২ কেজি বীজে শুরু, কালো ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন শিক্ষক
শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজের প্রতি ভালোবাসা থেকে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছেন পাবনার বেড়া উপজেলার সহকারী শিক্ষক সামির হোসেন সাদ্দাম। ইউটিউব ও অনলাইনে ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান চাষের ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২৩ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এই ধানের চাষ করেছেন তিনি। তাঁর খেতে বেড়ে ওঠা কালো ধান দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শৌখিন কৃষকেরা। প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন জাতের এই ধান চাষ করে এলাকায় কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন তিনি। সাদ্দাম হোসেন উপজেলার নাকালিয়া সাঁড়াশিয়া বণিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কৃষিকাজকে শখ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। এর আগে বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন জাতের মরিচ, লাল ঢেঁড়শ, আদা ও নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। এবার তাঁর কৃষি উদ্যোগের নতুন সংযোজন ব্ল্যাক রাইস।
ইউটিউবের ভিডিও দেখে চাষের পরিকল্পনা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেড়া উপজেলার হাটুড়িয়া মৌজায় ২৩ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কালো ধানের চাষ করেছেন সাদ্দাম। অনলাইনে এই ধানের চাষাবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন ভিডিও দেখার পর তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর বগুড়া থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে ২ কেজি বীজ সংগ্রহ করেন। সেই বীজ দিয়ে প্রথমে বীজতলা তৈরি করেন তিনি। পরে আষাঢ় মাসের শেষ দিকে জমিতে চারা রোপণ করেন। বীজ রোপণ থেকে ধান পরিপক্ব হতে প্রায় ১৪০ দিন সময় লাগে বলে জানান তিনি। চাষের শুরু থেকে ধানের বেড়ে ওঠা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁর কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। প্রচলিত ধানের বাইরে ভিন্ন জাতের এই ফসল ফলাতে পেরে সন্তুষ্ট সাদ্দাম। তিনি জানান, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু করা যাবে বলে আশা করছেন। বেড়া উপজেলায় এর আগে কেউ এই ধানের চাষ করেছেন বলে তাঁর জানা নেই। তবে তাঁর এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য আর্থিক লাভ নয়, বরং শখ থেকে নতুন কিছু চাষ করে দেখা।
কালো ধানের চাষই সাদ্দাম হোসেনের কৃষিকাজের প্রথম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নয়। গত পাঁচ বছর ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় প্রায় এক বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের কাঁচা মরিচ, লাল ঢেঁড়শ, আদা ও নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করে আসছেন তিনি। নতুন নতুন ফসল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ স্থানীয়দেরও আকৃষ্ট করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর এই কৃষি কার্যক্রম এলাকায় প্রশংসা পেয়ে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাঁর খেতে বিভিন্ন ধরনের ফসল দেখতে দূরদূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ ও শৌখিন কৃষকেরা আসছেন। অনেকে নতুন জাতের ফসল সম্পর্কে জানতে চান এবং চাষের পদ্ধতি দেখেন। শিক্ষকতার বাইরে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে কৃষিকাজে যুক্ত থাকার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে বিকল্প কৃষিচর্চা নিয়েও আগ্রহ তৈরি করেছে।
ব্ল্যাক রাইসের বাজারমূল্য ও সম্ভাব্য ফলন
সাদ্দাম হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ব্ল্যাক রাইস ধানের দাম প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। তাঁর হিসাবে, প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে তাঁর নিজের জমিতে প্রকৃত ফলন কত হবে, তা ধান কাটার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরীক্ষামূলক এই চাষ সফল হলে ভবিষ্যতে অন্য কৃষকেরাও কালো ধান চাষে আগ্রহী হতে পারেন। তবে নতুন কোনো ফসল বাণিজ্যিকভাবে চাষের আগে বীজের প্রাপ্যতা, উৎপাদন খরচ, ফলন, বাজারের চাহিদা ও বিক্রির নিশ্চয়তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু বাজারদর বেশি হলেই যে কৃষকের লাভ নিশ্চিত হবে, তা নয়।
কৃষি বিভাগের সহযোগিতা
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুসরাত কবীর জানান, সহকারী শিক্ষক সাদ্দাম হোসেন ২৩ শতাংশ জমিতে ব্ল্যাক রাইস চাষ করেছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা শুরু থেকেই তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। অন্য কৃষকেরাও যাতে এই ধান চাষে আগ্রহী হন, সে জন্য কৃষি অফিস থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ব্ল্যাক রাইসের চাল স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে পরিচিত। তবে এই চালের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি।
নতুন ফসল নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ
প্রচলিত ধানের পাশাপাশি বিকল্প জাতের ফসল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব আয়ে রূপ দিতে হলে উৎপাদন ব্যয়, ফলন, বাজারব্যবস্থা এবং কৃষকের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
সাদ্দাম হোসেনের ২৩ শতাংশ জমির পরীক্ষামূলক চাষের ফলাফল তাই তাঁর নিজের আগ্রহের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্থানীয় কৃষকদের জন্যও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। ধান কাটার পর ফলন ও উৎপাদন খরচের হিসাব পাওয়া গেলে এই চাষের বাস্তব সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array