সেতুর অভাবে দুর্ভোগে ১০ গ্রামের মানুষ, অপেক্ষা কবে শেষ হবে?
গুমানী নদীর দুই পাড়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। অথচ মাঝখানে একটি সেতু না থাকায় এই সামান্য দূরত্বই বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে হাজারো মানুষের। নদীর ওপারে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও নাগরিক সেবা—সবই রয়েছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে প্রতিদিন ভরসা করতে হয় খেয়া নৌকা কিংবা বাঁশের চারাটের ওপর। বর্ষায় নদীর স্রোত বাড়লে সেই পারাপার হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সীমান্তবর্তী গুমানী নদীর ধামাইচ বাজার ঘাটে একটি সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। প্রায় এক বছর আগে সেতুর মাপজোখ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে এরপর দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সেই আশা ক্রমেই হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
গুমানী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত ধামাইচ বাজার। গুরুদাসপুরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে প্রতিদিন আসেন নদীর উত্তর পাড়ের হেমনগর, নওখাদা, কাটাবাড়ি, বিন্নাবাড়ি ও সবুজপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, কৃষিপণ্য বিক্রি, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা শিক্ষার প্রয়োজনে তাঁদের নদী পার হতে হয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ পাড়ের ধামাইচ, ঈশ্বরপুর বাহাদুরপাড়া ও রানীগ্রামের বাসিন্দাদের কৃষিজমির বড় অংশ রয়েছে নদীর উত্তর পাড়ের বিস্তীর্ণ চলনবিলে। ফলে জমিতে চাষাবাদ, ফসল কাটা এবং উৎপাদিত শস্য বাড়িতে কিংবা বাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ধাপেই তাঁদের নদী পারাপারের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সেতু না থাকায় প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজেও বাড়তি সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিকাজের ব্যস্ত মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
নদীতে পানি বাড়লে পারাপারের সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়। স্রোত বেড়ে গেলে খেয়া নৌকায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েন স্কুলগামী শিশুদের অভিভাবকেরা।
ধামাইচবিলচলন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুকুল হোসেন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, বর্ষাকালে উত্তাল নদী পার হয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। নদী পারাপারের ঝুঁকির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যায়।
তাঁদের মতে, ধামাইচ বাজার ঘাটে সেতু নির্মিত হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি দুই পাড়ের মানুষের শিক্ষা, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এলাকাটির মানুষের জীবিকার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক গভীর। নদীর দুই পাড়ে জমি থাকলেও সেতু না থাকায় উৎপাদিত ফসল পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয় কৃষকদের। বর্ষাকালে নৌকায় কৃষিপণ্য ওঠানো-নামানো এবং নদী পার করে গন্তব্যে পৌঁছানোয় অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়।
ধামাইচ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, এই পরিস্থিতিতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন। সেতু নির্মিত হলে কৃষিপণ্য সহজে বাজারে আনা-নেওয়া করা যাবে। এতে পরিবহনব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় শিক্ষক আবুল বাসার এনাম বলেন, নদীর উত্তর পাড়ের বাসিন্দাদের তাড়াশ উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইলে গিয়ে নাগরিক সেবা নিতে হয়। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে যাতায়াত করা সম্ভব হলেও বর্ষায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি মনে করেন, ধামাইচ বাজার ঘাটে সেতু নির্মিত হলে বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পাশাপাশি প্রশাসনিক যোগাযোগও সহজ হবে। এতে দুই পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
ঘাটের মাঝি লিটন সরদার জানান, যাত্রীদের চাপ সামলাতে দুটি খেয়া নৌকা চালাতে হয়। এ জন্য মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আবার শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে বাঁশের চারাট নির্মাণ করতে হয়। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
তাঁর ভাষ্য, সেতু নির্মিত হলে নদী পারাপারে মানুষের সময় ও শ্রম বাঁচবে। একই সঙ্গে যাতায়াতের খরচ ও অনিশ্চয়তাও কমবে।
তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবাদ হোসেনের নেতৃত্বে সেতুর মাপজোখ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। তবে এরপর নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
ফলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ কোন পর্যায়ে রয়েছে, কবে এর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আয়নুল হক বলেন, ধামাইচ বাজার ঘাটে সেতু নির্মাণ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডিমান্ড নোট বা ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, আগামী শুকনো মৌসুমে দরপত্র আহ্বান করে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের কাছে ধামাইচ বাজার ঘাটে একটি সেতু নির্মাণ শুধু যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা ও নাগরিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোরও প্রশ্ন। সেতু হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে, কৃষকেরা কম ভোগান্তিতে ফসল বাজারে নিতে পারবেন এবং জরুরি প্রয়োজনে নদী পারাপারের অনিশ্চয়তা কমবে।
দীর্ঘদিনের দাবি, মাপজোখ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরও বাস্তবে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে এবং প্রতিশ্রুত সেতু নির্মাণের কাজ বাস্তবে এগিয়ে নেবে।
গুমানী নদীর স্রোত বয়ে চলেছে, বদলাচ্ছে ঋতু, পেরিয়ে যাচ্ছে বছর। কিন্তু দুই পাড়ের মানুষের প্রশ্ন একই—কবে কাগজের সম্ভাব্যতা বাস্তবের সেতু হয়ে দাঁড়াবে?
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি




আপনার মতামত লিখুন
Array