সব সবজি ৫০ টাকার মধ্যে এলেই বলব, দাম কমেছে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ দামে দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবজি, মাছ, মাংস ও ডিম—প্রায় সব ধরনের পণ্য কিনতেই বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর বাজারে কিছুটা কমতে শুরু করেছে সবজির দাম। উত্তরবঙ্গ থেকে নতুন করে সবজির সরবরাহ বাড়তে থাকায় সামনে দাম আরও কমতে পারে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা। তবে সবজির বাজারে সামান্য স্বস্তি ফিরলেও আদা-রসুনের দাম আবার বেড়েছে। পেঁয়াজের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ডিমের দাম কিছুটা কমলেও মুরগি, মাছ, মাংস ও মুদি পণ্যের বাজার এখনো চড়া।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে কোনো কোনো সবজির দাম কমলেও অধিকাংশ পণ্য এখনো অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে সবজির দামে সামান্য পরিবর্তন এলেও সামগ্রিক নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি।
সর্বনিম্ন ৩০, সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা কেজি সবজি
মিরপুর ১ নম্বর কাঁচাবাজারে বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি টমেটো ১৬০ টাকা, কাঁচা টমেটো ১২০ টাকা, দেশি গাজর ১০০ টাকা এবং চায়না গাজর ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভারতীয় নতুন আলুর দাম ছিল ১২০ টাকা। লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং কালো গোল বেগুন বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকা কেজি দরে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি শিম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা, উচ্ছে ৭০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, কাকরোল ৮০ টাকা এবং ঢেঁড়স ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড পটল ৬০ টাকা, দেশি পটল ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০ টাকা, ধুন্দল ৭০ টাকা, ঝিঙা ৮০ টাকা এবং বরবটি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে কচুর লতি ৮০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৪০ টাকা এবং ধনেপাতা ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড শসার দাম ৬০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা কেজি।
মানভেদে প্রতিটি লাউ ৬০ থেকে ৭০ টাকা, চালকুমড়া ৬০ টাকা, ফুলকপি ৬০ টাকা এবং বাঁধাকপি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি হালি কাঁচা কলা ও লেবুর দাম ৪০ টাকা।
দাম তালিকায় পেঁপে, মূলা ও কয়েকটি সবজির দাম তুলনামূলক কম থাকলেও টমেটো, গাজর, শিম, বেগুন ও কাঁচা মরিচের মতো পণ্যে ক্রেতাদের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সবজির দাম বেশি থাকায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর বাজারের খরচ কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উত্তরবঙ্গের সবজি আসায় দাম কমার আশা
বাজারে সবজির দাম কমার কারণ হিসেবে উত্তরবঙ্গ থেকে নতুন করে সরবরাহ বাড়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তাঁদের আশা, সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে কিছু সবজির দাম আরও কমতে পারে।
সবজি বিক্রেতা মো. শাহ আলম বলেন, ‘বাজারে উত্তরবঙ্গ থেকে সবজি আসতে শুরু করেছে। এ কারণে দাম অনেকটাই কমে গেছে।’
দাম আরও কমবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগেই শিম ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছি। আজকে আছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। এমন সবকিছুর দামই এখন কমবে। আর যেসব সবজির এখন মৌসুম নয়, সেগুলোর দাম তো বেশিই থাকবে।’
বিক্রেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সরবরাহ বাজারে আসায় কিছু সবজির দামে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে মৌসুম, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে সব ধরনের সবজির দাম একই হারে কমবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
‘সব সবজি ৫০ টাকার মধ্যে এলেই বলা যাবে দাম কমেছে’
সবজির দাম কিছুটা কমলেও তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বাজার করতে আসা ক্রেতারা। তাঁদের মতে, কয়েকটি সবজির দাম কমলেই সামগ্রিক বাজারের চাপ কমে না। প্রতিদিনের রান্নায় প্রয়োজনীয় অধিকাংশ সবজি সাশ্রয়ী দামে পাওয়া গেলেই সাধারণ মানুষ প্রকৃত স্বস্তি পাবেন।
বাজার করতে আসা কাউসার হোসেন বলেন, ‘সবজির দাম সামান্য কমেছে। তবে সব সবজি যখন ৫০ টাকার মধ্যে আসবে, তখন ধনী-গরিব সবার কিনতে সমস্যা হবে না। তখনই বলা যাবে, দাম কমেছে। এর আগে বলা যাচ্ছে না যে দাম কমেছে।’
তাঁর বক্তব্যে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের প্রত্যাশা উঠে এসেছে। বাজারে পণ্য পাওয়া গেলেও সেগুলো কেনার সামর্থ্য না থাকলে দাম কমার সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে একাধিক পণ্যের বাড়তি দাম একসঙ্গে সংসারের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে।
আদা-রসুনের দাম আবার বেড়েছে, বাড়ছে পেঁয়াজও
সবজির দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও আদা ও রসুনের বাজারে উল্টো চিত্র। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। পেঁয়াজের দামেও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার ক্রস জাতের পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বৃহস্পতিবার উভয় ধরনের পেঁয়াজের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চায়না রসুনের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি চায়না রসুন ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। চায়না আদার দাম আগে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা থাকলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে।
এদিকে দেশি রসুনের দাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা। লাল ও সাদা আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজিতে। বগুড়ার আলুর দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা।
‘হঠাৎ করে দাম বাড়বে কেন?’
আদার দাম বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিক্রেতা মো. ইউসুফ। তাঁর দাবি, পাইকারি বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত দেখা গেলেও দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘কালকে আদা এনেছি ১৩০ টাকা কেজি আর আজকে আনলাম ১৭০ টাকা কেজি। তাহলে কত টাকা বাড়লো? তাও আবার ভেজা আদা। এটা শুকালেই ওজন আরও কমে যাবে। তাহলে কীভাবে হয়? হঠাৎ করে এরকম বেড়ে যাবে তার কারণটা কী? এমন তো না যে আমদানি কমেছে। পাইকারদের কাছে গিয়ে তো দেখি না যে মাল কম আছে। মাল তো ভরপুর আছে। তাহলে দাম বাড়বে কেন?’
বিক্রেতার এ বক্তব্যে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে। তবে আদা-রসুনের দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সরবরাহ, আমদানি, পরিবহন ব্যয় এবং পাইকারি বাজারের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ডিমের দাম সামান্য কমেছে, মুরগি এখনো চড়া
সবজির পাশাপাশি ডিমের দামেও সামান্য কমতির কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তবে মুরগি ও অন্যান্য মাংসের দাম এখনো বেশি। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা, কক মুরগি ৩০০ থেকে ৩১০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৬৫০ টাকা।
গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি দরে। খাসির মাংসের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ২৫০ টাকা।

ডিমের বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিম ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা।
সহিদ ডিম ঘরের বিক্রেতা সামিউল ইসলাম বলেন, ‘ডিমের দাম আজকে সামান্য কমেছে। আসলে এখন ডিমের দাম কমারই সময়। কিন্তু তারপরও এত দিন ধরে দাম বাড়তি থেকেছে।’
ডিমের দাম কিছুটা কমলেও মুরগি ও অন্যান্য মাংসের উচ্চমূল্য ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে প্রাণিজ আমিষের এসব উৎসের মধ্যে তুলনামূলক কম দামের পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
মাছের বাজারেও অধিকাংশ পণ্যের দাম অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে। বৃহস্পতিবার আকার ও ওজনভেদে প্রতি কেজি রুই মাছ ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং কাতল মাছ ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কালিবাউশ মাছের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং কৈ মাছ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি। পাবদা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি বাতাসি মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, কাজলি মাছ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং টেংরা মাছ ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মেনি মাছের দাম প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বেলে মাছ ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং রূপচাঁদা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী দামে বড় ব্যবধান থাকলেও তালিকায় থাকা অনেক মাছ কিনতে ক্রেতাদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে মাছ-মাংসের বাজারে সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজে পাওয়া অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
উচ্চমূল্যে অপরিবর্তিত মুদি পণ্যের বাজার
সবজি, মাছ ও মাংসের পাশাপাশি মুদি পণ্যের দামও ক্রেতাদের চাপে রেখেছে। বাজারে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চাল ২৩০ টাকা এবং খোলা পোলাওয়ের চাল মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ডালের মধ্যে ছোট মসুর ডাল প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারির ডাল ৮৫ টাকা, বুটের ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ১০৫ টাকা এবং মাষকলাইয়ের ডাল ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তেলের বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৪ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০৫ টাকা এবং খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া কৌটাজাত ও খোলা ঘি প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা, প্যাকেটজাত ও খোলা চিনি ১১০ টাকা কেজি, দুই কেজির প্যাকেট ময়দা ১৭০ টাকা এবং দুই কেজির প্যাকেট আটা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মসলার বাজারেও দাম বেশি। প্রতি কেজি এলাচ ৫ হাজার ৪০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ টাকা, কালো গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং জিরা ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাজুবাদামের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং কাঠবাদাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা।
সবজি কমলেও সামগ্রিক বাজারে স্বস্তি ফেরেনি
মিরপুর ১ নম্বর কাঁচাবাজারের চিত্র বলছে, উত্তরবঙ্গ থেকে সবজির সরবরাহ বাড়ায় কিছু পণ্যের দাম কমার আভাস মিলেছে। তবে টমেটো, গাজর, শিম ও কাঁচা মরিচের মতো সবজির দাম এখনো বেশি। এর সঙ্গে আদা-রসুনের মূল্যবৃদ্ধি, মাছ-মাংসের চড়া দাম এবং মুদি পণ্যের উচ্চমূল্য মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array