খুঁজুন
                               
, ,
           

যেখানে কচ্ছপ দেখতে ছুটে আসেন হাজার ডলারের পর্যটকরা

ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০০ অপরাহ্ণ
যেখানে কচ্ছপ দেখতে ছুটে আসেন হাজার ডলারের পর্যটকরা

ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের নিরিবিলি এক কোণে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র বাওয়াহ রিজার্ভ। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপে বিলাসিতা, নির্জনতা আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তবে অন্য অনেক বিলাসবহুল রিসোর্টের চেয়ে বাওয়াহকে আলাদা করেছে একটি বিশেষ আয়োজন—সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণ।

সন্ধ্যা নামতেই রিসোর্টের অতিথিদের ফোনে ভেসে আসে জরুরি বার্তা—সৈকতে কচ্ছপের বাচ্চা বের হয়েছে, সাগরের দিকে তাদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

রিসোর্টের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করেন। শিকারি প্রাণীর হাত থেকে ডিমগুলো রক্ষা করতে সেগুলো বাওয়াহর একটি নিরাপদ, ঢাকনাযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করা হয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করেন তারা।

কচ্ছপের বাচ্চাগুলোর সাগরে যাওয়ার পথটিও বিশেষভাবে তৈরি। বালুর ওপর তৈরি সরু পথটির দুপাশে ছোট দেয়াল থাকায় কচ্ছপগুলো পথ হারিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সেই পথ ধরে তারা পৌঁছে যায় সমুদ্রে।

কচ্ছপের ডাকেই রাতের খাবার ফেলে ছুট

কোনো ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়েছে—বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হওয়ার পরই অতিথিদের জানানো হয়। আর সেই বার্তা পেয়েই অনেকে রাতের খাবার ফেলে কিংবা অন্য আয়োজন বাদ দিয়ে ছুটে যান সৈকতে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে কয়েক মিনিটের এই দৃশ্য এতটাই আকর্ষণীয় যে, এর জন্য তারা হাজার হাজার ডলার খরচ করতেও প্রস্তুত।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে। রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি বিশাল দ্বীপমালা। বাওয়াহ রিজার্ভের মালিকানায় রয়েছে এই অঞ্চলের ছয়টি দ্বীপ। দক্ষিণ চীন সাগরের নিরিবিলি অংশে তাই গড়ে উঠেছে তাদের একান্ত অবকাশকেন্দ্র।

শুরুতেই পেরোতে হয় দীর্ঘ পথ

বাওয়াহ রিজার্ভে পৌঁছানোও কম রোমাঞ্চকর নয়। সাধারণত যাত্রা শুরু হয় সিঙ্গাপুর থেকে। সেখান থেকে গাড়িতে করে ফেরিঘাটে গিয়ে পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ শেষে ফেরিতে পাড়ি দিতে হয় সিঙ্গাপুর প্রণালি। এরপর ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে পৌঁছে অতিথিদের নেওয়া হয় হাং নাদিম বিমানবন্দরে।

সেখানেই অপেক্ষা করে ব্যক্তিগত জলবিমান। সর্বোচ্চ ১০ জন যাত্রী বহন করতে পারে একেকটি বিমান। বাওয়াহর জন্য রয়েছে দুটি জলবিমান—একটি নীল ও অন্যটি সবুজ।

বিমানে মালপত্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর নিয়ম। প্রত্যেক অতিথি সর্বোচ্চ ১৫ কেজি মালপত্র নিতে পারেন। এমনকি বিমানে ওঠার আগে যাত্রী ও তার লাগেজের সম্মিলিত ওজনও পরীক্ষা করা হয়।

বাতাম থেকে প্রায় ৭৫ মিনিট উড়ে জলবিমানটি বাওয়াহর সরু জেটির পাশে পানিতে অবতরণ করে। সেখানে রিসোর্টের কর্মীরা অতিথিদের স্বাগত জানান ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে।

দ্বীপে পৌঁছেই বদলে যায় জীবন

দীর্ঘ ভ্রমণের পর বাওয়াহর সবুজ ও শান্ত পরিবেশে পৌঁছালে বাইরের পৃথিবী যেন অনেক দূরে চলে যায়। ব্যক্তিগত বাটলাররা অতিথিদের স্যুটে পৌঁছে দেন। কোথাও নেই ব্যস্ত শহরের শব্দ, নেই যানজট কিংবা মানুষের ভিড়।

দ্বীপজুড়ে ওয়াই-ফাই থাকলেও যারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে চান, তাদের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। কনসিয়ার্জের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয় সাধারণ ফোন।

এখানে থাকার খরচও সাধারণ পর্যটকের নাগালের বাইরে। সবচেয়ে সাধারণ কক্ষের ভাড়া শুরু প্রায় ১ হাজার ৯৮০ ডলার থেকে। দ্বীপে যাতায়াতের জটিলতার কারণে অতিথিদের অন্তত তিন রাত থাকতে হয়।

এই খরচের মধ্যে থাকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার এবং একটি স্পা সেবা। চাইলে অতিরিক্ত খরচে ব্যক্তিগত সৈকতভোজের আয়োজনও করা যায়। এর খরচ প্রায় ১ হাজার ডলার।

সবচেয়ে বিলাসবহুল চার শয়নকক্ষের স্যুটে রয়েছে নিজস্ব ইনফিনিটি পুল। ভরা মৌসুমে সেখানে এক রাতের ভাড়া প্রায় ১২ হাজার ৩০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

শুধু বিশ্রাম নয়, আছে নানা আয়োজন

বাওয়াহর বিশেষত্ব শুধু বিলাসিতা নয়। সক্রিয় জীবনযাপন পছন্দ করা অতিথিদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের আয়োজন। স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, খোলা সাগরে সাঁতার, কফি সংগ্রহ ও সুগন্ধি তৈরির কর্মশালার মতো কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিদিন পানির ওপর তৈরি একটি ছোট বাংলোয় যোগব্যায়ামের ক্লাস হয়। সেখানে ব্যায়ামের সরঞ্জাম ও ভারোত্তোলনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

রিসোর্টের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পল রবিনসনের ভাষায়, বাওয়াহ এমন অতিথিদের জন্য, যারা হয়তো মালদ্বীপের মতো জায়গায় ‘বিরক্ত’। অর্থাৎ যারা শুধু বিলাসবহুল বাংলোয় বসে থাকতে চান না, বরং প্রকৃতির মধ্যে সক্রিয় সময় কাটাতে চান।

বিলাসিতার সঙ্গে প্রকৃতির বন্ধুত্ব

বাওয়াহর আরেকটি বিশেষত্ব হলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। স্থানীয় উপাদান ও সামুদ্রিক খাবারনির্ভর খাবারের পাশাপাশি সপ্তাহে দুই রাত সমুদ্রসৈকতের রেস্তোরাঁকে ইন্দোনেশীয় খোলা বাজারের আদলে সাজানো হয়।

দ্বীপের ছোট দোকানে পুনর্ব্যবহৃত সামুদ্রিক প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। লাইব্রেরিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি ও স্থানীয় উদ্ভিদ নিয়ে বইয়ের পাশাপাশি গল্প ও থ্রিলারও।

অতিথিদের পছন্দও গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখেন কর্মীরা। কারও নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলা হয়, আবার কেউ কোন পানীয় পছন্দ করেন—সেটিও খেয়াল রাখা হয়।

চেক-ইনের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই অতিথিদের ঘুমের অভ্যাস, খাবারের পছন্দ ও অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী সাজানো হয় পুরো থাকার অভিজ্ঞতা।

শেষ পর্যন্ত যে বিলাসিতা—নির্জনতা

বাওয়াহ রিজার্ভের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো তার দামি স্যুট, ব্যক্তিগত সৈকত কিংবা জলবিমান নয়। বরং ব্যস্ত পৃথিবী থেকে কয়েক দিনের জন্য পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ।

এখানে বিলাসিতা মানে সোনার কল বা বড় ব্র্যান্ডের প্রদর্শন নয়। স্থানীয় কাঠের বাথটাব, সমুদ্রের বাতাস, নরম আলো, সবুজ দ্বীপ আর রাতের নীরবতাই হয়ে ওঠে বিলাসিতার অংশ।

আর সেই বিলাসিতার মাঝেই হঠাৎ ফোনে আসে একটি ছোট বার্তা—‘কচ্ছপের বাচ্চা বের হয়েছে।’

তখন হাজার হাজার ডলার খরচ করে আসা অতিথিরাও ছুটে যান সৈকতে। কয়েক মিনিটের জন্য তারা ভুলে যান বিলাসবহুল স্যুট, দামি খাবার কিংবা স্পা। চোখের সামনে দেখতে থাকেন ছোট্ট কচ্ছপের সমুদ্রের দিকে প্রথম যাত্রা।

বাওয়াহর আসল গল্পটা হয়তো এখানেই—অসাধারণ বিলাসিতার মাঝেও প্রকৃতির সবচেয়ে ছোট ও অসহায় প্রাণীর জন্য জায়গা করে দেওয়া।

কালের আলো/এসএ

গ্রিড বিপর্যয়ে বিদ্যুৎহীন সচিবালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৬ অপরাহ্ণ
গ্রিড বিপর্যয়ে বিদ্যুৎহীন সচিবালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা

গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে সচিবালয়সহ রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা এবং চট্টগ্রামের একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ জানিয়েছে, ঢাকার ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন ও মতিঝিলসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। চট্টগ্রামের একাংশেও বিদ্যুৎ নেই।

সচিবালয়ের পূর্ত মন্ত্রণালয়ে বিদ্যুতের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, ডিপিডিসি থেকে তাকে জানানো হয়েছে, গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

তবে ঠিক কোন গ্রিডে বিপর্যয় ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। প্রাথমিকভাবে ধানমন্ডি-উলন গ্রিডে বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কারিগরি কারণ এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সিস্টেম পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। প্রকৌশলীরা ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করছেন। জাতীয় গ্রিডের কার্যক্রম ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল ও স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে রাজধানীর সচিবালয় ও আশপাশের এলাকা, মগবাজার, মধুবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ ও খিলগাঁওসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে। তবে কখন নাগাদ পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

মাধ্যমিকে জয়, উচ্চশিক্ষায় ক্ষয়

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৩ অপরাহ্ণ
মাধ্যমিকে জয়, উচ্চশিক্ষায় ক্ষয়

স্কুলে মেয়েদের জয়যাত্রা, কলেজেও সংখ্যাগরিষ্ঠ; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছাতেই বদলে যায় হিসাব। মাধ্যমিকে যেখানে মোট শিক্ষার্থীর ৫৪.৬৭ শতাংশ মেয়ে, কলেজে ৫১.৯১ শতাংশ, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অংশ মাত্র ৩৯.৩৪ শতাংশ। কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি শিক্ষায় তা আরও কম—২৯.৭১ শতাংশ। আর ডিপ্লোমা পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর হার নেমে এসেছে ২৩.৮২ শতাংশে। অর্থাৎ শিক্ষার প্রাথমিক ধাপগুলোতে এগিয়ে থাকা মেয়েদের অগ্রযাত্রা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে আর সমান গতিতে এগোচ্ছে না।

  • মাধ্যমিক ও কলেজে মেয়েরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী ৩৯ শতাংশ
  • কারিগরি শিক্ষায় ৩০ শতাংশেরও কম, ডিপ্লোমায় মাত্র ২৩.৮২ শতাংশ
  • শিক্ষার সিঁড়ি পেরোতে পেরোতে কমছে নারীর অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) _শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫_ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নারীশিক্ষার এই বৈপরীত্য। একদিকে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে মেয়েরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। ফলে শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়লেও সেই অগ্রগতিকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে সমানভাবে রূপান্তর করা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মাধ্যমিক-কলেজে অগ্রগতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবধান
গত এক দশকে মাধ্যমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশ বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০১৫ সালে এ পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর ৫৩.৩১ শতাংশ ছিল মেয়ে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪.৬৭ শতাংশে। অর্থাৎ দশ বছরে নারীর অংশ বেড়েছে ১.৩৬ শতাংশ।

কলেজ পর্যায়ে অগ্রগতি আরও স্পষ্ট। ২০১৫ সালে কলেজের মোট শিক্ষার্থীর ৪৬.৪৬ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ৫০.৫৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে নারী শিক্ষার্থীর অংশ দাঁড়ায় ৫১.৯১ শতাংশে। এক দশকে বেড়েছে ৫.৪৫ শতাংশ।

শুধু অংশগ্রহণের হার নয়, বেড়েছে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ২০১৫ সালে কলেজে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ১৭ লাখ ৯ হাজার ১৭১ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৮১ হাজার ১২৩ জনে। অর্থাৎ এক দশকে কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী বেড়েছেন প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এই চিত্র আর একই রকম থাকছে না। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৩২.৮৫ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২০ সালে এ হার বেড়ে হয় ৩৫.১৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৯.৩৪ শতাংশে। অর্থাৎ নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকের অনেক নিচে রয়ে গেছে তাদের অবস্থান।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৮২ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ৩৮ হাজার ২৬২ জন। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৩৯.৩৪ শতাংশ নারী।

উচ্চশিক্ষার পথে বাধা কোথায়?
শিক্ষার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার সময় মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজনীন ইসলামের মতে, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের অভাব, বাল্যবিয়ে, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিকের পর বাড়ির বাইরে গিয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন হলে নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করাও কঠিন হতে পারে। এর সঙ্গে বিয়ে, সংসার ও পরিবারের দায়িত্ব যুক্ত হলে অনেক মেয়ের পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে।

অধ্যাপক নাজনীন ইসলামের মতে, ১২ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করার পর একটি মেয়ে কেন উচ্চশিক্ষায় গিয়ে আর এগোতে পারছে না, তা চিহ্নিত করা সরকারের দায়িত্ব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানও মনে করেন, শিক্ষার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার পথে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার কারণগুলো শনাক্ত করা জরুরি। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সীমিত সুযোগ, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের সংকট, বাল্যবিয়ে এবং পারিবারিক দায়িত্ব এ ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মাধ্যমিক বা কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ঠিক কতজন মেয়ে ঝরে পড়ছে, কিংবা কী কারণে তারা উচ্চশিক্ষায় যেতে পারছে না, ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে তার সরাসরি ব্যাখ্যা নেই। বিভিন্ন স্তরে নারী শিক্ষার্থীর অংশের তুলনা ব্যবধানের ইঙ্গিত দিলেও এর পেছনের কারণ নিশ্চিত করে না। এ জন্য স্তরভিত্তিক উত্তরণের হার, ঝরে পড়ার প্রবণতা, অঞ্চলভেদে সুযোগ এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ আরও কম
সাধারণ শিক্ষায় মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১০ হাজার ৫২১টি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯৪ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৫৮ জন। অর্থাৎ এ খাতের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৯.৭১ শতাংশ নারী।

ডিপ্লোমা পর্যায়ে ব্যবধান আরও বেশি। সেখানে নারী শিক্ষার্থীর অংশ মাত্র ২৩.৮২ শতাংশ। অর্থাৎ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী রয়েছেন একজনেরও কম।

এই চিত্র গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কারিগরি শিক্ষা ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। এ ধারায় নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলে দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

তবে সামগ্রিক অংশগ্রহণের হার দিয়ে সমস্যার পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কোন বিষয়ে মেয়েরা বেশি বা কম ভর্তি হচ্ছেন, প্রশিক্ষণ শেষ করার হার কত, প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কর্মসংস্থানে প্রবেশ করছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ নারীদের জন্য কতটা উপযোগী—এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষকতায়ও উচ্চপর্যায়ে কম নারী
শিক্ষার্থী হিসেবে নারীর অংশগ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৭৪টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ৩৪ হাজার ৮৩১ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ১০ হাজার ৬১৮ জন, যা মোট শিক্ষকের ৩০.৪৮ শতাংশ।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের অংশ ২৭.৮৭ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার ৩৩.১৪ শতাংশ। অন্যদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশ ২৬.১৮ শতাংশ।

তবে প্রাথমিক শিক্ষায় চিত্রটি ভিন্ন। প্রাথমিক শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের (আইপিইএমআইএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯২৮ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৫ জন। অর্থাৎ নারী শিক্ষকের অংশ প্রায় ৬৬.৮৯ শতাংশ। পুরুষ শিক্ষক রয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ২০৩ জন, যা মোট শিক্ষকের প্রায় ৩৩.১১ শতাংশ।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি এ পর্যায়ে নারী শিক্ষকের অংশ বেশি থাকার অন্যতম কারণ। প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় তাঁদের কম উপস্থিতি উচ্চতর পর্যায়ে নারী শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে এই পরিসংখ্যান থেকেই নারী শিক্ষক কম থাকার নির্দিষ্ট কারণ কিংবা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করা যায় না। নিয়োগ, পদোন্নতি, গবেষণার সুযোগ, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা ও কর্মপরিবেশের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

সরকারি চাকরিতে ক্যাডারভেদে ভিন্ন চিত্র
শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নারীর অগ্রগতি সব জায়গায় সমান নয়। ৪৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ ক্যাডারে নারী সুপারিশপ্রাপ্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম।

প্রশাসন ক্যাডারের ১৫৯টি পদের বিপরীতে নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। পুলিশ ক্যাডারে ৬৪ জনের মধ্যে নারী চারজন এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১৩ জনের মধ্যে নারী তিনজন। এ ছাড়া আনসার ক্যাডারে একজন, নিরীক্ষা ও হিসাবে পাঁচজন এবং কর ক্যাডারে তিনজন নারী সুপারিশ পেয়েছেন।

এই বিসিএসে মোট ৯৩৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ২৪৯ জন। সাধারণ ক্যাডারের ৪৪৯টি পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৮৫টি। অন্যদিকে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ৮৮৫টি পদের বিপরীতে নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ১৬৪ জন।

বিশেষ বিসিএসে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীরা ৪৭ শতাংশের বেশি সুযোগ পেয়েছিলেন। ৪২তম বিশেষ বিসিএসেও নারী সুপারিশপ্রাপ্তির হার ছিল প্রায় ৪৯.২ শতাংশ।

কৃষি ও শিক্ষা ক্যাডারেও নারীদের তুলনামূলক ভালো প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়। কৃষি ক্যাডারের ৮৫টি পদের বিপরীতে নারীরা পেয়েছেন ৪৩টি। শিক্ষা ক্যাডারের ইংরেজি, অর্থনীতি, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ের বিভিন্ন পদেও নারী প্রার্থীদের সুপারিশপ্রাপ্তির চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক।

ক্যাডারভেদে এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণের ধরন নিয়োগের ক্ষেত্র অনুযায়ী বদলে যায়। তবে শুধু সুপারিশপ্রাপ্তির সংখ্যা দিয়ে নারীদের আগ্রহ, যোগ্যতা কিংবা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বৈষম্যের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। আবেদনকারীর সংখ্যা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার হার, পদসংখ্যা ও নিয়োগের শর্তসহ সংশ্লিষ্ট তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ
বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ার সাফল্য স্পষ্ট। মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের অগ্রগতির প্রতিফলন। কিন্তু এই সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ অর্জনে রূপ দিতে হলে উচ্চশিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ জন্য প্রথমেই শনাক্ত করতে হবে, শিক্ষার কোন পর্যায়ে মেয়েদের অগ্রযাত্রা বেশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর পেছনে কোন কারণগুলো কাজ করছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সহায়তা, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং শিক্ষাবান্ধব সামাজিক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণের সুযোগ, বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতা, নিরাপদ ব্যবহারিক পরিবেশ এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের বাস্তবতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হলে ভর্তি, উত্তরণ, নিয়োগ এবং কর্মজীবনে টিকে থাকার প্রতিটি ধাপের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নারীশিক্ষার অগ্রগতি শুধু স্কুলে ভর্তি কিংবা মাধ্যমিক ও কলেজে অংশগ্রহণের হার দিয়ে বিচার না করা। কতজন মেয়ে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাচ্ছে, কতজন দক্ষতা অর্জন করছে এবং কতজন নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে—সেই হিসাবও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

মাধ্যমিক ও কলেজে মেয়েরা এগিয়ে—এটি বাংলাদেশের নারীশিক্ষার বড় অর্জন। এখন চ্যালেঞ্জ সেই অগ্রযাত্রাকে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। শিক্ষার প্রতিটি ধাপে মেয়েদের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সাফল্য পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ নেওয়ার পথেই থেকে যাবে বড় প্রশ্ন।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের প্রত্যাশা জাপানের

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৪ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের প্রত্যাশা জাপানের

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তা দেবে জাপান। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৬০ কোটি মার্কিন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশা করছে দুই দেশ। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি হিসেবে উন্নীত করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এ উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করবে দুই দেশ।

এ ছাড়া ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত তা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। খাদ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পে বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও সহযোগিতা বাড়ানো হবে।

জ্বালানি খাতে জরুরি ঋণ সহায়তার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের উন্নয়ন সহায়তায় একটি টহলজাহাজ এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান দুই প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, গাজা পুনর্গঠন এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ।

যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে গত পাঁচ দশকে জাপানের অবদানের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি