আগুনে পুড়লে প্রথম ২০ মিনিটেই নিতে হবে যে ব্যবস্থা
আগুনে দুর্ঘটনা ঘটলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। রান্নাঘরের আগুন, ফুটন্ত তেল কিংবা গরম পানিতে দগ্ধ হওয়ার পর প্রথম পর্যায়ের সঠিক পরিচর্যা ক্ষতির মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে পোড়া স্থানে টুথপেস্ট, বরফ বা তেল লাগানোর মতো প্রচলিত ভুলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। চার দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে দগ্ধ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরবর্তী পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আইয়ূব আলী।
তিনি মনে করেন, আগুনে পোড়ার পর আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, পোড়ার ক্ষতি কমাতে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভুল পদক্ষেপ এড়িয়ে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পোশাকে আগুন লাগলে দৌড়াবেন না
কোনো কারণে পোশাকে আগুন ধরে গেলে আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করা যাবে না। এতে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে শরীরের বেশি অংশ পুড়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হবে। আশপাশে কেউ থাকলে নিরাপদ উপায়ে ভারী কম্বল দিয়ে আগুনের শিখা ঢেকে দিতে পারেন। আগুন নিভে যাওয়ার পর পোড়া স্থানে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। তবে গুরুতর দগ্ধ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
পোড়া স্থানে অন্তত ২০ মিনিট পানি দিন
দগ্ধ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পোড়া স্থানে স্বাভাবিক তাপমাত্রার প্রবাহিত পানি অন্তত ২০ মিনিট ধরে দিতে হবে। এতে ত্বকের তাপমাত্রা কমে এবং পোড়ার ক্ষতি আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
পোড়া স্থানে আংটি, ঘড়ি ও অন্যান্য আঁটসাঁট অলংকার থাকলে ফুলে যাওয়ার আগেই খুলে ফেলতে হবে। তবে ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকা পোশাক জোর করে টেনে সরানো যাবে না। প্রাথমিক পরিচর্যার পর পরিষ্কার, শুকনা কাপড় বা জীবাণুমুক্ত ড্রেসিং দিয়ে ক্ষতস্থান আলতোভাবে ঢেকে চিকিৎসা নিতে হবে।
টুথপেস্ট ও বরফ ব্যবহারে বাড়তে পারে বিপদ
পোড়া স্থানে টুথপেস্ট, ডিম, ঘি, তেল, গোবর কিংবা চুন লাগানোর প্রচলিত অভ্যাস বিপজ্জনক হতে পারে। এসব উপাদান ক্ষতস্থানে দূষণ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একইভাবে সরাসরি বরফ ব্যবহার করাও উচিত নয়।
পোড়া স্থানে ফোসকা দেখা দিলে তা ফাটানো যাবে না। ফোসকা ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এটি ফাটিয়ে ফেললে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই ক্ষতস্থানে নিজে থেকে কোনো উপাদান প্রয়োগ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যেসব লক্ষণে জরুরি হাসপাতালে নিতে হবে
দগ্ধ ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট হলে, মুখ বা গলা পুড়ে গেলে, ধোঁয়া শ্বাসনালিতে প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে কিংবা ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়লে এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। একইভাবে শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলে বা ক্ষত গভীর হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দগ্ধ হওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে হাসপাতালের চিকিৎসার বিকল্প নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী বার্ন ইউনিট বা প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
পুনর্বাসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আধুনিক চিকিৎসা
আগুনে পোড়ার ক্ষতি শুধু ত্বকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গুরুতর দগ্ধ হলে অঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হতে পারে, ত্বকে স্থায়ী দাগ তৈরি হতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
অধ্যাপক ডা. মো. আইয়ূব আলী বলেন, সঠিক সময়ে স্কিন গ্রাফটিং ও পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার করা হলে দাগ, ত্বকের সংকোচন ও বিকৃতি কমানোর পাশাপাশি অঙ্গের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা পাওয়া যায়। চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও দগ্ধ ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই দুর্ঘটনায় ক্ষতি কমানোর প্রথম পদক্ষেপ
অগ্নিদুর্ঘটনার সময় আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। কিন্তু আগুন লাগলে কী করতে হবে, কী করা যাবে না এবং কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে—এসব বিষয়ে আগে থেকেই ধারণা থাকলে বিপদের মুহূর্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ডা. মো. আইয়ূব আলীর মতে, পোড়ার ক্ষতি কমাতে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ভুল চিকিৎসা এড়িয়ে চলাও জরুরি। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের আলো/জেএন/এসএ


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]