ওষুধ খেলেই ঘুম, ওজন বৃদ্ধি? মানসিক চিকিৎসা নিয়ে যত ভুল ধারণা
মানসিক রোগের চিকিৎসা নিয়ে সমাজে এখনো নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকের ধারণা, মানসিক রোগের ওষুধ একবার শুরু করলে আর বন্ধ করা যায় না। কেউ মনে করেন, এসব ওষুধ খেলে সারা দিন ঘুম পায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা ওজন বেড়ে যায়। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, মানসিক রোগ কখনো পুরোপুরি ভালো হয় না। এসব ধারণার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন, কেউ কেউ আবার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ বন্ধ করে দেন।
১. ওষুধ শুরু করলে আর বন্ধ করা যায় না
মানসিক রোগের ওষুধ কত দিন খেতে হবে, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, তীব্রতা এবং পুনরায় অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকির ওপর। সব রোগীকেই সারা জীবন ওষুধ খেতে হয়—এ ধারণা সঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞের মতে, রোগী সুস্থ ও স্থিতিশীল হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওষুধ বন্ধ করা যেতে পারে। গুরুতর বিষণ্নতার ক্ষেত্রে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডির লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও নির্দিষ্ট সময় ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে অনেক রোগীর দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি জীবনব্যাপী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই রোগের লক্ষণ কমে গেলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। কখন ও কীভাবে ওষুধ বন্ধ করতে হবে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
২. ওষুধ খেলে সারা দিন ঘুম পায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে
মানসিক রোগের কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুম ঘুম ভাব বা ঝিমুনি দেখা দিতে পারে। তবে সব ওষুধে এমন সমস্যা হয় না, আবার সবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। ওষুধ খাওয়ার পর অতিরিক্ত ঘুম, দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো অস্বস্তি হলে চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা, খাওয়ার সময় কিংবা ওষুধের ধরন পরিবর্তন করা যেতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপদ সমাধান খুঁজে নেওয়াই ভালো।
৩. মানসিক রোগের ওষুধ খেলে ওজন বাড়ে, অলসতা আসে
মানসিক রোগের কিছু ওষুধ ক্ষুধা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের কারণে কারও কারও ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সব মানসিক রোগের ওষুধে ওজন বাড়ে না। ওজন বাড়ার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসার শুরু থেকেই খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও ওজনের দিকে নজর রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি বিবেচনা করা সম্ভব। ওজন বৃদ্ধির ভয় থেকে নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করলে রোগের লক্ষণ ফিরে আসতে পারে। তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাও নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
৪. কাউন্সেলিং বা থেরাপিই যথেষ্ট, ওষুধের প্রয়োজন নেই
মানসিক রোগের চিকিৎসা সবার জন্য এক রকম নয়। রোগের ধরন, তীব্রতা, ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ওপর নির্ভর করে ওষুধ, কাউন্সেলিং কিংবা সাইকোথেরাপি এককভাবে অথবা সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়। সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, গুরুতর বিষণ্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে ওসিডি, এডিএইচডি ও উদ্বেগজনিত সমস্যার চিকিৎসায় ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আবার সম্পর্কের জটিলতা, আচরণগত সমস্যা, নির্দিষ্ট কিছু ভয় বা মৃদু বিষণ্নতার ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ও সাইকোথেরাপি একসঙ্গে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন সঠিক রোগনির্ণয় ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
৫. মানসিক রোগ কখনো ভালো হয় না
মানসিক রোগ নিয়ে এটি অন্যতম ক্ষতিকর ভুল ধারণা। বাস্তবে অনেক মানসিক রোগের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। সঠিক রোগনির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা, নিয়মিত ফলোআপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে বহু রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে দূরে থাকা এবং পরিবারের সহায়তা সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসার সময়কাল এবং ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। মানসিক অসুস্থতা লুকিয়ে রাখা কিংবা চিকিৎসা এড়িয়ে চলার পরিবর্তে সময়মতো বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রোগীকে দোষারোপ না করে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
মানসিক রোগের ওষুধ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করা জরুরি। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা, মাত্রা কমানো কিংবা অন্যের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সঠিক রোগনির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে মানসিক রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ—তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
লেখকঃ ডা. হেলাল উদ্দিন
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array