৩ লাখ বছর আগের মানুষের মুখচ্ছবি, আজকের মানুষের সঙ্গে অবিশ্বাস্য মিল!
প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করা এক আদি মানুষের মুখচ্ছবি পুনর্গঠন করেছেন গবেষকেরা। জীবাশ্ম খুলির ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল ও শারীরিক গঠনের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে এই মুখাবয়ব। গবেষকদের মতে, সেই মানুষকে আধুনিক পোশাক পরিয়ে আজকের মানুষের ভিড়ে দাঁড় করালে প্রথম দেখায় তাকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারত।
এই পুনর্গঠন প্রাচীন মানুষের শারীরিক গঠন, বিবর্তনের ইতিহাস এবং আধুনিক মানুষের সঙ্গে তাদের সাদৃশ্য নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, এত প্রাচীন সময়ের একজন হোমো স্যাপিয়েন্সের মুখমণ্ডলের সঙ্গে বর্তমান মানুষের মিল গবেষণাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
মরক্কোর জীবাশ্ম থেকে মুখচ্ছবি পুনর্গঠন
১৯৬০-এর দশকে উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর জেবেল ইরহুদ এলাকায় একটি জীবাশ্ম খুলি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পর প্রথম দিকে খুলিটিকে নিয়ান্ডারথাল মানুষের বলে মনে করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী গবেষণায় জীবাশ্মটির পরিচয় সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়।
২০১৭ সালে প্রকাশিত গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, জেবেল ইরহুদের জীবাশ্মগুলো প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্সের নিদর্শন। এগুলোর বয়স আনুমানিক ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর। ফলে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি ও প্রাথমিক বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে জেবেল ইরহুদ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পরিণত হয়েছে।
সেই জীবাশ্মের খুলির গঠন বিশ্লেষণ করেই এবার মুখচ্ছবি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে খুলির ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল এবং আফ্রিকার মানুষের শারীরিক গঠনসংক্রান্ত তথ্য। এসব উপাত্তের সমন্বয়ে গবেষকেরা প্রাচীন মানুষটির সম্ভাব্য মুখের অবয়ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
ভ্রূরেখায় পার্থক্য, মুখমণ্ডলে আধুনিক মানুষের ছাপ
পুনর্গঠিত মুখচ্ছবিতে আধুনিক মানুষের সঙ্গে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা গেছে। তবে চেহারায় কিছু পার্থক্যও ছিল। গবেষকদের তৈরি অবয়বে ওই মানুষের ভ্রূরেখা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃঢ় এবং মুখমণ্ডলের গঠনে আধুনিক মানুষের তুলনায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়।
এই পার্থক্যগুলো প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্সের শারীরিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মানুষের মুখমণ্ডল ও খুলির গঠন দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রাচীন পূর্বসূরিদের বেশ কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মিল ছিল বলে এই পুনর্গঠন থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
অবশ্য পুনর্গঠিত মুখচ্ছবিকে ওই ব্যক্তির চেহারার হুবহু প্রতিরূপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জীবাশ্ম থেকে খুলির গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও মুখের নরম টিস্যু, ত্বক এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি নির্ধারণ করা কঠিন। তাই এটি মূলত প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সম্ভাব্য মুখাবয়ব।

মস্তিষ্কের আয়তনেও আধুনিক মানুষের সঙ্গে মিল
গবেষণায় প্রাচীন ওই মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন পাওয়া গেছে প্রায় ১ হাজার ২৩০ ঘন সেন্টিমিটার। অন্যদিকে, আধুনিক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের গড় মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ১ হাজার ২৩৪ ঘন সেন্টিমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই সময়ের মানুষের মস্তিষ্কের আয়তনের এই কাছাকাছি অবস্থান গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। প্রায় ৩ লাখ বছর আগের একজন হোমো স্যাপিয়েন্সের মস্তিষ্কের আয়তন আধুনিক মানুষের গড় আয়তনের কাছাকাছি হওয়া থেকে বোঝা যায়, মানুষের বিবর্তনকে শুধু মস্তিষ্কের আকারের পরিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তবে মস্তিষ্কের আয়তনে মিল থাকলেই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, চিন্তাভাবনা কিংবা আচরণে দুই সময়ের মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ মিল ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতা ও আচরণ বুঝতে মস্তিষ্কের গঠনের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনা করতে হয়।
ত্বক, চুল ও চোখের রং নিয়ে অনিশ্চয়তা
প্রাচীন মানুষটির ত্বক, চুল ও চোখের রং কেমন ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জীবাশ্ম খুলি থেকে সাধারণত মুখের হাড়ের গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও এসব বৈশিষ্ট্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
গবেষকেরা সম্ভাব্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে পুনর্গঠিত মুখচ্ছবিতে কালো চুল ও দাড়ি যুক্ত করেছেন। তবে এগুলোকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ, প্রাপ্ত জীবাশ্ম থেকে ওই ব্যক্তির প্রকৃত চুলের ধরন, দাড়ি কিংবা ত্বকের রং সরাসরি নিশ্চিত করা যায়নি।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ডিজিটাল পুনর্গঠন প্রাচীন মানুষের সম্ভাব্য চেহারা কল্পনা করার একটি কার্যকর উপায়। জীবাশ্মের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয় অতীতের মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আরও সহজে তুলে ধরতে সাহায্য করছে।
জেবেল ইরহুদে মিলেছে একাধিক মানুষের জীবাশ্ম
মরক্কোর জেবেল ইরহুদ এলাকায় এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন হোমো স্যাপিয়েন্সের ২২টি জীবাশ্ম হাড় পাওয়া গেছে। শুধু মানুষের হাড় নয়, এই এলাকায় প্রাচীন মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।
সেখানে পাথরের তৈরি হাতিয়ার, আগুন ব্যবহারের প্রমাণ এবং শিকার করা প্রাণীর হাড় পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন প্রাচীন মানুষের জীবনযাপন, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা পেতে সহায়তা করে।
জীবাশ্ম ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মানুষের অস্তিত্ব, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং জীবনযাত্রার ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। জেবেল ইরহুদের আবিষ্কারগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো আফ্রিকায় হোমো স্যাপিয়েন্সের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয়।
মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে নতুন আগ্রহ
প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগের মানুষের মুখচ্ছবি আধুনিক মানুষের সঙ্গে কতটা মিল থাকতে পারে, তা সামনে এনে দিয়েছে এই পুনর্গঠন। মুখমণ্ডলের কিছু পার্থক্য এবং মস্তিষ্কের আয়তনের উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য প্রাচীন ও আধুনিক মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে মানুষের বিবর্তন ছিল দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। কোনো একটি জীবাশ্ম বা পুনর্গঠিত মুখচ্ছবি দিয়ে সেই ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। বরং বিভিন্ন সময়ের জীবাশ্ম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সমন্বয়েই মানুষের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে হেরিটেজ সাময়িকীতে।
সূত্র: ইয়াহু
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array