পৃথিবী ও মহাকাশে কি একই গতিতে চলে সময়?
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদে সময়ের এই পার্থক্যকে বলা হয় ‘টাইম ডাইলেশন’ বা সময় প্রসারণ। বিষয়টি শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, এটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এমনকি পৃথিবীতে ব্যবহৃত জিপিএস প্রযুক্তির নির্ভুলতা বজায় রাখতেও সময় প্রসারণের হিসাব প্রয়োজন হয়।
আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করলে কী হবে?
বিষয়টি বুঝতে দুই যমজ ভাইয়ের কথা কল্পনা করা যাক। একজন পৃথিবীতে থেকে গেল, আর অন্যজন আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলতে সক্ষম একটি মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। ভ্রমণ শেষে মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে এলে দেখা যেতে পারে, পৃথিবীতে থাকা ভাইটির বয়স ভ্রমণকারী ভাইয়ের তুলনায় বেশি বেড়েছে।
এর কারণ, দুজনের জন্য অতিবাহিত সময়ের পরিমাণ এক নয়। মহাকাশযানে থাকা ভাইটির নিজের ঘড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। তার কাছে সময় থেমে যায়নি কিংবা ঘড়ির কাঁটা অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে যায়নি। কিন্তু পৃথিবীতে থাকা ভাইয়ের ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যেতে পারে, মহাকাশযাত্রীর জন্য তুলনামূলক কম সময় অতিবাহিত হয়েছে।
এই ঘটনাটি ‘টুইন প্যারাডক্স’ বা যমজ-সংক্রান্ত আপেক্ষিকতার সমস্যা হিসেবে পরিচিত। বাস্তবে এর ব্যাখ্যায় মহাকাশযাত্রীর যাত্রাপথ, গতি পরিবর্তন এবং ফিরে আসার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে, ভিন্ন ভিন্ন গতিপথে চলা দুই ব্যক্তির মধ্যে পুনরায় মিলিত হওয়ার পর বয়সের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
গতির কারণে কীভাবে সময়ের পার্থক্য তৈরি হয়?
বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষকের তুলনায় একটি বস্তু যত বেশি বেগে চলবে, তার নিজস্ব ঘড়িতে অতিবাহিত সময়ের সঙ্গে স্থির পর্যবেক্ষকের ঘড়ির হিসাবের পার্থক্য তত বেশি হতে পারে। আলোর গতির কাছাকাছি বেগে এই প্রভাব উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশযাত্রীর কাছে তার নিজের ঘড়ি, হৃদস্পন্দন কিংবা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধীর বলে মনে হবে না। তার কাছে এক সেকেন্ড ঠিক এক সেকেন্ডের মতোই অনুভূত হবে। পার্থক্যটি বোঝা যায় যখন ভিন্ন গতিপথে চলা পর্যবেক্ষকদের ঘড়ির হিসাব তুলনা করা হয়।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গাড়ি, ট্রেন কিংবা বিমানের গতি আলোর গতির তুলনায় অত্যন্ত কম। তাই এসব ক্ষেত্রে সময় প্রসারণের প্রভাব এত ক্ষুদ্র যে সাধারণ ঘড়ি দিয়ে তা সহজে বোঝা যায় না। কিন্তু অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি এবং দ্রুতগতির কণার পরীক্ষায় এই প্রভাব শনাক্ত করা সম্ভব।
মহাকর্ষও বদলে দিতে পারে সময়ের হিসাব
সময়ের পার্থক্য শুধু গতির কারণেই ঘটে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার সঙ্গেও সময়ের প্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে, শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকা ঘড়ি তুলনামূলক দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ঘড়ির চেয়ে ধীরে চলে।
পৃথিবীর উদাহরণেই বিষয়টি বোঝা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি রাখা একটি ঘড়ি পাহাড়ের চূড়ায় রাখা একই ধরনের ঘড়ির তুলনায় সামান্য ধীরে চলবে। পাহাড়ের চূড়ায় পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব কিছুটা কম হওয়ায় সেখানে সময়ের প্রবাহ তুলনামূলক দ্রুত হয়।
এই পার্থক্য মানুষের অনুভূতিতে ধরা পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ির সাহায্যে তা পরিমাপ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইএসটি) গবেষকেরা ২০১০ সালে দেখিয়েছিলেন, মাত্র ৩৩ সেন্টিমিটার উচ্চতার ব্যবধানেও দুটি অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ির সময়ের হিসাবের পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব।
অর্থাৎ, সময় প্রসারণের ঘটনা শুধু দূর মহাকাশ কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের মতো চরম পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীতেও গতি ও মহাকর্ষের কারণে ঘড়ির সময়ের মধ্যে সামান্য পার্থক্য তৈরি হয়।
মোবাইলের জিপিএসেও কাজে লাগে আপেক্ষিকতাবাদ
সময় প্রসারণের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহারগুলোর একটি হলো গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস। মোবাইল ফোনে রাস্তা খুঁজে পাওয়া, গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করা কিংবা কোনো জায়গায় পৌঁছানোর পথ নির্ধারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
জিপিএস উপগ্রহগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় সংকেত পাঠায়। পৃথিবীতে থাকা রিসিভার একাধিক উপগ্রহের সংকেত পৌঁছানোর সময় বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান নির্ণয় করে। এ ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকেত আলোর গতিতে চললেও সামান্য সময়ের ভুল অবস্থান নির্ণয়ে বড় ধরনের ত্রুটি তৈরি করতে পারে।
কিন্তু উপগ্রহের ঘড়ির ওপর একই সঙ্গে দুটি আপেক্ষিকতাজনিত প্রভাব কাজ করে। উপগ্রহের গতি পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় তার ঘড়িকে প্রতিদিন প্রায় ৭ মাইক্রোসেকেন্ড পিছিয়ে দেয়। অন্যদিকে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে অবস্থানের কারণে উপগ্রহের ঘড়ি প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে যায়।
দুটি প্রভাব একত্রে বিবেচনা করলে উপগ্রহের ঘড়ি পৃথিবীর পৃষ্ঠের ঘড়ির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ড এগিয়ে চলে। সময়ের এই পার্থক্য সংশোধন না করলে জিপিএসের অবস্থান নির্ণয়ে দ্রুত বড় ভুল জমতে থাকত। তাই জিপিএস ব্যবস্থার নকশা ও পরিচালনায় আপেক্ষিকতাবাদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সময় কি তাহলে সবার জন্য এক নয়?
সময় প্রসারণের ধারণা আমাদের প্রচলিত সময়বোধকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। আমরা সাধারণত সময়কে একটি অভিন্ন প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করি, যেন মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থানে একই গতিতে ঘড়ির কাঁটা চলছে। কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদ দেখায়, সময়ের হিসাব পর্যবেক্ষকের গতি এবং মহাকর্ষীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে সময় সম্পূর্ণ অনিশ্চিত বা ইচ্ছেমতো বদলে যায়। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘড়ির সময় কীভাবে ভিন্ন হবে, তা গাণিতিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়।
আইনস্টাইনের তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মহাবিশ্বে সময় ও স্থানকে আলাদা করে বিবেচনা করা যায় না। গতি, মহাকর্ষ এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের সঙ্গে সময়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে ধারণাকে একসময় কেবল তাত্ত্বিক মনে হতো, সেটিই আজ আধুনিক প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কালের আলো/এসএ


আপনার মতামত লিখুন
Array