একটি গাণিতিক ধাঁধার সমাধানেই ভেঙে পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা!
এই সমস্যার সমাধান শুধু গণিতবিদদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইন্টারনেটে তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মতো বিষয়ও।
ছোট সংখ্যা ভাঙা সহজ, বড় সংখ্যায় কেন কঠিন?
ধরা যাক, একটি সংখ্যা ৯১। কোন দুটি মৌলিক সংখ্যার গুণফল ৯১, তা বের করতে খুব বেশি সময় লাগে না। কারণ, ৭ ও ১৩ গুণ করলে পাওয়া যায় ৯১। অর্থাৎ, ৯১-এর মৌলিক উৎপাদক ৭ ও ১৩।
কিন্তু সংখ্যাটি যদি হয় ১২৫৮৯৪৫৮৬২৮৫, তাহলে কাজটি তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে যায়। সংখ্যাটি কোন কোন মৌলিক সংখ্যার গুণফল, তা খুঁজে বের করতে আরও বেশি হিসাব করতে হতে পারে। আর সংখ্যা যত বড় হয়, উপযুক্ত পদ্ধতি ছাড়া তার মৌলিক উৎপাদক নির্ণয় করা তত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মৌলিক সংখ্যা হলো এমন স্বাভাবিক সংখ্যা, যাকে ১ এবং সেই সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনো স্বাভাবিক সংখ্যা দিয়ে নিঃশেষে ভাগ করা যায় না। যেমন ২, ৩, ৫, ৭, ১১ ও ১৩ মৌলিক সংখ্যা। কোনো সংখ্যাকে মৌলিক সংখ্যার গুণফল হিসেবে প্রকাশ করাকে বলা হয় মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ।
ছোট সংখ্যার ক্ষেত্রে এ কাজ সহজ হলেও কয়েক শ অঙ্কের সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক নির্ণয় করা অনেক কঠিন হতে পারে। এ ধরনের সংখ্যার ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করা জরুরি।
এই সমস্যার সমাধান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বড় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক নির্ণয়ের সমস্যা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্রিপ্টোগ্রাফি হলো তথ্যকে এমনভাবে সুরক্ষিত করার প্রযুক্তি, যাতে অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সেই তথ্য সহজে বুঝতে বা ব্যবহার করতে না পারে।
ইন্টারনেটে তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় তথ্য সুরক্ষার জন্য নানা ধরনের ক্রিপ্টোগ্রাফিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে আরএসএ (RSA) নামের বহুল পরিচিত একটি এনক্রিপশন পদ্ধতির নিরাপত্তা বড় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক নির্ণয়ের জটিলতার ওপর নির্ভর করে।
আরএসএ পদ্ধতিতে দুটি বড় মৌলিক সংখ্যার গুণফল ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ধরনের গণিতভিত্তিক চাবি তৈরি করা হয়। এই গুণফল জানা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট মৌলিক সংখ্যা দুটি দ্রুত বের করা কঠিন হওয়াই পদ্ধতিটির নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তবে সব এনক্রিপশন পদ্ধতি একই নীতিতে কাজ করে না। তাই বড় সংখ্যার উৎপাদক নির্ণয়ের সমস্যা সমাধান হলেই ইন্টারনেটের সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়।
সমাধান মিললে কি অনলাইন ব্যাংকিং ঝুঁকিতে পড়বে?
বড় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক দ্রুত বের করার জন্য যদি এমন কোনো কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা প্রচলিত কম্পিউটারেও বাস্তবে ব্যবহার করা সম্ভব, তাহলে আরএসএর মতো কিছু ক্রিপ্টোগ্রাফিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কারণ, কোনো ব্যবস্থার গোপন চাবি নির্ণয় করা সম্ভব হলে এনক্রিপ্ট করা তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়তে পারে নিরাপদ ওয়েবসাইটে তথ্য আদান-প্রদান, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের কিছু ব্যবস্থায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান হলেই পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়বে। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করবে আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি কতটা কার্যকর, কোন ধরনের এনক্রিপশন ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থায় কত দ্রুত যেতে পারছে—এসব বিষয়ের ওপর।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি বদলে দিতে পারে পরিস্থিতি?
প্রচলিত কম্পিউটারে বড় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক বের করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, পর্যাপ্ত শক্তিশালী ও ত্রুটিসংশোধন সক্ষম কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে শোরের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে বড় সংখ্যার উৎপাদক নির্ণয় করা সম্ভব।
এই কারণে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। তবে বর্তমানে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যবহৃত বড় সংখ্যাগুলোকে ব্যাপকভাবে ভেঙে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করা হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।
এ ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষকেরা পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে কাজ করছেন। এসব পদ্ধতির লক্ষ্য হলো এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বিরুদ্ধেও নিরাপদ থাকবে।
অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে পুরস্কারও রয়েছে
বড় সংখ্যার মৌলিক উৎপাদক নির্ণয়ের সমস্যা নিয়ে গবেষণা শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়, গণিতের অগ্রগতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সমস্যার সমাধানে নতুন গাণিতিক পদ্ধতি, অ্যালগরিদম ও কম্পিউটেশনাল কৌশল আবিষ্কারের সুযোগ রয়েছে।
তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য যে কেউ সরাসরি এক লাখ ডলার পুরস্কার পাবেন, এমন দাবি করার আগে নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার কর্মসূচির শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। সব অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট অর্থমূল্যের পুরস্কার থাকে না।
গণিতের এই ধাঁধা তাই একই সঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক ও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট একটি সংখ্যাকে কয়েকটি মৌলিক সংখ্যার গুণফলে ভাঙা সহজ হলেও, বিশাল সংখ্যার ক্ষেত্রে সেই কাজই আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এর সমাধানে অগ্রগতি গণিতের জ্ঞান বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনও তৈরি করতে পারে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array