যেভাবে হলিউডে নিজের জায়গা গড়েছেন রোজ ম্যাকাইভার
১০ অক্টোবর ছিল এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। ১৯৮৮ সালের ১০ অক্টোবর নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রোজ ম্যাকাইভার ৩৮ বছরে পা দিয়েছেন। ‘দ্য লাভলি বোনস’, ‘আইজম্বি’ ও ‘ঘোস্টস’-এর মতো কাজের মধ্য দিয়ে নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। জন্মভূমি নিউজিল্যান্ড থেকে হলিউডে পৌঁছানোর এই যাত্রায় রয়েছে নানা অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের গল্প।
শৈশবেই অভিনয়ে হাতেখড়ি
রোজ ম্যাকাইভারের পুরো নাম ফ্রান্সেস রোজ ম্যাকাইভার। শিল্পী মা অ্যানি কনি ও আলোকচিত্রী বাবা ম্যাক ম্যাকাইভারের ঘরে তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি নাচের প্রতিও ছিল বিশেষ ঝোঁক। ব্যালে ও জ্যাজ নাচ শিখেছেন তিনি।
মাত্র দুই বছর বয়সে বিজ্ঞাপনে কাজ শুরু করেন রোজ। এরপর ১৯৯৩ সালে জেন ক্যাম্পিয়ন পরিচালিত ‘দ্য পিয়ানো’ সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। অল্প বয়সেই অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করলেও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁকে নতুন করে লড়াই করতে হয়েছে।
হলিউডে গিয়ে বুঝলেন প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতা
নিউজিল্যান্ডে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান রোজ ম্যাকাইভার। নতুন পরিবেশে তাঁর সামনে খুলে যায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে কাজ করার সম্ভাবনা। কিন্তু হলিউডে প্রবেশের পথ যে সহজ নয়, তা দ্রুতই বুঝতে পারেন তিনি।
অডিশনে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া, পছন্দের চরিত্র না পাওয়া এবং নির্মাতাদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে না পারার মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। নিউজিল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম ‘নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোজ জানিয়েছিলেন, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে একটি অডিশনে সাধারণ পোশাকে হাজির হওয়ার পর তাঁকে আরও ‘হলিউডসুলভ’ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
মন্তব্যটি তাঁকে আঘাত করেছিল। কারণ, অভিনয়ের দক্ষতার পাশাপাশি চেহারা, পোশাক ও উপস্থাপনার নির্দিষ্ট ধারণার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপও তখন অনুভব করছিলেন তিনি। হলিউডের এই অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্পষ্ট করে তোলে।
‘দ্য লাভলি বোনস’ এনে দেয় আন্তর্জাতিক পরিচিতি
২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া পিটার জ্যাকসন পরিচালিত ‘দ্য লাভলি বোনস’ সিনেমা রোজ ম্যাকাইভারের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অ্যালিস সিবোল্ডের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটিতে তিনি লিন্ডসে স্যালমনের চরিত্রে অভিনয় করেন। গল্পে খুন হওয়া কিশোরী সুসি স্যালমনের ছোট বোন লিন্ডসে চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সিনেমাটিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন সাওয়ার্সে রোনান। ছবিটি আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে রোজকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। বড় পর্দায় কাজের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয়জীবনের পথ আরও প্রশস্ত করে।
‘আইজম্বি’তে এক চরিত্রে বহু ব্যক্তিত্ব
রোজ ম্যাকাইভারের ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ টেলিভিশন সিরিজ ‘আইজম্বি’। রহস্য, অপরাধ ও কমেডির মিশেলে তৈরি এই সিরিজে তিনি লিভ মুর চরিত্রে অভিনয় করেন। গল্পে লিভ একজন চিকিৎসাবিষয়ক পেশাজীবী, যিনি জম্বিতে পরিণত হওয়ার পর মানুষের মস্তিষ্ক খেয়ে মৃত ব্যক্তিদের স্মৃতি ও ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য অনুভব করতে পারেন।
এই বিশেষ ক্ষমতার কারণে সিরিজটির প্রতিটি পর্বে রোজকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে হতো। কখনো আচরণ, কখনো কথাবার্তা, আবার কখনো শারীরিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে তাঁকে বদলে যেতে দেখা যায়। একই চরিত্রের মধ্যে নানা ধরনের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার এই সুযোগ তাঁর অভিনয়দক্ষতা প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
‘আইজম্বি’ তাঁকে টেলিভিশন দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। সিরিজটির মাধ্যমে তিনি শুধু রহস্যনির্ভর গল্পের নায়িকা হিসেবেই নয়, বরং কমেডি ও চরিত্রনির্ভর অভিনয়েও নিজের দক্ষতা তুলে ধরেন।
‘ঘোস্টস’-এ সাফল্য, প্রতি পর্বে আড়াই লাখ ডলার পারিশ্রমিক
রোজ ম্যাকাইভারের ক্যারিয়ারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন মার্কিন কমেডি সিরিজ ‘ঘোস্টস’। সিরিজটিতে স্যাম আরভিন চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও পারিবারিক কমেডির মিশেলে তৈরি এই সিরিজ দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। এর মাধ্যমে রোজ আবারও প্রমাণ করেন, ভিন্ন ধরনের গল্প ও চরিত্রে অভিনয় করার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
অভিনেত্রীর আয় নিয়ে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের হিসাব পাওয়া গেলেও তাঁর পারিশ্রমিক সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেছিল বিনোদনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘ডেডলাইন’। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঘোস্টস’-এর সাফল্যের পর রোজ ম্যাকাইভারের প্রতি পর্বের পারিশ্রমিক প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারে উন্নীত হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অঙ্ক তিন কোটি টাকার বেশি, যদিও বিনিময় হার অনুযায়ী টাকার পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
এই পারিশ্রমিকের তথ্য তাঁর ক্যারিয়ারের আর্থিক অগ্রগতির একটি দিক তুলে ধরে। শৈশব থেকে অভিনয় শুরু করলেও দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক কাজ এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।
চুমুর দৃশ্যেও ছিল মজার অভিজ্ঞতা
অভিনয়ের পাশাপাশি শুটিংয়ের নানা মজার অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিয়েছেন রোজ ম্যাকাইভার। ২০১৫ সালে ইয়াহু এন্টারটেইনমেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘আইজম্বি’ সিরিজের একটি চুমুর দৃশ্যের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
দৃশ্যটির চিত্রনাট্য পড়েই বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন রোজ। কিন্তু শুটিংয়ের সময় দেখা যায়, জম্বি চরিত্রের জন্য তাঁর মুখে লাগানো সাদা মেকআপ চুমুর সময় সহশিল্পী রবার্টের মুখে লেগে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দুজনই হাসাহাসি করেন। রোজের ভাষ্য অনুযায়ী, সহশিল্পীর সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া থাকায় দৃশ্যটির শুটিং আনন্দময় হয়ে উঠেছিল।
ঘটনাটি তাঁর অভিনয়জীবনের তুলনামূলক হালকা একটি দিক তুলে ধরে। পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে নানা রূপ ধারণ করলেও শুটিংয়ের পেছনে যে থাকে সহশিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয়, প্রস্তুতি ও অনেক সময় অপ্রত্যাশিত মজার মুহূর্ত, সেই অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি।
শৈশবের বিজ্ঞাপন থেকে হলিউডের পরিচিত মুখ
রোজ ম্যাকাইভারের ক্যারিয়ারকে এক কথায় তুলে ধরলে বলা যায়, এটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। দুই বছর বয়সে বিজ্ঞাপনে কাজ শুরু করা এই অভিনেত্রী তিন বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এরপর নিউজিল্যান্ডে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হলিউডের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হন।
‘দ্য লাভলি বোনস’ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়, ‘আইজম্বি’ তাঁকে টেলিভিশন দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে এবং ‘ঘোস্টস’ তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন সাফল্য যোগ করে। নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ পথচলার মধ্য দিয়ে রোজ ম্যাকাইভার আজ বিনোদনজগতের পরিচিত নাম।
তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, শৈশব থেকে অভিনয়ে যুক্ত থাকা কিংবা প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বড় অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সময়, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। রোজ ম্যাকাইভারের ক্যারিয়ার সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি উদাহরণ।

আপনার মতামত লিখুন
Array