রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ফের হামলার ঘোষণা জেলেনস্কির
রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় আবারও হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি জানিয়েছেন, এসব স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে কিয়েভ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে আলোচনার সুযোগ থাকলেও এর বিনিময়ে আরও মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা পাওয়াকে ন্যূনতম শর্ত হিসেবে দেখছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি এসব কথা বলেন। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্ক এবং ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের বিষয়টিও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।
‘তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখছি না’
সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘তেল শোধনাগারে হামলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা আর হামলা বন্ধ রাখছি না।’
ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এসব স্থাপনায় আঘাত হানার মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন, সরবরাহ এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে কিয়েভ।
তবে জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হামলা বন্ধ রাখার সাময়িক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
ট্রাম্পের রাশিয়া নীতি নিয়ে অসন্তোষ
ফিন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার সমালোচনাও করেন তিনি।
এর এক দিন আগে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। সেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলেনস্কির দৃষ্টিতে, একদিকে ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের জ্বালানি ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের উদ্যোগ কিয়েভের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির পর দুই দিন হামলা বন্ধ রেখেছিল ইউক্রেন
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি জানান, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর ইউক্রেন দুই দিনের জন্য রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রেখেছিল।
তবে ওই বিরতির সময়ও ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাচ্ছিল না বলে ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
একই সময়ে ইউক্রেনজুড়ে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিংকের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এতে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ইউক্রেনীয় সেনাদের কার্যক্রম এবং রাশিয়ার সামরিক স্থাপনায় মাঝারি পাল্লার হামলা পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হয়।
ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব সুবিধা সীমিত হলে সেনাদের মধ্যে সমন্বয়, প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি এবং দূরপাল্লার সামরিক অভিযান পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য বন্ধের হুঁশিয়ারির অভিযোগ
জেলেনস্কির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ না করলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পরে কিয়েভকে জানানো হয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্যসংক্রান্ত সমস্যাটি একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেছে। তবে স্টারলিংক ব্যবস্থায় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন না।
ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি কোনো কারিগরি সমস্যা ছিল না, এটি ছিল ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত।’
তবে তাঁর এই অভিযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও স্টারলিংকের গতি কমানোর ঘটনাগুলোর পেছনে কী কারণ ছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।
হামলা বন্ধের বিনিময়ে আরও প্যাট্রিয়ট চান জেলেনস্কি
হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখতে ইউক্রেন রাজি কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা পেলে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
তিনি বলেন, আরও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়া হবে তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন শর্ত।
প্যাট্রিয়ট একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষায় ইউক্রেনের জন্য এ ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ।
জেলেনস্কির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখার বিষয়টি কেবল যুদ্ধবিরতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাও জড়িত।
ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে নতুন চাপ
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখা, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং স্টারলিংক ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কিয়েভের সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্যোগ এবং পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান ইউক্রেনের নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জেলেনস্কির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ অবস্থায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা পুনরায় শুরু করার ঘোষণা এবং হামলা বন্ধের বিনিময়ে আরও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে জেলেনস্কির ঘোষণার পর রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় নতুন হামলা কখন বা কী মাত্রায় চালানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁর প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও এখনো স্পষ্ট নয়।

আপনার মতামত লিখুন
Array