চিনি খাওয়া কমছে বাংলাদেশে, স্বাস্থ্যসচেতনতা নাকি ক্রয়ক্ষমতার সংকট?
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন। পরের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৩৭ হাজার টনে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ব্যবহার আরও কমে ২০ লাখ ৪৫ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার টনে। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে চিনির ব্যবহার ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টন হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান দেশের চিনির বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে মোট ব্যবহার কমার অর্থ এই নয় যে দেশের প্রত্যেক মানুষ আগের তুলনায় কম চিনি খাচ্ছেন। জনসংখ্যা, শিল্পকারখানায় চিনির ব্যবহার, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতিও সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
দেশে চিনির ব্যবহার কমার প্রবণতার পাশাপাশি ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০১১ সালের প্রায় ৮৪ লাখ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আক্রান্তদের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের রোগ শনাক্ত হয়নি, সংখ্যায় যা প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার। ফলে অনেক মানুষ রোগ সম্পর্কে না জেনেই দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০১১ সালে দেশে উচ্চ রক্তচাপের হার ছিল ২৬ শতাংশ, যা ২০১৭-১৮ সালের জরিপে বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষ সিরোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের বিস্তারের সঙ্গে চিনির ব্যবহার কমা বা বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হলে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। এসব রোগের ঝুঁকিতে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বংশগত বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয়ও ভূমিকা রাখে।
চায়ে চিনি কমালেই কি কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি?
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক ভারসাম্যহীনতা ফ্যাটি লিভার ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণে দৈনন্দিন খাবারে বাড়তি চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে চা একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ। চায়ে চিনি কমানো বা ধীরে ধীরে চিনি ছাড়া চা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বাড়তি চিনি গ্রহণ কমানোর একটি উপায় হতে পারে। তবে শুধু চায়ের চিনির দিকে নজর দিলেই চলবে না। বিস্কুট, কেক, বেকারি পণ্য, কোমল পানীয়, মিষ্টি ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি থাকতে পারে।
খাদ্যপণ্যের লেবেল পড়ে চিনি বা যুক্ত চিনির পরিমাণ যাচাই করা, কোমল পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
চিনির দাম ও ক্রয়ক্ষমতার চাপও কি বড় কারণ?
চিনির ব্যবহার কমে যাওয়ার পেছনে স্বাস্থ্যসচেতনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাবার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলো খাদ্য কেনার ক্ষেত্রে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য হয়। সে ক্ষেত্রে চিনি ও চিনিযুক্ত খাবারের ব্যবহার কমে যেতে পারে।
তবে ব্যবহার কমার কতটা অংশ স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে এবং কতটা অংশ মূল্যস্ফীতি বা ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে ঘটেছে, তা নির্দিষ্টভাবে বলতে হলে ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাস, আয়, বাজারদর ও কেনাকাটার ধরন নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শুধু জাতীয় পর্যায়ের মোট ব্যবহার থেকে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণ নিশ্চিত করা যায় না।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে চিনি কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার বা পুষ্টিকর বিকল্প থেকেও বঞ্চিত হলে সেটিকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের উন্নতি বলা যাবে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদনেও বড় পরিবর্তন
দেশের চিনির বাজারে পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর উৎপাদন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ মৌসুমে এসব চিনিকলে উৎপাদন ছিল ৮২ হাজার টনের বেশি। ২০২২-২৩ মৌসুমে তা কমে মাত্র ২১ হাজার ৩১৪ টনে নেমে আসে। পরে ২০২৫-২৬ মৌসুমে নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে উৎপাদন দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৩২৬ টনে।
উৎপাদনের এই ওঠানামা চিনিশিল্পের সক্ষমতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের চাহিদা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদন কমা এবং দেশের মোট চিনির ব্যবহার কমে যাওয়াকে একই ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশে চিনির সরবরাহে বেসরকারি খাত ও আমদানিরও ভূমিকা রয়েছে।
চিনির ব্যবহার কমা কি সত্যিই সুসংবাদ?
বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার কমার প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে, যদি এর পেছনে থাকে সচেতনভাবে বাড়তি চিনি কমানো ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। কিন্তু একই প্রবণতা যদি মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাজারদর বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল হয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তাই চিনির ব্যবহার কমার প্রকৃত কারণ বুঝতে বাজারের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের আয়, খাদ্যব্যয়, চিনিযুক্ত পণ্যের বিক্রি এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের মতো রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, দেশে চিনির ব্যবহার কমার পেছনে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও অর্থনৈতিক চাপ—দুই কারণই ভূমিকা রাখতে পারে। কোনটির প্রভাব বেশি, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।
কালের আলো রিপোর্ট/জেএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array