খুঁজুন
                               
, ,
           

জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক

ভারতীয় হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারের পদক্ষেপ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৯ অপরাহ্ণ
ভারতীয় হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, সরকারের পদক্ষেপ দাবি

বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর অবাধে চলাফেরা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রবেশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান। তাঁর দাবি, কূটনীতিকের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কার্যালয়ে প্রবেশের বিষয়টি দেশের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বেলা সোয়া ১২টায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার প্রতিবাদ, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবাদ দমন এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের কথিত অপতৎপরতা বন্ধের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ-সমাবেশে এসব কথা বলেন খোমেনী ইহসান।

হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সমাবেশে খোমেনী ইহসান বলেন, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর অবাধে চলাফেরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক স্বাধীনতার প্রতি অবমাননাকর এবং কূটনৈতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

তিনি অভিযোগ করেন, কূটনীতিকের ভূমিকার পরিবর্তে দীনেশ ত্রিবেদী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কার্যালয়ে প্রবেশ করছেন। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে হাইকমিশনারের চলাফেরা বা সরকারি দপ্তরে প্রবেশের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে সমাবেশে বিস্তারিত প্রমাণ বা নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ নেই।

আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি

সমাবেশে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান খোমেনী ইহসান। এ জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

খোমেনী ইহসান বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ বর্তমান সরকারকে নিতে হবে। তাঁর দাবি, দলটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিশ্বের কোথাও স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করতে পারবেন না এবং ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের সুযোগও হারাবেন।

তিনি আরও বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নোবেলজয়ী ব্যক্তিকে হেনস্তা করার সাহস যেন কেউ না পায়, সে জন্য আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

এগুলো সমাবেশে খোমেনী ইহসানের দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য ও দাবি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলকে এভাবে চিহ্নিত করার সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়া বা পরিণতি সম্পর্কে সমাবেশে বিস্তারিত ব্যাখ্যার তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিক্ষোভ-সমাবেশে বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা

জাতীয় বিপ্লবী পরিষয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে সংগঠনটির সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদ, সহকারী সদস্য সচিব আব্দুস সালাম ও মো. সাইদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মীর শওকত আমীন, মহাসচিব মাওলানা আবদুল করিম এবং নবাব সলিমুল্লাহ অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জব্বারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সমাবেশে অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার প্রতিবাদ জানান এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্ক

সমাবেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ এবং আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে কোনো কূটনীতিকের কর্মকাণ্ড কূটনৈতিক রীতিনীতির পরিপন্থী কি না, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা, সংশ্লিষ্ট বিধি এবং প্রাসঙ্গিক সরকারি বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

১০ টাকার আঁটিতে জীবিকার লড়াই আব্দুল আলিমের

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০২ অপরাহ্ণ
১০ টাকার আঁটিতে জীবিকার লড়াই আব্দুল আলিমের

বর্ষা এলেই চলনবিলের জলজ উদ্ভিদ হয়ে ওঠে আব্দুল আলিমের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বছরের বাকি সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও বর্ষার চার মাস বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি করেন তিনি। এসব বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন ৪২ বছর বয়সী এই মানুষ। নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলিম। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালে চলনবিল থেকে শাপলা ও ঢ্যাপ সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজিবাজারে। সেখানে অন্যান্য সবজি ও মাছের পাশাপাশি তাঁর সংগ্রহ করা জলজ উদ্ভিদও কিনে নেন ক্রেতারা।

বর্ষায় বিলের জলজ উদ্ভিদই ভরসা

আব্দুল আলিমের জীবিকা মূলত কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। বছরের অধিকাংশ সময় অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করেন তিনি। তবে বর্ষা মৌসুমে চলনবিল পানিতে ভরে উঠলে তাঁর কাজের ধরন বদলে যায়। এ সময় বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করাই হয়ে ওঠে আয়ের অন্যতম পথ। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজিবাজারে শাপলা ও ঢ্যাপ নিয়ে বসেছিলেন আব্দুল আলিম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ক্রেতাদের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। বাজারে মাছ ও নানা ধরনের সবজি কিনতে আসা মানুষের কেউ কেউ তাঁর কাছ থেকে কিনছিলেন চলনবিলের এসব জলজ উদ্ভিদ।

১০ টাকার আঁটি, আয়ও সীমিত

বাজারে আব্দুল আলিম ৭ থেকে ১০টি ঢ্যাপের একটি আঁটি বিক্রি করছেন ১০ টাকায়। অন্যদিকে, ১০টি শাপলা নিয়ে তৈরি একটি আঁটির দামও ১০ টাকা। কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় এসব পণ্য থেকে তাঁর আয় খুব বেশি হয় না। দিনভর বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা-ঢ্যাপ বিক্রি করে যে টাকা হাতে আসে, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে হয় তাঁকে। পণ্যের দাম কম হওয়ায় সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নির্ভর করতে হয় নিয়মিত পরিশ্রমের ওপর। ফলে তাঁর কাছে প্রতিদিনের এই বিক্রি শুধু বাজারে পণ্য বেচাকেনা নয়, পরিবারের জন্য খাবার জোগাড়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

চলনবিলের সম্পদে স্থানীয় মানুষের জীবিকা

চলনবিলের শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় পরিচিত উপাদান। বর্ষা মৌসুমে বিলের পানিতে জন্মানো এসব জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে অনেকে নিজেদের খাবারের চাহিদা মেটান। আবার কেউ কেউ এগুলো বাজারে বিক্রি করে উপার্জনের পথ তৈরি করেন। বিশেষ করে কৃষিকাজের বাইরে মৌসুমি আয়ের সুযোগ খোঁজা মানুষের কাছে বিলের এসব প্রাকৃতিক সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আব্দুল আলিমের মতো সংগ্রাহকেরা বিল থেকে পণ্য তুলে বাজারে পৌঁছে দেন। এতে একদিকে ক্রেতারা স্থানীয়ভাবে এসব খাবার কেনার সুযোগ পান, অন্যদিকে সংগ্রাহকেরাও কিছুটা আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন।

জীবিকার জন্য প্রতিদিনের সংগ্রাম

আব্দুল আলিমের জীবনে বর্ষার চার মাস আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এ সময় বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করাই তাঁর উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। বাকি সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। স্বল্প আয়ের এই কাজে প্রতিদিনই পরিশ্রম করতে হয়। বিল থেকে পণ্য সংগ্রহ, বাজারে নিয়ে আসা এবং ক্রেতাদের কাছে বিক্রি—সব মিলিয়ে তাঁর দিন কাটে জীবিকার সন্ধানে। বিক্রির অর্থ খুব বেশি না হলেও পরিবারের ব্যয় মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

খুলনা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ
বাবা হারিয়েছেন আড়াই বছরেই, মায়ের সংগ্রামে শরিফুলের বিসিএস জয়

বাবা মারা যান যখন তাঁর বয়স মাত্র আড়াই বছর। তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েন মা আমেনা বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো বিলে মাছ ধরেছেন। সংসারের অভাব মেটাতে ছুটেছেন বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরেও। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায় ঘরবাড়ি। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। মায়ের সেই সংগ্রাম আর নিজের অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে একসময় গ্রামের কলেজ থেকে সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। চাকরির পাশাপাশি চালিয়ে যান বিসিএসের প্রস্তুতি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনার কয়রা উপজেলার বামিয়া গ্রামের মো. শরিফুল ইসলাম। শরিফুলের এই অর্জন কেবল একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই এবং সন্তানের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকার কাহিনি।

আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো

শরিফুল ইসলামের বাবা তফেজ উদ্দীন পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন শরিফুলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন আমেনা বেগম। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৪-২৫ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন করে সংসার গড়ার সুযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সন্তানদের বড় করে তোলা এবং তাদের শিক্ষিত করাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেন। শুরুর দিকে শরিফুলদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর নানা। নাতিদের খাবারের ব্যবস্থা করতে সপ্তাহে একবার বাজার করে দিতেন। মেয়ের নামে এক বিঘা জমিও লিখে দিয়েছিলেন। সেই সহযোগিতা পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে নানার মৃত্যুর পর সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়ে আমেনা বেগমের কাঁধে।

আইলায় ভেঙে যায় ঘর, থেমে থাকেনি লড়াই

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পানির মধ্যে উঁচু তক্তার ওপর খাট রেখে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। ২০১২ সাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পরিবারটিকে। সংসার চালাতে আমেনা বেগম কখনো বিলে মাছ ধরেছেন, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ৪০ দিনের কর্মসূচিতেও কাজ করেছেন। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তা চাননি তিনি। মায়ের এই নিরন্তর সংগ্রামই ধীরে ধীরে শরিফুলের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। ছোটবেলায় পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী না থাকলেও একসময় তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জীবন বদলানোর অন্যতম পথ শিক্ষা।

অষ্টম শ্রেণি থেকেই বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

শরিফুল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি তাঁর খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। তবে অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মায়ের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এ সময় বড় ভাইয়ের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনাও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়ান তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে বামিয়া এমএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন শরিফুল। ফল ভালো হলেও আর্থিক সংকট তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হন কয়রার খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। নিজের লক্ষ্য পূরণে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি।

গ্রামের কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

অভাব-অনটনকে সঙ্গী করেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় সাফল্য আসে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। ভর্তি পরীক্ষায় ৮১ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় ৩৪৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি। সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার। গ্রামের একটি কলেজ থেকে পড়াশোনা করে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে ঢাকায় পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজের খরচের বড় একটি অংশ জোগাতে টিউশনি করতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র এবং যেসব পরিবারের সন্তানদের তিনি পড়াতেন, তাঁদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন শরিফুল। নানা মানুষের সহায়তা ও নিজের পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

জনতা ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি বিসিএস প্রস্তুতি

পড়াশোনা শেষ করে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন শরিফুল ইসলাম। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি। কর্মব্যস্ততার মধ্যেই চালিয়ে যান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন মা আমেনা বেগম, বড় ভাই এবং স্ত্রী রাবিনা সুলতানা। পরিবারের সমর্থন তাঁকে লক্ষ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্রথম দুটি বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও হাল ছাড়েননি শরিফুল। ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যান। পরে ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ৪০তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান শরিফুল। তাঁর এ অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবারের নিরন্তর সমর্থন।

শুধু নিজের নয়, অন্য শিক্ষার্থীদের স্বপ্নও পূরণ করতে চান

শরিফুল মনে করেন, আর্থিক সংকট ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে অনেকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, একজন শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়ার পথে আর্থিক সহায়তা, পরিবারের সমর্থন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে তাঁর মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে চান তিনি। শরিফুলের লক্ষ্য, শুধু নিজের সাফল্যে থেমে না থেকে অন্যদেরও স্বপ্নপূরণে সহযোগিতা করা। কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল অভাবের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়—এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

মায়ের সংগ্রামের সার্থকতা

যে মা একসময় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেছেন, বিলে মাছ ধরেছেন, দূরে গিয়ে শ্রম দিয়েছেন—আজ তাঁর সেই সন্তান বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শরিফুলের এ সাফল্য আমেনা বেগমের দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই গল্পে শুধু সাফল্যের আনন্দ নেই; আছে দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রিয়জন হারানো এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বাধার মধ্যেও মা ও ছেলে নিজেদের স্বপ্ন আঁকড়ে রেখেছেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

জাতীয় দলে ফিরতে চান জাহানারা, ফিরতে হলে মানতে হবে যে শর্ত

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪১ অপরাহ্ণ
জাতীয় দলে ফিরতে চান জাহানারা, ফিরতে হলে মানতে হবে যে শর্ত
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও পেসার জাহানারা আলম আবারও জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামতে চান। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার জাতীয় দলে ফেরার আগ্রহ জানিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে দলে ফিরতে হলে তাঁকে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে।

ফেরার আগ্রহ জানালেন জাহানারা

জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলেছিলেন জাহানারা। এরপর থেকে তাঁকে আর লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যায়নি। এবার আবারও জাতীয় দলে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই পেসার।

বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে জাহানারার যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জাতীয় দলে ফেরার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাহানারার ফিটনেস ও মাঠের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হবে।

ফিটনেস পরীক্ষা ও ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার শর্ত

জাহানারার জাতীয় দলে ফেরার বিষয়ে বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান বলেন, ‘হ্যাঁ, সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে নির্বাচকরা আছেন, সবাই দেখবেন সে ফিট আছে কি না। ফিটনেস টেস্টে তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে।’

তিনি আরও জানান, জাতীয় দলে ফেরার পরবর্তী ধাপে যেতে হলে জাহানারাকে দেশে এসে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে হবে। সেখানে তাঁর পারফরম্যান্স ও শারীরিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করবেন নির্বাচকেরা।

রফিকুল ইসলাম বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলা এবং জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলেই জাহানারাকে দলে ফেরানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণে বিরতি

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন জাহানারা। তবে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় দল থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার কথা বিসিবিকে জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর একই বছরের শেষদিকে দলের টিম ম্যানেজমেন্টের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন এই ক্রিকেটার। পরবর্তী সময়ে বিসিবি নিজস্ব স্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জাহানারার পরিসংখ্যান

২০১১ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় জাহানারা আলমের। এরপর বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে ৪৮টি এবং টি-টোয়েন্টিতে ৬০টি উইকেট শিকার করেন তিনি। অভিজ্ঞ এই পেসার দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বোলিং বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এদিকে, সামনে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে বেশ কয়েকটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বিসিবির। এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় দলে ফেরার জন্য নিজের প্রস্তুতি ও সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে জাহানারাকে।

জাতীয় দলে ফেরার সিদ্ধান্ত এখন মাঠের পারফরম্যান্সে

বিসিবির বক্তব্য অনুযায়ী, জাহানারার জন্য জাতীয় দলের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়। তবে ফেরার পথ নির্ভর করছে তাঁর ফিটনেস, ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশগ্রহণ এবং পারফরম্যান্সের ওপর। কোন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলবেন, সে সিদ্ধান্তও তাঁকেই নিতে হবে।

দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে ফেরার এই প্রচেষ্টায় জাহানারা কতটা সফল হন, তা নির্ধারণ করবে তাঁর মাঠের পারফরম্যান্স ও নির্বাচকদের মূল্যায়ন।

কালের আলো/এএইচ/এস এ