায়’ রাখার ঘোষণা দিলেও ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে ভারত এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির দাবি, যে সালিসি আদালত রায় দিয়েছে, সেটির গঠনই সিন্ধু পানি চুক্তির বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলে সিন্ধু নদীব্যবস্থার পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
পাকিস্তানের পাঞ্জাবের কৃষি ও সেচব্যবস্থা রাভি ও শতদ্রু নদীর ওপরের গুরুত্বপূর্ণ হেডওয়ার্কসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সেগুলো ভারতের ভূখণ্ডে পড়ে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়। প্রায় নয় বছর আলোচনার পর ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর করাচিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সিন্ধু পানি চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলীয় তিন নদী—রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানির ওপর ভারতের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় তিন নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানির প্রধান অধিকার পায় পাকিস্তান।
তবে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি ব্যবহারে ভারতকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। নির্দিষ্ট শর্তে ভারত এসব নদীতে ‘রান অব দ্য রিভার’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ এবং সীমিত পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করতে পারে।
চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠন করা হয় ‘পার্মানেন্ট ইন্ডাস কমিশন’। ভারত ও পাকিস্তানের একজন করে কমিশনার এতে দায়িত্ব পালন করেন।
বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যও চুক্তিতে তিন স্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়—‘প্রশ্ন’, ‘পার্থক্য’ ও ‘বিরোধ’। সাধারণ বিষয়ে কমিশন পর্যায়ে সমাধানের কথা রয়েছে। কারিগরি মতপার্থক্য হলে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং গুরুতর বিরোধের ক্ষেত্রে সাত সদস্যের সালিসি আদালতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, চুক্তিতে উজানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি ব্যবহারে অতিরিক্ত বিধিনিষেধের মুখে রয়েছে। নয়াদিল্লির মতে, এর প্রভাব বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে পড়েছে।
এ ছাড়া ভারত মনে করে, পাকিস্তান বারবার চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি তুলেছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যেও সিন্ধু পানি চুক্তি টিকে ছিল। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাতও চুক্তিকে অকার্যকর করতে পারেনি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত চুক্তিটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য পাকিস্তানকে নোটিশ দেয়।
এরপর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত জানায়, সিন্ধু পানি চুক্তি ‘abeyance’ বা স্থগিতাবস্থায় রাখা হচ্ছে।
সমস্যা হলো, ‘abeyance’ শব্দটি চুক্তিতে নেই এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনে এর নির্দিষ্ট কারিগরি অর্থও নেই। পরবর্তী সময়ে এই শব্দের আইনি ব্যাখ্যাই বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের আবেদনের পর দ্য হেগের সালিসি আদালত ভারতের সিদ্ধান্তের আইনি অবস্থান পরীক্ষা করে।
আদালত বলেছে, ‘abeyance’ শব্দটির নিজস্ব নির্দিষ্ট আইনি অর্থ নেই। তাই শুধু শব্দটি নয়, ভারতের সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।
আদালতের মতে, ভারতের পদক্ষেপ কার্যত চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সিন্ধু পানি চুক্তিতে কোনো পক্ষকে একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়নি।
ফলে আদালতের সিদ্ধান্ত—ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে নতুন কোনো চুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিল না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি কার্যকর থাকবে।
আদালত ভারতের আরও কিছু যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে। সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজন কিংবা দুই দেশের সামরিক সংঘাত—এসবকে চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার যথেষ্ট আইনি কারণ হিসেবে গ্রহণ করেনি আদালত।
রায়টি ভারতের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও নয়াদিল্লি শুরু থেকেই এই সালিসি আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
ভারতের দাবি, একই বিষয়ে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও সালিসি আদালত—দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া চালানো সিন্ধু পানি চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণেই ভারত সালিসি আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি।
ফলে ভারত বলছে, যে আদালতের আইনগত বৈধতাই তারা স্বীকার করে না, তার রায়ও তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান এই রায়কে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ইসলামাবাদ দাবি করতে পারে, ভারত একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত করে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী অবস্থান নিয়েছে।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এখন আর শুধু পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারত-পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের অংশ হয়ে উঠেছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত বলছে, চুক্তি এখনো কার্যকর। অন্যদিকে ভারত সেই আদালতের এখতিয়ারই স্বীকার করছে না।
ফলে সামনে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—দুই দেশ কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাবে, নাকি সিন্ধু নদীর পানি দুই দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত টানাপোড়েনের আরও বড় অংশ হয়ে উঠবে?
৬৬ বছর ধরে একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যেও টিকে থাকা এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array