এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ মেহজাবীন
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) সকালে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ ও লাইক পাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং অন্যের সম্মানহানিকে কেন্দ্র করে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মেহজাবীন।
পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কবে থেকে অন্য একজন মানুষের অপমান আর অসম্মান আমাদের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল?’
ভুয়া ভিডিও ঘিরে আলোচনা, সরব মেহজাবীন
সম্প্রতি মেহজাবীন চৌধুরী ও অভিনেত্রী পরীমনিকে ঘিরে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি কয়েকটি ভুয়া আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৩ অক্টোবর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এসব ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
পরে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের পর সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয় বলেও জানানো হয়। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনাটি অনুসন্ধান করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচিত ভিডিওগুলো আসল নয়। অন্য ভিডিওতে ফেস সোয়াপ প্রযুক্তির মাধ্যমে মেহজাবীন ও পরীমনির মুখ বসিয়ে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার নিজের অবস্থান জানিয়ে মেহজাবীন বলেন, এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি এবং তাঁকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়। এটি একটি অপরাধ।’
শুধু নির্মাতা নন, শেয়ারকারীদেরও দায় আছে
মেহজাবীনের উদ্বেগ শুধু ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মতে, যখন শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষ একই কনটেন্ট শেয়ার করতে থাকেন, তখন বিষয়টি আর একজনের অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বড় সামাজিক সমস্যার রূপ নেয়।
কোনো কনটেন্ট কে তৈরি করেছেন, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেটি জেনেশুনে ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে কারা যুক্ত হচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিনেত্রী। কেউ পোস্টটি শেয়ার করছেন, কেউ মন্তব্য করছেন, আবার কেউ অন্যদের দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এভাবেই অপমানজনক কনটেন্ট আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে।
অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তাঁকে নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে কল্পনা করার প্রচলিত যুক্তিরও সমালোচনা করেছেন মেহজাবীন। তিনি লিখেছেন, ‘এই পর্যায়ে এসে সেই পুরোনো কথাটাও আর বলতে ইচ্ছে করে না যে একবার ভাবুন তো, এমনটা যদি আপনার মা কিংবা বোনের সঙ্গে ঘটত!’
এরপরই তাঁর প্রশ্ন, ‘কারণ কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে, তাকে আমাদের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন?’
মেহজাবীনের এই বক্তব্যে মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্মানকে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দেখার আহ্বান উঠে এসেছে। তাঁর মতে, একজন মানুষকে সম্মান করার জন্য তাঁর সঙ্গে নিজের আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা জরুরি হতে পারে না।
ভিউ, লাইক আর কয়েক ডলারের জন্য সম্মানহানি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন মেহজাবীন। তাঁর মতে, ট্রেন্ডিংয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা, বেশি ভিউ পাওয়া কিংবা কয়েক ডলার আয়ের আশায় অন্যের সম্মানহানি করার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
অনেক মানুষের জীবিকা এখন কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত—এ বাস্তবতা স্বীকার করেছেন অভিনেত্রী। তবে কনটেন্ট থেকে আয় করার প্রয়োজন কখনোই অন্য কাউকে অপমান বা হেয় করার অধিকার দিতে পারে না বলে মনে করেন তিনি।
অনলাইনে কোনো কনটেন্টের ভিউ ও শেয়ার যত বাড়ে, সেটি তত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। ফলে মিথ্যা বা বিকৃত কনটেন্টের বিস্তার শুধু মূল নির্মাতার ওপর নির্ভর করে না; ব্যবহারকারীদের আচরণও এতে ভূমিকা রাখে।
এ কারণে কেবল ভুয়া কনটেন্ট তৈরি বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। সেটি যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া, আপত্তিকর বিষয়কে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করা এবং অন্যের ক্ষতিকে উপেক্ষা করার প্রবণতা নিয়েও সামাজিকভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের অপপ্রচারের শিকার হতে পারেন যে কেউ
মেহজাবীন মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ও ক্ষতিকর কনটেন্টের সমস্যা এখন আর শুধু নারী-পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় যে কেউ এমন কনটেন্ট ছড়ানোর অংশ হয়ে উঠতে পারেন। আবার যে কেউ এর শিকারও হতে পারেন।
প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কোনো ব্যক্তির মুখ অন্য ভিডিওতে বসিয়ে এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে সাধারণ দর্শকের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝা কঠিন হতে পারে। এ ধরনের কনটেন্টের সঙ্গে মিথ্যা তথ্য যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তাঁর মুখ ব্যবহার করে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা হলে সেটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। কনটেন্টটি ভুয়া—এ তথ্য পরে প্রকাশ পেলেও এরই মধ্যে সেটি বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
তাই এআই দিয়ে তৈরি কোনো ভিডিও বা ছবি দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া কিংবা যাচাই না করে শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা মেহজাবীনের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আগেও এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন অভিনেত্রী
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারকাদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে প্রচারের ঘটনা নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মেহজাবীন। সে সময় তিনি কঠোর আইন, জনসচেতনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
তবে এবারের পোস্টে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির অপব্যবহার যেমন অন্যায়, তেমনি সেই অন্যায়কে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারীদের দায় রয়েছে।
প্রযুক্তি দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা ব্যক্তি সরাসরি এর জন্য দায়ী হলেও, অন্যরা সেটি জেনেশুনে ছড়িয়ে দিলে ক্ষতির পরিধি আরও বাড়তে পারে। ফলে অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ, তথ্য যাচাই এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
‘নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন’
পোস্টের শেষাংশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন মেহজাবীন। তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছেন শুধু ভুয়া কনটেন্টের নির্মাতারা নন, বরং যাঁরা এসব কনটেন্ট শেয়ার করে সেগুলোর বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন, তাঁরাও।
অভিনেত্রীর মতে, কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তৈরি কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার আগে প্রত্যেকেরই ভাবা উচিত, তাঁরা কী ধরনের আচরণকে উৎসাহিত করছেন এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কী ক্ষতি হতে পারে।
এ কারণেই পোস্টের শেষ বাক্যে সরাসরি ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, ‘একজন অপরাধীর অপরাধে অংশ নিয়ে নিজের বিবেকহীনতার পরিচয় দেবেন কি না, ভেবে দেখতে পারেন।’
মেহজাবীনের বক্তব্যে স্পষ্ট, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বা আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। অনলাইনে অন্যের প্রতি সম্মান, দায়িত্বশীল আচরণ এবং যাচাই ছাড়া ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে না দেওয়ার মানসিকতাও জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন
Array