স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ে নেত্রকোনায় বদলেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, এসেছে একাধিক সরকার, নির্বাচিত হয়েছেন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। কেউ দায়িত্ব পালন করেছেন মন্ত্রিসভায়, কেউ এলাকার উন্নয়নে নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। তবু সড়ক যোগাযোগ, রেলপথ, হাওর ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অবকাঠামোর অনেক পুরোনো সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—এত বছরে নেত্রকোনার উন্নয়ন কতটা হয়েছে, আর সেই পরিবর্তনে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কতটুকু?
কবি, বাউল ও সুফি-সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত নেত্রকোনা ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অন্য অঞ্চলের মতো এ জেলাকেও নতুন করে পথচলা শুরু করতে হয়। তখন এটি ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়লেও সীমান্তঘেঁষা এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘদিন নানা সীমাবদ্ধতা ছিল।

বর্ষায় বিস্তীর্ণ হাওর পানিতে তলিয়ে যায়, আর শুষ্ক মৌসুমে যোগাযোগের দুর্ভোগ পোহাতে হয় অনেক এলাকার মানুষকে। সুপেয় পানির সংকট, নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢল, কাঁচা সড়ক এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও জেলার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্বাধীনতার পর নেত্রকোনার রাজনৈতিক ইতিহাসে এসেছে নানা পরিবর্তন। বিভিন্ন সময়ে জেলার সংসদীয় আসনের সীমানা ও বিন্যাসেও পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা জেলার পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
পুরোনো সময়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন খান। নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুড়ী) আসনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী এই নেতা ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্য, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
নেত্রকোনা-১ আসনটি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নাম জালাল উদ্দিন তালুকদার। তিনি ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জয়ী হন। পরে তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
দুর্গাপুর-কলমাকান্দার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে পাহাড়, সীমান্ত ও নদী। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন, সীমান্তবর্তী যোগাযোগ এবং পর্যটন সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জও আলাদা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি আসেনি।
নেত্রকোনা-২ আসনটি জেলা সদর ও বারহাট্টা উপজেলা নিয়ে গঠিত। জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনি ইতিহাসে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ, ফজলুর রহমান খান, আশরাফ আলী খান খসরু ও আরিফ খান জয়ের মতো নেতাদের নাম রয়েছে।
আরিফ খান জয় ২০১৪ সালের পর যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরুও এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক এ আসনে নির্বাচিত হন।
জেলা সদর হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে কাজ হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, পৌর শহরের অনেক সড়কের অবস্থা এখনো নাজুক। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মহুয়া অডিটোরিয়ামও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬ সালে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান ও অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৩ আসনেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এ এলাকার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, শিক্ষা এবং নদী-খাল ব্যবস্থাপনা। নদী ও খাল পুনঃখননের মতো উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এলেও স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, এখনো কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।
অন্যদিকে, নেত্রকোনা-৪ জেলার অন্যতম হাওরপ্রধান আসন। মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ এলাকায় বর্ষায় নৌপথই যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ইতিহাসে এ আসনের সঙ্গে মমিন পরিবারের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন খানের পর তাঁর স্ত্রী রেবেকা মমিন ২০০৮ সাল থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
হাওর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা ও যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরবাসীর জীবনমান বদলে দেওয়ার মতো টেকসই পরিবর্তন এখনো সীমিত। তাঁদের মতে, দীর্ঘ সময় জনপ্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায় থাকার কারণে উন্নয়নের আরও বড় সুযোগ ছিল।

পূর্বধলা উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৫ আসনের নির্বাচনি সীমানাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় বৃহত্তর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও পূর্বধলা নিয়ে আসনটি গঠিত ছিল। পরে শুধু পূর্বধলা নিয়ে বর্তমান আসনটি গঠিত হয়। এ আসন থেকে ডা. মোহাম্মদ আলী, জালাল উদ্দিন তালুকদার, আবদুল করিম আব্বাসী, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ও আহমদ হোসেনসহ বিভিন্ন নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাছুম মোস্তফা নির্বাচিত হন।
পূর্বধলার উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস এবং একাধিক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি থাকার পরও প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগ ও অবকাঠামো নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষ রয়েছে।
নেত্রকোনার সঙ্গে নদী ও হাওরের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়, অর্থনৈতিকও। মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ী, বারহাট্টা ও কেন্দুয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি, মাছ ও জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল।
নদীভাঙন রোধ, খাল পুনঃখনন, হাওরের যোগাযোগব্যবস্থা, মাছের উৎপাদন, কৃষি এবং কর্মসংস্থান—প্রতিটি সরকারই এসব বিষয়কে উন্নয়ন আলোচনায় এনেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগের অনেকগুলোই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
তবে জেলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্পের কৃতিত্ব এককভাবে কোনো সংসদ সদস্যের নামে দেওয়া সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। সংসদ সদস্যরা সাধারণত এলাকার দাবি সংসদে তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সমর্থন দেন। অন্যদিকে, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার ওপর।
স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে নেত্রকোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু, সরকারি স্থাপনা, নদী-খাল পুনঃখনন, আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং হাওরকেন্দ্রিক অবকাঠামোতে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের গতি ও বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে সীমান্ত, হাওর ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা পৌঁছেছে, সেটিই বড় বিবেচ্য বিষয়।
এখন নেত্রকোনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যোগাযোগব্যবস্থা, হাওর ব্যবস্থাপনা, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটগুলোকে কতটা বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে রূপ দিতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর নেত্রকোনার মানুষের প্রত্যাশা শুধু নতুন প্রকল্প বা প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চায় উন্নয়নের সুফল পৌঁছাক প্রত্যন্ত গ্রাম, সীমান্তবর্তী এলাকা ও হাওরাঞ্চলে। এমপি-মন্ত্রীরা এসেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার বিদায় নিয়েছেন—এখন সময় উন্নয়নের দৃশ্যমান ও টেকসই ফল দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যায়ন করার।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array