প্রথম চালানে ১৮ কোচ পাঠাল ভারত, নতুন দুই আন্তনগর ট্রেন চালুর উদ্যোগ
বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে প্রথম চালানে ১৮টি কোচ বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠিয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে। নতুন কোচগুলো দেশে আসার পর ঢাকা-পাবনা ও ঢাকা-খুলনা ব্রডগেজ রুটে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব ট্রেন চালু হলে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে এবং যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গত ১২ অক্টোবর ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালায় অবস্থিত রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে কোচগুলো বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিসেস লিমিটেডের (রাইটস) করা চুক্তির আওতায় এসব কোচ সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রথম চালানে ১৮ কোচ, রয়েছে এসি-নন-এসি সুবিধা
প্রথম চালানে পাঠানো ১৮টি কোচের মধ্যে ১১টি নন-এসি শোভন চেয়ার কার, তিনটি এসি চেয়ার কার, দুটি এসি স্লিপার কার এবং দুটি এসি পাওয়ার কার রয়েছে। পাওয়ার কার দুটিতে গার্ডের কক্ষ ও মালপত্র রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোচগুলো ভারত-বাংলাদেশের গেদে-দর্শনা আন্তদেশীয় রেল সংযোগ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কোচগুলোর প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হতে পারে।
এ জন্য ভারতীয় রেলওয়ের একটি কারিগরি দল সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে কাজ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে কোচগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষণ, পরিচালন উপযোগিতা নিশ্চিত করা এবং যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই এগুলো ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে সরবরাহ শেষ করার লক্ষ্য
বাংলাদেশ রেলওয়েকে ২০০টি লিংকে-হফম্যান-বুশ (এলএইচবি) ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালের ২০ মে রাইটসের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৯ অক্টোবরের মধ্যে কোচগুলোর সরবরাহ, পরীক্ষণ ও চালুর কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের কাপুরথালার রেল কোচ ফ্যাক্টরিতে তৈরি এসব কোচ বাংলাদেশের রেলওয়ের পরিচালনব্যবস্থা এবং যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে একাধিক অবস্থানে হেলানো যায় এমন বিশেষ আসন, স্টেইনলেস স্টিলের হাতল এবং পায়ের বিশ্রামের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
কোচগুলোর কাঠামোতে স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। নকশা অনুযায়ী, এগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী। তবে এই সক্ষমতা থাকলেই বাংলাদেশের বিদ্যমান রেলপথে একই গতিতে চলবে—এমন নয়; বাস্তবে গতি নির্ভর করবে রেলপথের অবস্থা, অবকাঠামো, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিচালনসংক্রান্ত অনুমোদনের ওপর।
নিরাপত্তায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও সিসিটিভি
নতুন কোচগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার অভিঘাত মোকাবিলায় বিশেষ কাঠামোগত ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম এবং সিসিটিভি নজরদারির সুবিধা রয়েছে এসব কোচে।
এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব বায়ো-টয়লেটের পাশাপাশি ইলেকট্রো-নিউম্যাটিক চাপযুক্ত ফ্লাশিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এসব সুবিধা যাত্রীসেবা উন্নত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে সহায়ক হতে পারে। আধুনিক কোচগুলো রেলবহরে যুক্ত হলে যাত্রীদের আসন ও সেবার ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে এসি চেয়ার ও স্লিপার কার যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রীদের জন্য ভ্রমণের বিকল্প বাড়বে।
ঢাকা-পাবনা ও ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন ট্রেনের উদ্যোগ
নতুন কোচ সরবরাহের ভিত্তিতে ঢাকা-পাবনা ও ঢাকা-খুলনা ব্রডগেজ রুটে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে। তবে ট্রেন দুটির নাম, নির্দিষ্ট সময়সূচি, স্টপেজ এবং চালুর তারিখ এখনো নিশ্চিত নয়।
সম্প্রতি সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, একটি প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। কোচগুলো দেশে আসার পর নতুন ট্রেনের রুট নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
রেলওয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে পাবনা ও খুলনাগামী যাত্রীদের জন্য নতুন আন্তনগর সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার যাত্রীদের রাজধানীমুখী যাতায়াতের চাপ সামলাতে রেল যোগাযোগের সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
কোচ সংকটে নতুন রেলসেবা সম্প্রসারণে বাধা
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যমুনা সেতু-পাবনা, ঢাকা-পদ্মা সেতু এবং খুলনা-মোংলা রেলপথসহ বেশ কয়েকটি রেলপথ চালু হয়েছে। তবে ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব পথে প্রত্যাশা অনুযায়ী ট্রেন চালু করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রেলপথ তৈরি বা চালু হলেই সেখানে পর্যাপ্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজনীয় কোচ, লোকোমোটিভ, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা এবং কার্যকর সময়সূচিও নিশ্চিত করতে হয়। ফলে নতুন রেলপথের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত কোচের জোগান গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত থেকে চুক্তির আওতায় ২০০টি কোচ সরবরাহ সম্পন্ন হলে বিদ্যমান ব্রডগেজ কোচের সংকট কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ট্রেন চালু এবং যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে কোন রুটে কতটি কোচ বরাদ্দ করা হবে এবং নতুন ট্রেনগুলো কবে থেকে চলবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রেলওয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
রাইটসের সঙ্গে বাংলাদেশের আগের চুক্তিও রয়েছে
বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে রাইটসের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে ৩০টি এবং ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর আরও ১০টি ব্রডগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সরবরাহ করে। পরে ২০১৮ সালের ১ জুন সরবরাহ করা হয় ১২০টি এলএইচবি ব্রডগেজ কোচ। এসব লোকোমোটিভ ও কোচ ভারত সরকারের ঋণসহায়তার আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন ২০০ কোচ সরবরাহের প্রকল্পও দুই দেশের রেল খাতের সহযোগিতার ধারাবাহিক অংশ।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array