খুঁজুন
                               
, ,
           

চিনি খাওয়া কমছে বাংলাদেশে, স্বাস্থ্যসচেতনতা নাকি ক্রয়ক্ষমতার সংকট?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
চিনি খাওয়া কমছে বাংলাদেশে, স্বাস্থ্যসচেতনতা নাকি ক্রয়ক্ষমতার সংকট?
বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে চিনির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এই পরিবর্তনের পেছনে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, চিনির দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে চিনির ব্যবহার কমে যাওয়াকে সরাসরি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিস্তার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও এ প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন। পরের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৩৭ হাজার টনে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ব্যবহার আরও কমে ২০ লাখ ৪৫ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার টনে। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে চিনির ব্যবহার ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টন হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান দেশের চিনির বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে মোট ব্যবহার কমার অর্থ এই নয় যে দেশের প্রত্যেক মানুষ আগের তুলনায় কম চিনি খাচ্ছেন। জনসংখ্যা, শিল্পকারখানায় চিনির ব্যবহার, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতিও সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

দেশে চিনির ব্যবহার কমার প্রবণতার পাশাপাশি ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০১১ সালের প্রায় ৮৪ লাখ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।

২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আক্রান্তদের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের রোগ শনাক্ত হয়নি, সংখ্যায় যা প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার। ফলে অনেক মানুষ রোগ সম্পর্কে না জেনেই দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০১১ সালে দেশে উচ্চ রক্তচাপের হার ছিল ২৬ শতাংশ, যা ২০১৭-১৮ সালের জরিপে বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষ সিরোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের বিস্তারের সঙ্গে চিনির ব্যবহার কমা বা বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হলে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। এসব রোগের ঝুঁকিতে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বংশগত বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয়ও ভূমিকা রাখে।

চায়ে চিনি কমালেই কি কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি?

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক ভারসাম্যহীনতা ফ্যাটি লিভার ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণে দৈনন্দিন খাবারে বাড়তি চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে চা একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ। চায়ে চিনি কমানো বা ধীরে ধীরে চিনি ছাড়া চা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বাড়তি চিনি গ্রহণ কমানোর একটি উপায় হতে পারে। তবে শুধু চায়ের চিনির দিকে নজর দিলেই চলবে না। বিস্কুট, কেক, বেকারি পণ্য, কোমল পানীয়, মিষ্টি ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি থাকতে পারে।

খাদ্যপণ্যের লেবেল পড়ে চিনি বা যুক্ত চিনির পরিমাণ যাচাই করা, কোমল পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

চিনির দাম ও ক্রয়ক্ষমতার চাপও কি বড় কারণ?

চিনির ব্যবহার কমে যাওয়ার পেছনে স্বাস্থ্যসচেতনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাবার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলো খাদ্য কেনার ক্ষেত্রে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য হয়। সে ক্ষেত্রে চিনি ও চিনিযুক্ত খাবারের ব্যবহার কমে যেতে পারে।

তবে ব্যবহার কমার কতটা অংশ স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে এবং কতটা অংশ মূল্যস্ফীতি বা ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে ঘটেছে, তা নির্দিষ্টভাবে বলতে হলে ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাস, আয়, বাজারদর ও কেনাকাটার ধরন নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শুধু জাতীয় পর্যায়ের মোট ব্যবহার থেকে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণ নিশ্চিত করা যায় না।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে চিনি কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার বা পুষ্টিকর বিকল্প থেকেও বঞ্চিত হলে সেটিকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের উন্নতি বলা যাবে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদনেও বড় পরিবর্তন

দেশের চিনির বাজারে পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর উৎপাদন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে এসব চিনিকলে উৎপাদন ছিল ৮২ হাজার টনের বেশি। ২০২২-২৩ মৌসুমে তা কমে মাত্র ২১ হাজার ৩১৪ টনে নেমে আসে। পরে ২০২৫-২৬ মৌসুমে নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে উৎপাদন দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৩২৬ টনে।

উৎপাদনের এই ওঠানামা চিনিশিল্পের সক্ষমতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের চাহিদা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদন কমা এবং দেশের মোট চিনির ব্যবহার কমে যাওয়াকে একই ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশে চিনির সরবরাহে বেসরকারি খাত ও আমদানিরও ভূমিকা রয়েছে।

চিনির ব্যবহার কমা কি সত্যিই সুসংবাদ?

বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার কমার প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে, যদি এর পেছনে থাকে সচেতনভাবে বাড়তি চিনি কমানো ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। কিন্তু একই প্রবণতা যদি মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাজারদর বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল হয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

তাই চিনির ব্যবহার কমার প্রকৃত কারণ বুঝতে বাজারের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের আয়, খাদ্যব্যয়, চিনিযুক্ত পণ্যের বিক্রি এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের মতো রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, দেশে চিনির ব্যবহার কমার পেছনে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও অর্থনৈতিক চাপ—দুই কারণই ভূমিকা রাখতে পারে। কোনটির প্রভাব বেশি, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।

কালের আলো রিপোর্ট/জেএন/এসএ

২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্বোধন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্বোধন

বহুপ্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্বোধন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্পন্ন হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সংসদীয় কমিটি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়। আগামী ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগরে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় গঙ্গা চুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে কমিটি।

বৈঠকে দেশের সার্বিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বিদ্যমান চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে, নাকি নতুন করে নবায়ন করা হবে—সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও এ-সংক্রান্ত সার্বিক প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রম সক্রিয়ভাবে চলমান রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

পানি সম্পদ ব্যবস্থার অন্যতম বড় উদ্যোগ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অংশ হিসেবে আগামী ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগরে সংসদীয় কমিটির সরাসরি পরিদর্শনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিদর্শনের পর কাজের অগ্রগতি আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, সব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করে আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই বহুকাঙ্ক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।

বৈঠকের শুরুতে স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণী সংশোধনী সাপেক্ষে নিশ্চিত ও অনুমোদন করা হয়। এরপর পূর্ববর্তী বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জামালপুর জেলার ব্রহ্মপুত্র নদ এবং জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙন প্রতিরোধ’ এবং ‘জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর বামতীর, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও আলাই নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ’ শীর্ষক প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন ও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা পরিচালনা করা হয়।

এছাড়া রাজশাহী ও নাটোর জেলার অন্তর্গত বারনই নদী পুনঃখনন, নদীর পানি দূষণমুক্ত ও অবৈধ দখলমুক্তকরণ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করার লক্ষ্যে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী বরাবর অবস্থিত বিভিন্ন পোল্ডারের (৬৭/এ, ৬৭, ৬৭/বি এবং ৬৮) পুনর্বাসন প্রকল্পের ২য় সংশোধিত অগ্রগতি এবং দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সর্বশেষ অবস্থা খতিয়ে দেখা হয়।

ওই বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু, মাজহারুল ইসলাম, ফরিদুল কবীর তালুকদার, মো. ইজ্জত উল্লাহ, অলি উল্লাহ এবং মশিউর রহমান খান অংশ নেন। এছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার মহাপরিচালক, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বোর্ডের প্রধানরা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সাত বছর পর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণে বাধা কাটল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৮ অপরাহ্ণ
সাত বছর পর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণে বাধা কাটল

প্রায় ৭ বছর বন্ধ থাকা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে বাধা নেই বলে আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত এ আদেশ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ​ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যে চলমান কাজ এবং তার নিচে দিয়ে চার লেন বিশিষ্ট রেলপথ উন্নয়নের কাজ একটি আইনি জটিলতায় বিগত সাত বছর যাবৎ বন্ধ ছিল। আজ ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আদেশের ফলে সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা এ উন্নয়ন কাজের পথে আইনি বাধা দূর হলো।

​আদালত আদেশ দিয়েছেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং তার নিচে চার লেন বিশিষ্ট রেললাইন করতে সরকারের উন্নয়ন কাজ পরিচালনায় কোনো বাধা নেই। এটা রেলওয়ের জায়গা হলেও রিটকারীরা এই অংশের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিয়ারাবাগ, মগবাজার পিয়ারাবাগ অংশের একটু অল্প একটু জায়গা দাবি করেন। এই একই জায়গার দাবিদার বাংলাদেশ রেলওয়েও। এই দাবি এবং পাল্টা দাবির কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আসলে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এই অংশটুকুর ওপর কোনো উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হয়নি।

রিটকারীর মোস্তাফিজুর রহমানের মূল দাবি ছিল, ২০১৯ সালের প্রথম দিকে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে তিনি যে মামলা করেছিলেন একই বছরের ২৯ মার্চ সেই মামলায় তার পক্ষে রায় এসেছে। তখন ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ায় সরকার প্রাথমিকভাবে সুপ্রিম কোর্টে গেলেও আদেশ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে সরকারের পক্ষ থেকে আপিল করা হয় এবং এ বছরের ২ সেপ্টেম্বর রেলওয়ের পক্ষে রায় ঘোষণা করা হয়।

​এই রায়টি চ্যালেঞ্জ করে এ এম মোস্তাফিজুর রহমান হাইকোর্ট বিভাগে ১৩৮৯২ অব ২০২৬ নম্বর রিট পিটিশন দায়ের করলে চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ স্থিতাবস্থা জারি করেন। ফলে কাজ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়।

​হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়, ডিসি ও সেটেলমেন্ট অফিসারের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে সিভিল মিসলেনিয়াস পিটিশন নম্বর ৯৯৪ অব ২০২৬ দায়ের করা হয়। অবকাশকালীন বিচারপতির বিশেষ অনুমতি নিয়ে আজ বিকেলে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত স্থিতিবস্থার আদেশ তুলে নেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

পৃথিবী ও মহাকাশে কি একই গতিতে চলে সময়?

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৭ অপরাহ্ণ
পৃথিবী ও মহাকাশে কি একই গতিতে চলে সময়?
আমরা সাধারণত মনে করি, এক মিনিট মানে সবার জন্য সমান সময়। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কিংবা পৃথিবী থেকে মহাকাশে—যেখানেই থাকি না কেন, সময় একই গতিতে এগিয়ে চলে। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সময়ের প্রবাহ সব পর্যবেক্ষকের কাছে এক রকম নয়। কোনো বস্তু কত দ্রুত গতিতে চলছে এবং সেটি কতটা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে সময়ের হিসাব বদলে যেতে পারে।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদে সময়ের এই পার্থক্যকে বলা হয় ‘টাইম ডাইলেশন’ বা সময় প্রসারণ। বিষয়টি শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, এটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এমনকি পৃথিবীতে ব্যবহৃত জিপিএস প্রযুক্তির নির্ভুলতা বজায় রাখতেও সময় প্রসারণের হিসাব প্রয়োজন হয়।

আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করলে কী হবে?

বিষয়টি বুঝতে দুই যমজ ভাইয়ের কথা কল্পনা করা যাক। একজন পৃথিবীতে থেকে গেল, আর অন্যজন আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলতে সক্ষম একটি মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। ভ্রমণ শেষে মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে এলে দেখা যেতে পারে, পৃথিবীতে থাকা ভাইটির বয়স ভ্রমণকারী ভাইয়ের তুলনায় বেশি বেড়েছে।

এর কারণ, দুজনের জন্য অতিবাহিত সময়ের পরিমাণ এক নয়। মহাকাশযানে থাকা ভাইটির নিজের ঘড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। তার কাছে সময় থেমে যায়নি কিংবা ঘড়ির কাঁটা অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে যায়নি। কিন্তু পৃথিবীতে থাকা ভাইয়ের ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যেতে পারে, মহাকাশযাত্রীর জন্য তুলনামূলক কম সময় অতিবাহিত হয়েছে।

এই ঘটনাটি ‘টুইন প্যারাডক্স’ বা যমজ-সংক্রান্ত আপেক্ষিকতার সমস্যা হিসেবে পরিচিত। বাস্তবে এর ব্যাখ্যায় মহাকাশযাত্রীর যাত্রাপথ, গতি পরিবর্তন এবং ফিরে আসার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে, ভিন্ন ভিন্ন গতিপথে চলা দুই ব্যক্তির মধ্যে পুনরায় মিলিত হওয়ার পর বয়সের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

গতির কারণে কীভাবে সময়ের পার্থক্য তৈরি হয়?

বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষকের তুলনায় একটি বস্তু যত বেশি বেগে চলবে, তার নিজস্ব ঘড়িতে অতিবাহিত সময়ের সঙ্গে স্থির পর্যবেক্ষকের ঘড়ির হিসাবের পার্থক্য তত বেশি হতে পারে। আলোর গতির কাছাকাছি বেগে এই প্রভাব উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশযাত্রীর কাছে তার নিজের ঘড়ি, হৃদস্পন্দন কিংবা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধীর বলে মনে হবে না। তার কাছে এক সেকেন্ড ঠিক এক সেকেন্ডের মতোই অনুভূত হবে। পার্থক্যটি বোঝা যায় যখন ভিন্ন গতিপথে চলা পর্যবেক্ষকদের ঘড়ির হিসাব তুলনা করা হয়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গাড়ি, ট্রেন কিংবা বিমানের গতি আলোর গতির তুলনায় অত্যন্ত কম। তাই এসব ক্ষেত্রে সময় প্রসারণের প্রভাব এত ক্ষুদ্র যে সাধারণ ঘড়ি দিয়ে তা সহজে বোঝা যায় না। কিন্তু অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি এবং দ্রুতগতির কণার পরীক্ষায় এই প্রভাব শনাক্ত করা সম্ভব।

মহাকর্ষও বদলে দিতে পারে সময়ের হিসাব

সময়ের পার্থক্য শুধু গতির কারণেই ঘটে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার সঙ্গেও সময়ের প্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে, শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকা ঘড়ি তুলনামূলক দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ঘড়ির চেয়ে ধীরে চলে।

পৃথিবীর উদাহরণেই বিষয়টি বোঝা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি রাখা একটি ঘড়ি পাহাড়ের চূড়ায় রাখা একই ধরনের ঘড়ির তুলনায় সামান্য ধীরে চলবে। পাহাড়ের চূড়ায় পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব কিছুটা কম হওয়ায় সেখানে সময়ের প্রবাহ তুলনামূলক দ্রুত হয়।

এই পার্থক্য মানুষের অনুভূতিতে ধরা পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ির সাহায্যে তা পরিমাপ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইএসটি) গবেষকেরা ২০১০ সালে দেখিয়েছিলেন, মাত্র ৩৩ সেন্টিমিটার উচ্চতার ব্যবধানেও দুটি অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ির সময়ের হিসাবের পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব।

অর্থাৎ, সময় প্রসারণের ঘটনা শুধু দূর মহাকাশ কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের মতো চরম পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীতেও গতি ও মহাকর্ষের কারণে ঘড়ির সময়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়।

মোবাইলের জিপিএসেও কাজে লাগে আপেক্ষিকতাবাদ

সময় প্রসারণের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহারগুলোর একটি হলো গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস। মোবাইল ফোনে রাস্তা খুঁজে পাওয়া, গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করা কিংবা কোনো জায়গায় পৌঁছানোর পথ নির্ধারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।

জিপিএস উপগ্রহগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় সংকেত পাঠায়। পৃথিবীতে থাকা রিসিভার একাধিক উপগ্রহের সংকেত পৌঁছানোর সময় বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান নির্ণয় করে। এ ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকেত আলোর গতিতে চললেও সামান্য সময়ের ভুল অবস্থান নির্ণয়ে বড় ধরনের ত্রুটি তৈরি করতে পারে।

কিন্তু উপগ্রহের ঘড়ির ওপর একই সঙ্গে দুটি আপেক্ষিকতাজনিত প্রভাব কাজ করে। উপগ্রহের গতি পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় তার ঘড়িকে প্রতিদিন প্রায় ৭ মাইক্রোসেকেন্ড পিছিয়ে দেয়। অন্যদিকে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে অবস্থানের কারণে উপগ্রহের ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে যায়।

দুটি প্রভাব একত্রে বিবেচনা করলে উপগ্রহের ঘড়ি পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে চলে। সময়ের এই পার্থক্য সংশোধন না করলে জিপিএসের অবস্থান নির্ণয়ে দ্রুত বড় ভুল জমতে থাকত। তাই জিপিএস ব্যবস্থার নকশা ও পরিচালনায় আপেক্ষিকতাবাদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সময় কি তাহলে সবার জন্য এক নয়?

সময় প্রসারণের ধারণা আমাদের প্রচলিত সময়বোধকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। আমরা সাধারণত সময়কে একটি অভিন্ন প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করি, যেন মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থানে একই গতিতে ঘড়ির কাঁটা চলছে। কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদ দেখায়, সময়ের হিসাব পর্যবেক্ষকের গতি এবং মহাকর্ষীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে সময় সম্পূর্ণ অনিশ্চিত বা ইচ্ছেমতো বদলে যায়। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘড়ির সময় কীভাবে ভিন্ন হবে, তা গাণিতিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়।

আইনস্টাইনের তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মহাবিশ্বে সময় ও স্থানকে আলাদা করে বিবেচনা করা যায় না। গতি, মহাকর্ষ এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের সঙ্গে সময়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে ধারণাকে একসময় কেবল তাত্ত্বিক মনে হতো, সেটিই আজ আধুনিক প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

কালের আলো/এসএ