খুঁজুন
                               
, ,
           

বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, এবার বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ মনির

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১৫ অপরাহ্ণ
বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, এবার বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ মনির

৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পেয়েও নিয়োগের গেজেটে নাম আসেনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান মনিরের। মৎস্য ক্যাডারে মেধাতালিকায় ২৮তম অবস্থানে থেকেও বাদ পড়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজের ফেসবুক পোস্টে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনির দাবি করেছেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পরও তাঁকে বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আগামী শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে তাঁদের বিষয়ে যৌক্তিক সমাধান না এলে রাজধানীর শাহবাগে ‘আত্মাহুতি’র কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।

মেধাতালিকায় ২৮তম হয়েও গেজেটে নাম নেই

মনিরুজ্জামান মনির বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে তিনি মৎস্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। মেধাতালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল ২৮তম।

তবে বুধবার রাতে প্রকাশিত নিয়োগের গেজেটে নিজের নাম খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। সুপারিশ পাওয়ার পরও কেন তাঁকে নিয়োগের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সে বিষয়ে কোনো উত্তর জানেন না বলে জানিয়েছেন মনির। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও হতাশার কথা তুলে ধরেন তিনি। পোস্টে মনির লেখেন, ‘এই রাষ্ট্র আমার না। চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ধৈর্যের ফল আজ শূন্য।’ বৃদ্ধ বাবার সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন, সেই দুশ্চিন্তার কথাও জানান তিনি। মেধাতালিকায় ২৮তম হওয়ার পরও বাদ পড়ার কারণ জানতে চেয়ে মনির প্রশ্ন তোলেন। পোস্টে তাঁর হতাশা ও মানসিক বিপর্যয়ের প্রকাশ পাওয়া যায়।

‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছি, সেই বৈষম্যেরই শিকার’

ফেসবুকে দেওয়া আরেক পোস্টে মনির অভিযোগ করেন, বৈষম্যহীন আন্দোলনের ভিত্তিতে দাঁড়ানো রাষ্ট্রেই তাঁদের মতো প্রার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ভেরিফিকেশনের কথা বলে গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৬ জন প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছেন। মনির লেখেন, অবিলম্বে গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলন করেছিলেন, সেই বৈষম্যের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।

মনিরুজ্জামান জানান, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এরপরও কেন তাঁকে নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হলো, তা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়।

বাদ পড়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন

সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও গেজেটে নাম না আসার কারণ জানতে চান মনির। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী প্রার্থীরা বলছেন, সুপারিশপ্রাপ্ত কিছু প্রার্থী পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। কারও কারও কাগজপত্রেও সমস্যা ছিল বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিক থাকার পরও ৫৪ জন প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের অভিযোগ ও বাদ পড়ার প্রকৃত কারণের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট হলে তাঁদের উদ্বেগের নিরসন হতে পারে।

৪৫তম বিসিএসে ১০৫ জনের নাম গেজেটে নেই

এর আগে বুধবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করে। এতে পিএসসির সুপারিশ করা ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০৫ জনের নাম নিয়োগের গেজেটে আসেনি। এই তালিকায় কারও ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়া বা কাগজপত্রসংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। তবে সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে বাদ পড়ার নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সুপারিশ পাওয়ার পরও গেজেটে নাম না আসায় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করে যাঁদের কাগজপত্র ও যোগ্যতা ঠিক রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শনিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিলেন প্রার্থীরা

গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীরা আগামী শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যৌক্তিক সমাধান না এলে ওই দিন রাজধানীর শাহবাগে ‘আত্মাহুতি’র কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। এ কর্মসূচির ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অভিযোগের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং তাঁদের বাদ পড়ার কারণ স্পষ্ট করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

আহতদের সেবা দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, সেই রীপার পাশে তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ণ
আহতদের সেবা দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, সেই রীপার পাশে তারেক রহমান

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের স্বেচ্ছায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন নার্স রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজ। শরীরে ৪৭টি সীসার ছররা ও দুটি রাবার বুলেটের আঘাত নিয়ে সেই থেকে শারীরিক নানা জটিলতার সঙ্গে লড়ছেন তিনি। তাঁর ডান চোখের কোটরে গুরুতর আঘাত লাগে, আর একটি বুলেট আটকে যায় মস্তিষ্কের ১৪ সেন্টিমিটার গভীরে। এবার এই জুলাইযোদ্ধার খোঁজখবর নিতে নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীপা গোমেজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও জীবনসংগ্রাম নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র নজরে আসার পর তারেক রহমান তাঁর খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় রীপার বাসায় যায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর একটি প্রতিনিধিদল।

রীপার বাসায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রতিনিধিদল

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন। এ সময় তাঁরা রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজের শারীরিক অবস্থার সার্বিক খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জানা গেছে, রীপা গোমেজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র সম্প্রতি তারেক রহমানের নজরে আসে। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে এই জুলাইযোদ্ধার খোঁজখবর নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সদস্য মাসুদ রানা লিটন, ফরহাদ আলী সজীব, রুবেল আমিন এবং ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল মিসবাহসহ অন্যরা।

আহতদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ

রীপা ফ্রান্সিসকো গোমেজ পেশায় একজন নার্স। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর রামপুরা ব্রিজের কাছে আহত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন তিনি। অন্যদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সেই সময়েই গুলিবিদ্ধ হন রীপা। ওই দিন ৪৭টি সীসার ছররা গুলি ও দুটি রাবার বুলেটের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। তাঁর ডান চোখের কোটরে লাগে সবচেয়ে গুরুতর আঘাত। একটি বুলেট মস্তিষ্কের ১৪ সেন্টিমিটার গভীরে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আহতদের সেবা দিতে এগিয়ে যাওয়া এই স্বাস্থ্যকর্মীর নিজের জীবনই কঠিন শারীরিক সংকটের মুখে পড়ে।

দৃষ্টিশক্তির জটিলতা, প্রতিনিয়ত চিকিৎসার চাপ

সেই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে দৃষ্টিশক্তির জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন রীপা। গুলির আঘাতের পরবর্তী প্রভাব তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলেছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগও কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয়। একদিকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, অন্যদিকে সীমিত কর্মক্ষমতা ও আয়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাঁর।

চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখনো রোগীদের সেবা

শারীরিক অসুস্থতা ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও থেমে নেই রীপার জীবনসংগ্রাম। নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখনো অন্য রোগীদের সেবা করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি। যিনি একসময় সংকটের মুহূর্তে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁকেই এখন নিজের চিকিৎসা ও জীবন চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রীপা গোমেজের ঘটনা গণ-অভ্যুত্থানের সময় আহতদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাই আহত হয়ে পড়া মানুষের ত্যাগ ও পরবর্তী জীবনের বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। গুরুতর আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, চিকিৎসার ব্যয় এবং কর্মজীবনে সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁকে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

একসময় একটি কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাসের পেছনে থাকত দীর্ঘ ভাবনা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কল্পনা আর শব্দের সঙ্গে লেখকের নিরন্তর লড়াই। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় কয়েক মুহূর্তেই তৈরি করা যাচ্ছে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এমনকি উপন্যাসের খসড়াও। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি লেখালেখিকে সহজ করেছে, খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে লেখকের নিজস্বতা, সৃজনশীলতা ও মৌলিক সাহিত্যচর্চা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে?

প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে লেখালেখির ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কেউ এআই ব্যবহার করছেন ভাবনা গুছিয়ে নিতে, কেউ ভাষা সম্পাদনা করতে, আবার কেউ গল্পের প্লট কিংবা কবিতার খসড়া তৈরিতেও নিচ্ছেন প্রযুক্তির সহায়তা। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, সহজ হচ্ছে তথ্য সাজানো ও লেখার প্রাথমিক কাঠামো তৈরি। বিশেষ করে নতুন লেখকদের কাছে এআই হয়ে উঠতে পারে লেখালেখির একটি সহায়ক মাধ্যম।

কিন্তু লেখার ভাষা সুন্দর হলেই কি তা হয়ে ওঠে নিজস্ব সৃষ্টি? নাকি একটি লেখার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে লেখকের জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও স্বতন্ত্র চিন্তার মধ্যে? এআইনির্ভর লেখালেখির বিস্তারের সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

লেখকের স্বতন্ত্র কণ্ঠ কি হারিয়ে যাবে?
একজন লেখকের পরিচয় শুধু তাঁর ব্যবহৃত শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর চিন্তার ধরন, অভিজ্ঞতার গভীরতা, সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনুভূতি প্রকাশের নিজস্ব পদ্ধতিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একই বিষয় নিয়ে লেখা হলেও দুই লেখকের ভাষা ও উপলব্ধিতে পার্থক্য থাকে।

এআই সাধারণত নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ থেকে শেখা ধরন এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা তৈরি করে। ফলে এর তৈরি লেখায় ভাষাগত সাবলীলতা থাকলেও সব ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জটিল অনুভূতি কিংবা স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টির গভীরতা প্রতিফলিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

তবে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া মানেই লেখকের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলা নয়। লেখক যদি নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেন, তাহলে প্রযুক্তি তাঁর কাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। বিপরীতে, এআইয়ের তৈরি লেখা যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজের নামে প্রকাশ করলে মৌলিকতা ও লেখকসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

মৌলিকতা ও কপিরাইট নিয়ে নতুন উদ্বেগ
এআই দিয়ে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে মৌলিকতার পাশাপাশি কপিরাইট ও লেখকত্বের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি লেখা কতটা মানুষের নিজস্ব অবদান, কতটা প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি—তা নির্ধারণ সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে সাহিত্য প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন তৈরি করছে।

এআইয়ের তৈরি কোনো লেখা অন্যের প্রকাশিত রচনার সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিলে গেলে কিংবা তাতে ভুল তথ্য যুক্ত হলে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি লেখা প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, ভাষা পরিমার্জন এবং মৌলিকতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্য সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। এআই ব্যবহারের নীতিমালা, লেখকের অবদানের স্বীকৃতি এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহারের তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে বিভ্রান্তি কমতে পারে।

তরুণ লেখকদের জন্য সুযোগ, নাকি নির্ভরতার ফাঁদ?
নতুন লেখকদের জন্য এআই একদিকে যেমন সহায়ক, অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন, সম্পাদনা কিংবা লেখার কাঠামো সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়া শেখার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু প্রতিটি ভাবনা ও বাক্য তৈরির দায়িত্ব প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিলে লেখকের নিজস্ব ভাষা ও চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

লেখালেখির দক্ষতা তৈরি হয় নিয়মিত চর্চা, পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। এআই তাৎক্ষণিকভাবে একটি খসড়া তৈরি করে দিতে পারলেও একজন লেখকের দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাস, জীবনবোধ ও সৃজনশীল বিকাশের বিকল্প হতে পারে না।

প্রযুক্তি কি সৃজনশীলতার প্রতিদ্বন্দ্বী?
এআইকে কেবল লেখকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। গবেষণা, তথ্য সাজানো, প্রাথমিক সম্পাদনা, অনুবাদে সহায়তা কিংবা নতুন ধারণা নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে লেখক সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

তবে সাহিত্য কেবল তথ্য ও শব্দের বিন্যাস নয়। মানুষের অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা, দ্বন্দ্ব, স্মৃতি, কল্পনা এবং সময়কে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যকে অর্থবহ করে তোলে। ফলে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি লেখকের নিজস্ব বিচারবোধ ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখকের নিজস্বতা রক্ষায় কী প্রয়োজন?
এআইয়ের যুগে লেখকের নিজস্বতা ধরে রাখতে নিয়মিত বই পড়া, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তির তৈরি খসড়াকে চূড়ান্ত লেখা হিসেবে গ্রহণ না করে নিজের চিন্তা ও ভাষায় পুনর্গঠন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে প্রকাশক, সম্পাদক, সাহিত্য সংগঠন ও পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এআই ব্যবহারের বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা। এতে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি লেখকের মৌলিক অবদান, স্বচ্ছতা ও সৃজনশীল স্বাধীনতাও গুরুত্ব পাবে।

সব মিলিয়ে, এআইয়ের অগ্রযাত্রা লেখালেখির জগতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রযুক্তি লেখার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে, কিন্তু একজন লেখকের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে। তাই এআইয়ের যুগে লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলা নয়; বরং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও নিজের কণ্ঠ, চিন্তা ও সৃজনশীল স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা।

কালের আলো/জেএন/এসএ

১০ টাকার আঁটিতে জীবিকার লড়াই আব্দুল আলিমের

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০২ অপরাহ্ণ
১০ টাকার আঁটিতে জীবিকার লড়াই আব্দুল আলিমের

বর্ষা এলেই চলনবিলের জলজ উদ্ভিদ হয়ে ওঠে আব্দুল আলিমের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বছরের বাকি সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও বর্ষার চার মাস বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি করেন তিনি। এসব বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন ৪২ বছর বয়সী এই মানুষ। নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলিম। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালে চলনবিল থেকে শাপলা ও ঢ্যাপ সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজিবাজারে। সেখানে অন্যান্য সবজি ও মাছের পাশাপাশি তাঁর সংগ্রহ করা জলজ উদ্ভিদও কিনে নেন ক্রেতারা।

বর্ষায় বিলের জলজ উদ্ভিদই ভরসা

আব্দুল আলিমের জীবিকা মূলত কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। বছরের অধিকাংশ সময় অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করেন তিনি। তবে বর্ষা মৌসুমে চলনবিল পানিতে ভরে উঠলে তাঁর কাজের ধরন বদলে যায়। এ সময় বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করাই হয়ে ওঠে আয়ের অন্যতম পথ। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে সিংড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার সবজিবাজারে শাপলা ও ঢ্যাপ নিয়ে বসেছিলেন আব্দুল আলিম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ক্রেতাদের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। বাজারে মাছ ও নানা ধরনের সবজি কিনতে আসা মানুষের কেউ কেউ তাঁর কাছ থেকে কিনছিলেন চলনবিলের এসব জলজ উদ্ভিদ।

১০ টাকার আঁটি, আয়ও সীমিত

বাজারে আব্দুল আলিম ৭ থেকে ১০টি ঢ্যাপের একটি আঁটি বিক্রি করছেন ১০ টাকায়। অন্যদিকে, ১০টি শাপলা নিয়ে তৈরি একটি আঁটির দামও ১০ টাকা। কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় এসব পণ্য থেকে তাঁর আয় খুব বেশি হয় না। দিনভর বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা-ঢ্যাপ বিক্রি করে যে টাকা হাতে আসে, তা দিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে হয় তাঁকে। পণ্যের দাম কম হওয়ায় সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নির্ভর করতে হয় নিয়মিত পরিশ্রমের ওপর। ফলে তাঁর কাছে প্রতিদিনের এই বিক্রি শুধু বাজারে পণ্য বেচাকেনা নয়, পরিবারের জন্য খাবার জোগাড়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

চলনবিলের সম্পদে স্থানীয় মানুষের জীবিকা

চলনবিলের শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় পরিচিত উপাদান। বর্ষা মৌসুমে বিলের পানিতে জন্মানো এসব জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে অনেকে নিজেদের খাবারের চাহিদা মেটান। আবার কেউ কেউ এগুলো বাজারে বিক্রি করে উপার্জনের পথ তৈরি করেন। বিশেষ করে কৃষিকাজের বাইরে মৌসুমি আয়ের সুযোগ খোঁজা মানুষের কাছে বিলের এসব প্রাকৃতিক সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আব্দুল আলিমের মতো সংগ্রাহকেরা বিল থেকে পণ্য তুলে বাজারে পৌঁছে দেন। এতে একদিকে ক্রেতারা স্থানীয়ভাবে এসব খাবার কেনার সুযোগ পান, অন্যদিকে সংগ্রাহকেরাও কিছুটা আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন।

জীবিকার জন্য প্রতিদিনের সংগ্রাম

আব্দুল আলিমের জীবনে বর্ষার চার মাস আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এ সময় বিল থেকে শাপলা, ঢ্যাপ ও শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করাই তাঁর উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। বাকি সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। স্বল্প আয়ের এই কাজে প্রতিদিনই পরিশ্রম করতে হয়। বিল থেকে পণ্য সংগ্রহ, বাজারে নিয়ে আসা এবং ক্রেতাদের কাছে বিক্রি—সব মিলিয়ে তাঁর দিন কাটে জীবিকার সন্ধানে। বিক্রির অর্থ খুব বেশি না হলেও পরিবারের ব্যয় মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি