খুঁজুন
                               
, ,
           

২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের ঘোষণা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২১ অপরাহ্ণ
২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের ঘোষণা সরকারের

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কার্যকর গতিসীমা, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রাম ও রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।

মন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। তবে শুধু নির্দিষ্ট কোনো দিবসকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালন করলে চলবে না; সারা বছরই সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত আইন প্রণয়নের লক্ষ্য

সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সমন্বিত আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন শেখ রবিউল আলম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে এ আইন প্রণয়নে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপের পরিবর্তে আইন, অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা, চালকের আচরণ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।

২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুর হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু চালকদের সচেতনতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সড়কের নকশা ও অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতিসীমা মেনে চলা, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

হেলমেটের মান, গতিসীমা ও চিকিৎসাব্যবস্থায় গুরুত্ব

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান শেখ রবিউল আলম। এর মধ্যে রয়েছে হেলমেটের মান হালনাগাদ, গতিসীমা কার্যকর করা এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থার উন্নয়ন।

মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের জন্য মানসম্মত হেলমেটের ব্যবহার দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কার্যকর গতিসীমা ও তার যথাযথ প্রয়োগ দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনার তীব্রতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোও সরকারের পরিকল্পনার অংশ। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

মহাসড়কে আন্ডারপাস ও বামদিকের লেন নির্মাণের উদ্যোগ

সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা বাড়াতে আন্ডারপাস নির্মাণ এবং মহাসড়কে বামদিকের লেন তৈরির প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যস্ত সড়কে পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী আন্ডারপাসসহ নিরাপদ পারাপারের অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

পাশাপাশি মহাসড়কে বামদিকের লেন তৈরির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে এসব প্রকল্পের নির্দিষ্ট স্থান, বাস্তবায়নকাল ও ব্যয়ের বিস্তারিত বৈঠকে উল্লেখ করা হয়নি।

সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের পরিকল্পনা

সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা, দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা এবং দুর্ঘটনার ধরন সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাওয়া গেলে সড়ক নিরাপত্তার পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর করা সহজ হবে।

‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বাস্তবায়নে জোর

এবারের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ সড়কব্যবস্থা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই পদ্ধতিতে দুর্ঘটনা পুরোপুরি এড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলেও যেন প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কম থাকে, সে জন্য সড়কব্যবস্থার বিভিন্ন অংশকে সমন্বিতভাবে নিরাপদ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।

বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা

গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।

এ ছাড়া বৈঠকে অংশ নেন রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ, তবু কারও কাছে হাত পাতেন না

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ, তবু কারও কাছে হাত পাতেন না

জীবনের প্রতিকূলতা যেন পিছু ছাড়ছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের আরিফের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বাবাকে হারানোর শোক, ক্যানসারে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে তাঁর জীবন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা, নিজের সংসারের খরচ এবং সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় দিন কাটে তাঁর।

তবু মানুষের কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকার পথ বেছে নেননি আরিফ। বরং কসবা বাজারের একটি ছোট্ট দোকানে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি এবং মানুষের ওজন মেপে সামান্য আয় করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত পুঁজি নেই, ব্যবসা বড় করার সামর্থ্যও সীমিত। তারপরও নিজের শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এই যুবক। তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—সামান্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ। এতটুকু সহযোগিতা পেলে ব্যবসাটি সম্প্রসারণ করে পরিবারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারবেন বলে আশা আরিফের।

ক্যানসারে বাবা-ভাইকে হারিয়ে থমকে যায় পড়াশোনা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নও ছিল। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকট ও একের পর এক শোক সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ছোট ভাই। এই মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর ২০২৪ সালে একই রোগে বাবাকেও হারান তিনি। পরিবারের দুই প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি বেড়ে যায় আর্থিক চাপ। সংসারের দায়িত্ব ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি আরিফ। একসময় যে শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, সেই জায়গায় তাঁকে নামতে হয় জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।

ওজন মাপার যন্ত্র থেকে ছোট্ট দোকান

২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। সেই সামান্য আয় দিয়েই জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চলতে থাকে। পরে পরিবারের খরচ মেটানোর প্রয়োজন বাড়লে কসবা বাজারে ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দোকানে মোবাইল ফোনের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। পাশাপাশি বাজারে আসা মানুষের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন। প্রতিদিনের এই সীমিত উপার্জন দিয়েই চলে তাঁর সংসার। আরিফের দোকানে পণ্যের চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী মালামাল কিনতে না পারায় ব্যবসার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। হাতে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকলে আরও বেশি পণ্য সংগ্রহ করতে পারতেন, বাড়াতে পারতেন বিক্রিও। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছেন না।

একদিকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অন্যদিকে ব্যবসায় নতুন পণ্য তোলার খরচ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী—দুশ্চিন্তা বাড়ছে

আরিফের জীবনের লড়াই শুধু নিজের জীবিকা নির্বাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মা অসুস্থ। অন্যদিকে স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। ফলে সামনে নতুন অতিথির আগমনকে ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হিসেবে পরিবারের সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। প্রতিদিনের ব্যবসা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। এর মধ্যে মায়ের চিকিৎসা, স্ত্রীর যত্ন এবং অনাগত সন্তানের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। আরিফের কাছে ছোট্ট দোকানটি তাই শুধু উপার্জনের জায়গা নয়; এটি পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অবলম্বন, নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখার আশ্রয়ও।

‘ভিক্ষা ছাড়া কী করতে পারবা’—কটাক্ষেও দমেননি

অভাবের কারণে অনেকেই তাঁকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবেন তিনি। কিন্তু এসব কথায় ভেঙে পড়েননি আরিফ। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছেন। আরিফ বলেন, “আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।” তাঁর এই মনোভাবই স্থানীয় অনেকের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও নিজের শ্রমে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে তাঁরা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

ক্রেতাদের চোখে পরিশ্রমী আরিফ

কসবা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন আরিফ। তাঁর কাছ থেকে পণ্য কেনা ক্রেতাদের কেউ কেউ জানান, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা চান, আরিফ যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে ব্যবসাটি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন। ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, “আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।” আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, “তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, উপযুক্ত সহায়তা পেলে আরিফের পক্ষে নিজের ব্যবসা আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী বলেন, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার যদি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তিনি কাজটি করতে পারবেন এবং পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা করেন ওই ব্যবসায়ী। পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, “আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।”

সামান্য পুঁজিই আরিফের বড় স্বপ্নের ভিত্তি

নিজের ব্যবসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে আরিফ বলেন, “আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।” তিনি আরও বলেন, পণ্যের চাহিদা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি ঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে অনেকে সহযোগিতা করলেও এখনো সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি। আরিফের আবেদন, সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা যেন তাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য আর্থিক সহায়তা দেন। সেই সহায়তা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ব্যবসার পরিসর বাড়াতে চান তিনি। এতে আয় বাড়লে পরিবারের খরচ মেটানো এবং অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করাও কিছুটা সহজ হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

সহায়তা পেলে বদলাতে পারে পরিবারের পরিস্থিতি

আরিফের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে অবদান রাখতে পারেন। কসবা বাজারের স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ানো হবে। সরকারি সহায়তা কিংবা সামান্য পুঁজি পেলে তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার পথ খুলবে। কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট দোকানটিতে প্রতিদিন নিজের জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। বাবা ও ভাইকে হারানোর বেদনা, বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা, অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আর অভাবের চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

বারবার পাপ করলেও তওবার সুযোগ, কবুল হওয়ার ৫ শর্ত জানুন

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৪ অপরাহ্ণ
বারবার পাপ করলেও তওবার সুযোগ, কবুল হওয়ার ৫ শর্ত জানুন

মানুষ ভুল করে, পাপে জড়িয়ে পড়ে। কখনো অনুশোচনায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করে, আবার কখনো শয়তানের প্ররোচনা কিংবা নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায় একই পাপে ফিরে যায়। এভাবে বারবার ভুল করার কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—একই পাপের জন্য বারবার তওবা করলে কি আল্লাহ ক্ষমা করবেন? তওবা করার পর জীবনে বিপদ এলে কি তা আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ? ইসলামের শিক্ষা হলো, পাপের পর অনুশোচনা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার চেষ্টা কখনো ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে তওবা হতে হবে আন্তরিক এবং তা কবুল হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।

তওবা ভেঙে গেলে কি আবার তওবা করা যাবে?

‘তওবা’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। ইসলামের পরিভাষায় তওবা হলো পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতা ছেড়ে তাঁর নির্দেশিত পথে ফিরে আসা এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।

অনেক সময় মানুষ তওবা করার পরও দুর্বলতার কারণে আবার পাপে জড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ কেউ লজ্জা, হতাশা কিংবা অপরাধবোধে আর তওবা করতে চান না। অথচ পাপের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। বরং ভুল বুঝতে পারলে নতুন করে অনুশোচনা করা, পাপ থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।

তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোনো বান্দা পাপ করে তওবা করার পর আবার পাপ করলে এবং পুনরায় তওবা করলে তার কি লজ্জিত হওয়া উচিত? উত্তরে তিনি বলেন, শয়তান তো এটাই চায় যে মানুষ তওবা করা ছেড়ে দিক। তাই কখনো তওবা করা বন্ধ করা উচিত নয়।

ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনু রজব আল-হাম্বলি (রহ.)-এর জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম গ্রন্থে এ বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মূল শিক্ষা হলো, অতীতের ভুল যেন মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ করতে থাকা এবং পরে ক্ষমা চাওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা যাবে। আন্তরিক তওবার জন্য পাপ ছাড়ার চেষ্টা এবং ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প থাকা জরুরি।

পাপকে ছোট করে দেখা কেন বিপজ্জনক?

একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নিজের পাপকে হালকাভাবে নেন না। ছোট মনে হওয়া ভুলও যে আল্লাহর অবাধ্যতা হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকেন। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি নিজের পাপকে তুচ্ছ মনে করে এবং তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে না, তার আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সহিহ বুখারির ৬৩০৮ নম্বর হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিনের পাপ সম্পর্কে ভীতির অনুভূতিকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় করছে, পাহাড়টি যেকোনো মুহূর্তে তার ওপর ভেঙে পড়তে পারে। বিপরীতে, পাপকে তুচ্ছ মনে করা ব্যক্তির কাছে তা নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মাছির মতো।

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, পাপের ব্যাপারে আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। একই সঙ্গে নিজের ভুলের কারণে হতাশ হয়ে আল্লাহর ক্ষমা চাওয়াও বন্ধ করা যাবে না। ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজেকে সংশোধন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

তওবা করার পর বিপদ এলে কী করবেন?

কখনো আন্তরিকভাবে তওবা করার পরও মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, আর্থিক সংকট কিংবা নানা ধরনের পরীক্ষা আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো তাঁদের তওবা কবুল হয়নি। কিন্তু শুধু বিপদ-আপদ দেখা দেওয়ার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

জীবনের প্রতিকূলতা নানা কারণে আসতে পারে। একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংকটের সময়ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সৎ পথে অবিচল থাকার চেষ্টা করা।

তওবা কোনো দুনিয়াবি সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই তওবার পর কষ্ট এলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং নিজের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকা উচিত।

শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই কি তওবা হয়?

তওবা শুধু মুখে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা কিংবা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এর সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা ও কাজের পরিবর্তন থাকা প্রয়োজন।

পবিত্র কোরআনের সুরা তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তওবার মধ্যে আন্তরিকতা থাকতে হবে। যে পাপ থেকে ফিরে আসার জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তা ছেড়ে দেওয়ার বাস্তব প্রচেষ্টাও থাকতে হবে।

কেউ যদি মুখে ক্ষমা চাইলেও মনে মনে একই পাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখেন, তাহলে তাঁর তওবার আন্তরিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে আন্তরিকভাবে পাপ ছাড়ার সংকল্প করার পর মানবিক দুর্বলতায় কেউ আবার ভুল করে ফেললে, তাঁর উচিত নতুন করে তওবা করা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

তওবা কবুল হওয়ার ৫টি শর্ত

ইসলামি শিক্ষায় তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্তের কথা বলা হয়েছে। এগুলো পূরণের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের ভুল সংশোধন করে আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করতে পারেন।

১. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তওবা করা

তওবা হতে হবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। মানুষের প্রশংসা পাওয়া, সামাজিক লোকলজ্জা এড়ানো কিংবা দুনিয়াবি সুবিধা লাভের জন্য নয়; বরং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই তওবা করতে হবে।

পবিত্র কোরআনের সুরা বাইয়িনার ৫ নম্বর আয়াতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তওবার ক্ষেত্রেও এই আন্তরিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া

তওবার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করা। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে অন্তরে যে অনুতাপ তৈরি হয়, তা মানুষকে ভুল থেকে ফিরে আসতে সাহায্য করে।

অনুশোচনা শুধু সাময়িক আবেগ নয়; এর মাধ্যমে নিজের আচরণ পরিবর্তনের ইচ্ছাও তৈরি হওয়া উচিত। অতীতের ভুল উপলব্ধি করে ভবিষ্যতে একই পথে না ফেরার চেষ্টা তওবার গুরুত্বকে বাস্তব রূপ দেয়।

৩. পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়া

যে পাপের জন্য তওবা করা হচ্ছে, তা ছেড়ে দেওয়া জরুরি। কেউ যদি অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করেন, প্রতারণা করেন কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁকে অন্যায় কাজ বন্ধ করতে হবে এবং সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হলে তা ফেরত দিতে হবে। কারও প্রতি অপবাদ, অন্যায় বা ক্ষতি করে থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর অধিকার পুনরুদ্ধার ও ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের হক নষ্ট করার বিষয়টি তাই তওবার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

একইভাবে ফরজ ইবাদতে অবহেলা হয়ে থাকলে তা সংশোধনের জন্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা

তওবার সময় অন্তরে দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যে ভবিষ্যতে ওই পাপে আর ফিরে যাওয়া হবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রেখে তওবা করা আন্তরিক তওবার পরিপন্থী।

তবে মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আন্তরিক সংকল্প থাকা সত্ত্বেও পরে দুর্বলতার কারণে কেউ একই পাপে জড়িয়ে পড়লে, তার আগের তওবা যে অবশ্যই বাতিল হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। বরং নতুন পাপের জন্য নতুন করে তওবা করতে হবে এবং পাপ থেকে দূরে থাকার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে পরিবেশ, অভ্যাস কিংবা সঙ্গ মানুষকে বারবার পাপের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

৫. তওবার সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসা

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত এসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তওবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়ে পরিণতি নিশ্চিতভাবে সামনে চলে এলে তখনকার তওবা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে।

সুরা নিসার ১৮ নম্বর আয়াতে এমন ব্যক্তিদের কথা বলা হয়েছে, যারা পাপ করতে থাকে এবং মৃত্যুর উপস্থিতিতে বলে, ‘এখন আমি তওবা করছি।’

কোরআনের সুরা ইউনুসের ৯০-৯১ নম্বর আয়াতে ফেরাউনের মৃত্যুমুখী অবস্থায় ইমান আনার ঘোষণার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া সহিহ হাদিসে কেয়ামতের বড় আলামত হিসেবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের কথা এসেছে। এ আলামত প্রকাশের পর নতুন করে ইমান গ্রহণ বা তওবা করার সুযোগ আর আগের মতো থাকবে না বলে ইসলামি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

এসব শিক্ষা মানুষকে তওবা পিছিয়ে না দিয়ে জীবিত থাকতেই নিজের ভুল সংশোধনের তাগিদ দেয়।

মহানবী (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন

তওবা শুধু পাপী মানুষের জন্য প্রয়োজন—বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার ও তওবা করতেন। সহিহ মুসলিমের ২৭০২ নম্বর হাদিসে তিনি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে তওবা করার কথা বলেছেন। সহিহ বুখারির ৬৩০৭ নম্বর হাদিসে দিনে ৭০ বারেরও বেশি ক্ষমা প্রার্থনার কথাও বর্ণিত হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার একজন মুমিনের নিয়মিত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির অংশ। মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারলে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে এবং জীবনকে সংশোধনের চেষ্টা করলে তার আত্মিক উন্নতির পথ তৈরি হয়।

হতাশা নয়, তওবা হোক জীবনের নিয়মিত অভ্যাস

পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। একই ভুল বারবার হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে আসার চেষ্টা বন্ধ না করে বরং পাপের কারণ খুঁজে বের করা, অনুশোচনা করা এবং নিজেকে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তবে তওবাকে পাপ করার অনুমতি হিসেবে দেখা যাবে না। প্রকৃত তওবার লক্ষ্য হলো অন্যায় ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা। আন্তরিক তওবার পরও কেউ দুর্বলতায় ভুল করলে আবার আল্লাহর কাছে ফিরে আসবেন—কিন্তু প্রতিবারই পাপ থেকে বাঁচার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করতে হবে।

তওবা তাই কোনো এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সারাজীবন নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, সৎকাজে ফিরে আসা এবং ভুল সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন মুমিন তাঁর রহমত ও ক্ষমার আশা করতে পারেন।

কালের আলো/জে এন/এসএ

 

হাসান মাহমুদকে যেভাবে বোকা বানালেন সতীর্থরা

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
হাসান মাহমুদকে যেভাবে বোকা বানালেন সতীর্থরা
মাঠে বল হাতে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানান তিনি। গত টেস্টেও বল হাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। কিন্তু এবার আর ব্যাটসম্যান নয়, সতীর্থদের অভিনব কৌশলের কাছে নিজেই বোকা বনে গেলেন বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদ। জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় দলের সতীর্থরা এমন এক প্র্যাংকের আয়োজন করেছিলেন, যার শুরুতে হাসানের মুখের হাসিই উধাও হয়ে যায়। পরে রহস্য উন্মোচন হতেই বদলে যায় পুরো পরিবেশ।

গম্ভীর মুখে মুশতাকের অভিযোগ, চিন্তায় হাসান

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ হাসান মাহমুদকে ডেকে তাঁর পারফরম্যান্সের প্রশংসা করছেন। এরপরই হঠাৎ কথার মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি।

মুশতাক হাসানকে বলেন, ‘হাসান, তোমার বোলিং দারুণ হচ্ছে। পারফরম্যান্সও ভালো। কিন্তু সোহেল ভাইয়ের (টিম বয় সোহেল হোসেন) সঙ্গে তোমার আচরণ ঠিক হয়নি। কিছু প্রশ্ন করার ধরনও ছিল ভুল।’

কোচের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন হাসান। মাঠে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখলেও এবার নিজের দলের ভেতরেই কী ভুল করেছেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান তিনি।

‘সোহেল ভাই খুব মন খারাপ করে আছেন’

প্র্যাংকের আসল কৌশল ছিল হাসানকে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলা। মুশতাক আহমেদ এবার জানান, সোহেল হোসেন তাঁর আচরণে খুব মন খারাপ করে আছেন। ঠিক কী ঘটেছে, তা জানা না গেলেও বিষয়টি দলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি।

সোহেল ভাইকে ডেকে আনার কথাও বলেন কোচ। তাঁর গম্ভীর কথাবার্তা আর আশপাশে সতীর্থদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে পরিস্থিতিকে সত্যি বলেই মনে হচ্ছিল হাসানের।

এদিকে, হাসানের অজান্তেই চলছিল অন্য পরিকল্পনা। দলের সবাই আগে থেকেই জানতেন, কী হতে যাচ্ছে। শুধু যাঁকে ঘিরে এত আয়োজন, সেই হাসানই ছিলেন পুরো ঘটনা সম্পর্কে অন্ধকারে।

অভিযোগ থেকে মুহূর্তেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা

একপর্যায়ে গম্ভীর পরিবেশের অবসান ঘটে। হঠাৎ চারদিক থেকে সতীর্থরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে শুরু করেন। সবাই একসঙ্গে বলে ওঠেন, ‘হ্যাপি বার্থ ডে!’

তখনও পুরো ঘটনা বুঝে উঠতে পারছিলেন না হাসান। পরে নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, আমি আবার কী করলাম!’

হাসানের এই কথাতেই ধরা পড়ে প্র্যাংকটি কতটা সফল হয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেও তিনি ভাবছিলেন, সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে এমন কী করেছেন যে কোচ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন। অথচ পুরো ঘটনাই ছিল তাঁকে জন্মদিনের চমক দেওয়ার পরিকল্পনা।

মুশতাকের অভিনয়ে মুগ্ধ মুশফিকও

হাসানের জন্মদিন ছিল ১২ অক্টোবর। সেই উপলক্ষে আয়োজন করা প্র্যাংকের ভিডিও বিসিবি প্রকাশ করে ১৫ অক্টোবর রাতে।

পুরো আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন মুশতাক আহমেদ। তাঁর গম্ভীর মুখে অভিযোগ তোলার অভিনয় হাসানকে বেশ ভালোভাবেই বিভ্রান্ত করে। অন্যদিকে, সতীর্থরাও নিজেদের হাসি চেপে রেখে পরিস্থিতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন।

জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমও মুশতাকের অভিনয়ের প্রশংসা করেন। সব মিলিয়ে জন্মদিনের এই আয়োজন হাসান মাহমুদের জন্য হয়ে ওঠে আনন্দময় এক স্মৃতি।

মাঠের বাইরে সতীর্থদের সঙ্গে হাসান

ক্রিকেট মাঠে নিজের গতি ও বোলিংয়ের বৈচিত্র্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন হাসান মাহমুদ। কিন্তু মাঠের বাইরে সতীর্থদের সঙ্গে এমন মজার মুহূর্ত জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অন্য এক দিকও সামনে নিয়ে এসেছে।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে হাসানকে কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলেও শেষ পর্যন্ত পুরো আয়োজন শেষ হয়েছে হাসি-আনন্দে। আর ‘আমি আবার কী করলাম!’—হাসানের এই প্রতিক্রিয়াই হয়ে উঠেছে প্র্যাংকের সবচেয়ে মজার অংশ।

কালের আলো/এএন/এসএ