দুর্গাপূজার ছুটিতে ভ্রমণে যাচ্ছেন? সুস্থ থাকতে মানুন জরুরি স্বাস্থ্যবিধি
দুর্গাপূজার ছুটিতে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকেই বেরিয়ে পড়ছেন ভ্রমণে। কেউ ঘুরছেন মণ্ডপে মণ্ডপে, কেউ আবার ছুটছেন পাহাড়, সমুদ্র কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে। বাস, ট্রেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা বিমানে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। তবে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন, বাইরের খাবার ও অনিরাপদ পানির কারণে দেখা দিতে পারে নানা শারীরিক সমস্যা। তাই ভ্রমণের পরিকল্পনার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি।
দীর্ঘ যাত্রায় বমি ভাব ও মাথা ঘোরা
বাস, গাড়ি, নৌযান কিংবা বিমানে চলাচলের সময় অনেকের বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা ও অস্বস্তি দেখা দেয়। এ সমস্যাকে বলা হয় মোশন সিকনেস। চোখ ও অন্তঃকর্ণ থেকে পাওয়া চলাচলের সংকেতের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হলে এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা কমাতে যাত্রাপথে দূরের কোনো স্থির বস্তু বা দিগন্তের দিকে তাকানো যেতে পারে। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, বই পড়া কিংবা চলন্ত পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা এড়িয়ে চলাও সহায়ক হতে পারে। প্রয়োজনে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া ও ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া যেতে পারে। যাঁদের নিয়মিত এ সমস্যা হয়, তাঁদের ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। নিজে থেকে বমি প্রতিরোধের ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
একটানা বসে থাকলে বাড়তে পারে রক্ত জমাটের ঝুঁকি
দীর্ঘ সময় বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে একই ভঙ্গিতে বসে থাকলে পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস বা ডিভিটি বলা হয়। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, আগে রক্ত জমাট বাঁধার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ঝুঁকি কমাতে সম্ভব হলে বিরতি নিয়ে হাঁটাচলা করা এবং বসে থাকা অবস্থায় নিয়মিত পায়ের পাতা ও গোড়ালি নাড়ানো প্রয়োজন। দীর্ঘ ভ্রমণের পর এক পা অস্বাভাবিক ফুলে গেলে বা ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট কিংবা বুকে ব্যথা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাবার ও পানিতে সতর্ক না থাকলেই বিপদ
ভ্রমণের সময় অপরিচ্ছন্ন খাবার ও দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়া, বমি এবং পেটের বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে। অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস, কাঁচা বা আধা সেদ্ধ সামুদ্রিক খাবার, অপাস্তুরিত দুধ ও অনিরাপদ পানি এসব সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ভ্রমণে নিরাপদ পানি পান করা, পরিষ্কার পরিবেশে তৈরি তাজা খাবার খাওয়া এবং খাবারের আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। ডায়রিয়া হলে শরীরের পানিশূন্যতা রোধে ওরস্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। গুরুতর পানিশূন্যতা, রক্তমিশ্রিত পায়খানা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পাহাড়ে ভ্রমণের আগে জানুন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি
পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে গন্তব্যের রোগঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জেনে নেওয়া উচিত। ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মশারি ব্যবহার, শরীরের অনাবৃত অংশে উপযোগী মশা প্রতিরোধক লাগানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লম্বা হাতার পোশাক পরা সহায়ক হতে পারে। শুধু পাহাড়ি অঞ্চল নয়, অন্যান্য ভ্রমণস্থলেও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ভ্রমণের সময় বা ফিরে আসার পর জ্বর, কাঁপুনি কিংবা অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসককে ভ্রমণের স্থান ও সময় সম্পর্কে জানানোও জরুরি।
বিমান ভ্রমণে কানে চাপ ও শ্বাসকষ্টের সতর্কতা
বিমানের উচ্চতা পরিবর্তনের সময় কানে চাপ, কান বন্ধ হয়ে আসা কিংবা অস্বস্তি হতে পারে। চুইংগাম চিবানো, পানি পান করা এবং বারবার ঢোক গেলার মাধ্যমে এ সমস্যা কিছুটা কমানো যায়। তবে সর্দি, নাক বন্ধ থাকা কিংবা সাইনাসের সমস্যা থাকলে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় অস্বস্তি বেড়ে যেতে পারে। যাঁদের হৃদ্রোগ, এনজাইনা কিংবা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিমান ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিমানের কেবিনে অক্সিজেনের চাপ তুলনামূলক কম থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই দীর্ঘ যাত্রার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে বাড়তি সতর্কতা
শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে গেলে খাবার, পানি, পোশাক ও বিশ্রামের বিষয়ে বাড়তি যত্ন নিতে হবে। আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক পরানো, নিয়মিত পানি পান করানো এবং পরিচ্ছন্ন খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিশুর প্রয়োজনীয় ওষুধ, থার্মোমিটার ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি সঙ্গে রাখা ভালো।
ভ্রমণের সময় শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়।
বিদেশ ভ্রমণে টিকা ও স্বাস্থ্যবিধি মানুন
বিদেশে যাওয়ার আগে গন্তব্য দেশের আবহাওয়া, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং প্রবেশসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ভ্রমণের গন্তব্য ও ধরন অনুযায়ী হেপাটাইটিস এ, হেপাটাইটিস বি, টাইফয়েড, জলবসন্ত কিংবা ইয়েলো ফিভারের টিকা প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব টিকা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। গন্তব্য, ভ্রমণের সময়কাল এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসক বা ভ্রমণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনীয় টিকা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রস্তুতি আগে থেকে সম্পন্ন করলে ভ্রমণের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ভ্রমণের আগে ব্যাগে রাখুন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী
ভ্রমণ নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যাগ গোছানোর সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
নিয়মিত ওষুধ: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ কিংবা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে রাখুন। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম: ডায়াবেটিস থাকলে গ্লুকোজ মাপার যন্ত্র, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রক্তে শর্করা কমে গেলে ব্যবহারের উপযোগী দ্রুত শর্করা সরবরাহকারী খাবার সঙ্গে রাখুন।
প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম: ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যান্টিসেপটিক, থার্মোমিটার ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ওষুধ দিয়ে ছোট একটি ফার্স্ট এইড কিট তৈরি করুন।
নিরাপদ খাবার ও পানি: বিশুদ্ধ পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। অপরিচ্ছন্ন খাবার ও অনিরাপদ পানীয় এড়িয়ে চলুন।
আরামদায়ক পোশাক ও জুতা: গন্তব্যের আবহাওয়া এবং ভ্রমণের ধরন অনুযায়ী পোশাক বেছে নিন। হাঁটাচলার জন্য আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: ভ্রমণের আগে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। দীর্ঘ যাত্রায় বিরতির সুযোগ রাখুন এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি এড়িয়ে চলুন।
অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা যেতে পারে। তবে প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা একাধিক ওষুধ বহন কিংবা সেগুলো নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়।
সুস্থ থাকলেই উপভোগ করা যাবে ভ্রমণের আনন্দ
দুর্গাপূজার ছুটি কিংবা দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভ্রমণ—সুস্থ থাকলেই তার আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব। তাই ব্যাগ গোছানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রস্তুতিও নিন। নিরাপদ খাবার ও পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং কিছু সাধারণ সতর্কতা ভ্রমণকালীন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে। ভ্রমণ হোক আনন্দময়, নিরাপদ ও স্বস্তির। অসুস্থতা নয়, প্রিয়জনদের সঙ্গে সুন্দর স্মৃতিই হয়ে উঠুক ছুটির দিনের সঙ্গী।
কালের আলো/এসএআর/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]