দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, বরিশালে যাত্রা শুরু মহিলা পলিটেকনিকে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বরিশালে যাত্রা শুরু করেছে বিভাগের প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রতিষ্ঠানে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে গত রোববার (১১ অক্টোবর)। শুরুতে আর্কিটেকচার টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি—এই দুটি বিভাগে পাঠদান কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রথম ব্যাচে ভর্তি হয়েছেন ৪৭ জন ছাত্রী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নারীদের জন্য বিশেষায়িত এই কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দক্ষিণাঞ্চলের মেয়েদের দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করবে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিই নেবেন না, ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
৫৫ কোটি টাকার প্রকল্পে আধুনিক ক্যাম্পাস
বরিশাল নগরীর আলেকান্দায় পরেশ সাগর মাঠের প্রবেশদ্বারের উত্তর পাশে ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠেছে সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটটি। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশপথ, ছয়তলা প্রশাসনিক ভবন, উত্তর পাশে ছয়তলা অ্যাকাডেমিক ভবন এবং দক্ষিণ পাশে ছয়তলা অ্যাকাডেমিক ওয়ার্কশপ ভবন। ভবন তিনটিতেই লিফটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে চারতলা বিশিষ্ট ২০০ আসনের ছাত্রীনিবাস। শিক্ষকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচতলা বিশিষ্ট ২০ ইউনিটের ডরমেটরি। পাশাপাশি রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট ছয় ইউনিটের স্টাফ কোয়ার্টার এবং একতলা অধ্যক্ষের বাসভবন।
ক্যাম্পাসে নিজস্ব বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও অভ্যন্তরীণ সড়কব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো ও আবাসিক সুবিধার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুটি বিভাগে ১০০ আসন, প্রথম ব্যাচে ৪৭ ছাত্রী
বর্তমানে ইনস্টিটিউটটিতে দুটি বিভাগে পাঠদান চলছে—আর্কিটেকচার টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। দুই বিভাগ মিলিয়ে মোট আসনসংখ্যা ১০০টি। প্রথম ব্যাচে ৪৭ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম পর্যায়ে রয়েছেন ১১ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে অধ্যক্ষ, ইন্সট্রাক্টর, সহকারী ইন্সট্রাক্টর ও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পাশাপাশি রয়েছেন ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
কারিগরি শিক্ষার এ দুটি শাখায় শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে স্থাপত্যবিষয়ক প্রযুক্তিগত কাজ এবং কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ ধরনের শিক্ষা নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথ আরও প্রসারিত করবে।
আগামী শিক্ষাবর্ষে আরও দুটি কোর্স চালুর পরিকল্পনা
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ এস এম সামচুন নাহার। তিনি জানান, অ্যাকাডেমিক ওয়ার্কশপ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও শহিদ মিনারের নির্মাণকাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ইতোমধ্যে পৌঁছেছে।
তিনি আরও জানান, আগামী ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে দুটি কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আরও ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবেন।
প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আরও বেশি ছাত্রী কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের জন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ
এস এম সামচুন নাহার বলেন, বর্তমান সরকার নারীমুখী ও শিক্ষাবান্ধব। কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।
কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় অ্যাকাডেমিক ভবনের পাশাপাশি ওয়ার্কশপ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং আধুনিক অবকাঠামোর ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে কার্যকর করতে নিয়মিত পাঠদান, পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব ও ওয়ার্কশপের ব্যবহার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্মাণকাজ শেষ হবে ডিসেম্বরের মধ্যে
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম জানান, বিভাগের মধ্যে এই প্রথম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মিত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় ছয়টি বহুতল ভবন, একটি একতলা ভবন, শহিদ মিনার, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ড্রেন, দুটি অত্যাধুনিক প্রবেশগেট এবং বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
অবকাঠামোগত কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা সম্পূর্ণভাবে চালু হলে কারিগরি শিক্ষার ব্যবহারিক দিক আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে উচ্ছ্বসিত ছাত্রীরা
নতুন এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পেরে আনন্দিত শিক্ষার্থীরা। আর্কিটেকচার টেকনোলজি বিভাগে ভর্তি হওয়া বানারীপাড়ার শিক্ষার্থী আয়শা আক্তার বলেন, ক্যাম্পাসের মনোরম পরিবেশ এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মরিয়মের বাড়ি বাউফলে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের পর থেকেই তাঁর মধ্যে অন্যরকম আনন্দ ও উচ্ছ্বাস কাজ করছে।
শিক্ষার্থীদের এ প্রত্যাশা পূরণে মানসম্মত পাঠদান, প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব
শিক্ষাবিদ মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির তুলনায় এ ধরনের শিক্ষায় সরাসরি কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকে।
তিনি মনে করেন, কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নারীরা শুধু চাকরিই করতে পারবেন না; সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। তাঁদের উদ্যোগের মাধ্যমে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
মহসিন উল ইসলাম হাবুলের মতে, বৈষম্যহীন ও উন্নত দেশ গড়তে নারীদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা সময়ের দাবি।
দক্ষিণাঞ্চলের মেয়েদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
বরিশালে বিভাগের প্রথম সরকারি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মেয়েদের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষায়িত এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষার মান, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার এবং কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগের ওপর। পাশাপাশি নতুন কোর্স চালু ও আসনসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আরও বেশি ছাত্রী উপকৃত হতে পারেন।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array