মাত্র ৫ সেকেন্ড হাত ধুলেই কি দূর হয় সব জীবাণু?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কার্যকরভাবে হাত পরিষ্কার করতে শুধু পানি ব্যবহার বা কয়েক সেকেন্ড হাত ভিজিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সাবান, হাতের সব অংশ ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করা এবং পর্যাপ্ত সময় ধরে ধোয়া। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ঘষার পরামর্শ দেয়।
প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার কমাতে হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য।
পাঁচ সেকেন্ড হাত ধুলেই কি পরিষ্কার হয়?
দ্রুত হাত ধুলে দৃশ্যমান কিছু ময়লা দূর হতে পারে। তবে হাতের ত্বকে থাকা রোগজীবাণু কার্যকরভাবে কমানোর জন্য এত অল্প সময় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক, নখের আশপাশ, বুড়ো আঙুল ও হাতের পেছনের অংশ ঠিকভাবে পরিষ্কার না হলে সেখানে জীবাণু থেকে যেতে পারে।
হাত দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও তাতে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব থাকতে পারে। দূষিত হাতের মাধ্যমে এসব জীবাণু খাবার, মুখ কিংবা অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হাত পরিষ্কারের কার্যকারিতা মূলত সাবান ব্যবহার, ঘর্ষণ এবং পর্যাপ্ত সময় ধরে ধোয়ার ওপর নির্ভর করে। সাবান ময়লা ও জীবাণু ত্বক থেকে আলগা করতে সাহায্য করে। হাত ঘষার ফলে সেগুলো দূর হওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে আলগা হয়ে আসা ময়লা ও জীবাণু সরে যায়।
কতক্ষণ ধরে হাত ধোয়া উচিত?
সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, সাবান দিয়ে হাতের সব অংশ কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বর্ণিত প্রচলিত হাত ধোয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় হাত ভেজানো, সাবান লাগানো, ঘষে পরিষ্কার করা, পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা এবং শুকানোসহ সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড সময় লাগে।
সঠিকভাবে হাত ধোয়ার সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। প্রথমে পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে হাত ভিজিয়ে সাবান লাগাতে হবে। এরপর দুই হাতের তালু, হাতের পেছনের অংশ, আঙুলের ফাঁক, বুড়ো আঙুল, আঙুলের ডগা ও নখের আশপাশ ভালোভাবে ঘষতে হবে। সবশেষে পরিষ্কার পানিতে হাত ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
অনেকেই হাতের তালু পরিষ্কার করলেও আঙুলের ফাঁক কিংবা নখের নিচের অংশে যথেষ্ট মনোযোগ দেন না। ফলে হাত ধোয়ার পরও কিছু জায়গায় ময়লা ও জীবাণু থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই হাতের প্রতিটি অংশ পরিষ্কার করা জরুরি।
গরম পানি নাকি ঠান্ডা পানি—কোনটি বেশি কার্যকর?
হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রার চেয়ে সাবান ব্যবহার এবং ভালোভাবে হাত ঘষে পরিষ্কার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সময় গরম ও ঠান্ডা পানি জীবাণু দূর করার ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম কার্যকর হতে পারে।
তাই হাত পরিষ্কার করার জন্য অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং বেশি গরম পানি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে শুষ্কতা ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। নিজের জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করলেই চলে।
দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাধারণ সাবানই যথেষ্ট। প্রতিবার হাত ধোয়ার সময় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ব্যবহার করা জরুরি নয়। তবে হাত দৃশ্যত নোংরা বা তৈলাক্ত হলে সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
হাত শুকানোও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পর হাত শুকানোর বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু হাত ধোয়ার প্রক্রিয়ায় এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
ভেজা হাতে জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই হাত ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে অথবা পেপার টাওয়েল দিয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া উচিত।
বাড়িতে হাত মোছার তোয়ালে ব্যবহার করলে সেটি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। একই তোয়ালে দীর্ঘদিন ভেজা অবস্থায় পড়ে থাকলে তাতে ময়লা ও জীবাণু জমতে পারে। তাই তোয়ালে নোংরা হয়ে গেলে বদলে ফেলুন এবং ব্যবহারের পর শুকানোর ব্যবস্থা রাখুন।
কখন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করবেন?
সাবান ও পরিষ্কার প্রবাহমান পানি পাওয়া না গেলে বিকল্প হিসেবে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। দুই হাতের তালু, হাতের পেছনের অংশ, আঙুলের ফাঁক, বুড়ো আঙুল ও আঙুলের ডগায় স্যানিটাইজার ভালোভাবে লাগাতে হবে। এরপর হাত শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঘষতে হবে।
তবে স্যানিটাইজার সব পরিস্থিতিতে সাবান ও পানির বিকল্প নয়। হাত দৃশ্যত নোংরা বা তৈলাক্ত থাকলে এটি কম কার্যকর হতে পারে। আবার নোরোভাইরাসের মতো কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া বেশি উপযোগী।
বিশেষ করে টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার খাওয়ার আগে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তন করার পর, ময়লা আবর্জনা স্পর্শ করার পর এবং কাশি, হাঁচি বা নাক পরিষ্কার করার পরও হাত ভালোভাবে ধুতে হবে।
কোন কোন সময়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে জরুরি?
দৈনন্দিন জীবনে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে হাত ধোয়ার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন—
- খাবার তৈরি করার আগে, খাবার খাওয়ার আগে এবং অন্যকে খাবার পরিবেশনের আগে।
- টয়লেট ব্যবহারের পর।
- শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করার পর।
- কাশি, হাঁচি বা নাক ঝাড়ার পর।
- আবর্জনা, ময়লা কিংবা দূষিত বস্তু স্পর্শ করার পর।
- অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা করার আগে ও পরে।
- বাইরে থেকে বাড়িতে ফেরার পর, বিশেষ করে হাত ময়লা হলে।
এসব সময়ে হাত পরিষ্কার রাখলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
সচেতনতাই পারে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে
হাত ধোয়া ছোট একটি দৈনন্দিন কাজ হলেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়ো করে কয়েক সেকেন্ড হাত ধোয়ার পরিবর্তে সঠিক নিয়ম মেনে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ঘষে পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে হাতের সব অংশ পরিষ্কার করা এবং ধোয়ার পর ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়াও জরুরি। পরিবারের শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাস শেখানো গেলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, শুধু হাত ভিজিয়ে নেওয়া আর কার্যকরভাবে হাত ধোয়া এক বিষয় নয়। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলেই এই সহজ অভ্যাস থেকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যগত সুফল পাওয়া সম্ভব।
কালের আলো/জেএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array