খুঁজুন
                               
, ,
           

সাজেকে ‘ফুল বুকিং’ রিসোর্ট এখন সুনশান, ১৫ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৩ অপরাহ্ণ
সাজেকে ‘ফুল বুকিং’ রিসোর্ট এখন সুনশান, ১৫ কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠার কথা ছিল রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। আগাম বুকিংয়ে পূর্ণ ছিল কটেজ ও রিসোর্টের প্রায় সব কক্ষ। পরিবহণের ব্যবস্থাও করেছিলেন পর্যটকেরা। কিন্তু আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় পাল্টে গেছে পুরো চিত্র। পর্যটকদের আনাগোনার বদলে রিসোর্ট-কটেজে নেমেছে নীরবতা। এতে দুর্গাপূজার মৌসুমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৪ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটকের ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল। সাজেক বন্ধের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে পর্যটন খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

আগাম বুকিং শেষ, তবু পর্যটক নেই

সাজেক কটেজ-রিসোর্ট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেববর্মন জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটি থাকায় ১৪ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজগুলোর সব কক্ষ আগাম বুকিং দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থাও আগেই করা হয়েছিল।

কিন্তু পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় এসব বুকিং ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যবসায়িক প্রত্যাশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। রিসোর্ট-কটেজের মালিকদের পাশাপাশি পরিবহণসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্য ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন।

সুপর্ণ দেববর্মনের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। দুর্গাপূজার মতো ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে এমন পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দিয়েছে।

কেন বন্ধ হলো সাজেক পর্যটনকেন্দ্র

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের জেরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত রোববার, ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ ঘোষণা দেন।

গণবিজ্ঞপ্তিতে ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্দেশিত সময়ের এক দিন আগেই, ১২ অক্টোবর সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করেন।

প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের পেছনে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা এবং সড়কে অবরোধের কারণে পর্যটকদের স্বাভাবিক যাতায়াতও ব্যাহত হয়।

আঞ্চলিক সংঘাত ও সড়ক অবরোধে ভোগান্তি

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাস ধরে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এবং প্রসীত খীসার সমর্থিত ইউপিডিএফের অস্ত্রধারীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে।

এ পরিস্থিতিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠন ওই এলাকা থেকে জেএসএসের অস্ত্রধারীদের বিতাড়নের দাবিতে গত রোববার ভোর ৬টা থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকেরা।

পরে ওই দিন বিকেল ৩টা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার পর দুই দিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এরপর সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

‘প্রতি বছর বুকিং থাকে, সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হই’

ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য উজ্জ্বল দেব বলেন, দুর্গাপূজার মৌসুমে গত দুই থেকে তিন বছর ধরে তাঁদের কটেজ ও রিসোর্টের সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে যায়। কিন্তু এ সময় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।

তিনি পর্যটন ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।

ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটন মৌসুমে আগাম বুকিংয়ের ওপর নির্ভর করে রিসোর্ট ও কটেজ পরিচালনার বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পর্যটকেরা না এলে কক্ষ ভাড়া থেকে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহণ, খাবার, স্থানীয় দোকানপাট এবং অন্যান্য সেবার ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু রিসোর্ট মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।

নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ, কঠোর অভিযানের ঘোষণা

সোমবার খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক বলেন, অবৈধ অস্ত্রধারীদের অপতৎপরতায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এসব অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক করার দাবি জানাচ্ছেন।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন

সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

বুধবার সকালে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। দাবি পূরণ না হলে খাগড়াছড়িতে টানা হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণাও আসে। পরে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দুই আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের জেরে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। তাঁদের দাবি, দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে রিসোর্ট-কটেজে আগাম বুকিং থাকা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকেরা যেতে না পারলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে।

পর্যটন ও নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয়ের দাবি

সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ভ্রমণের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ ছুটির মৌসুমে পর্যটক আসতে না পারলে রিসোর্ট-কটেজের পাশাপাশি পরিবহণ, খাবার ও অন্যান্য স্থানীয় ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পর্যটনকেন্দ্র চালু করা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাই পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উদ্যোগের ওপরই নির্ভর করছে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

কৃষিকে লাভজনক করতে হবে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের তাগিদ রাষ্ট্রপতির

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ণ
কৃষিকে লাভজনক করতে হবে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের তাগিদ রাষ্ট্রপতির

কৃষিকাজ করে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেক শ্রমিক এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কৃষকের আয় বাড়ানো, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শনকালে এক মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, কৃষকদের প্রণোদনা বৃদ্ধি, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট উঠে আসে—উৎপাদন বাড়লেও কৃষক সব সময় তার ন্যায্য আর্থিক সুফল পাচ্ছেন না। যথাযথ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে একদিকে কৃষক লোকসানে পড়ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক

রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

উত্তরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকেরা আলুর ন্যায্যমূল্য পান না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কোনো কোনো কৃষক আলু রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হন। অথচ পরবর্তী সময়ে বীজ আলুর দাম বেড়ে যায়। আবার উৎপাদনস্থল থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর আলুর দাম অনেক বেড়ে যায়।

আলুর ক্ষেত্রে দেখা দেওয়া এ সমস্যার মতো অন্যান্য সবজির বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। উৎপাদন ও ভোগের মধ্যবর্তী পর্যায়ে সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের ঘাটতি দূর করা না গেলে কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির তাগিদ

কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, শুধু আলু নয়, টমেটোসহ অন্যান্য সবজি ও ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী হিমাগার এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন।

কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে উৎপাদনের মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকেরা তাড়াহুড়া করে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি থেকেও কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে কৃষিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের অপচয় কমানো ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

পেঁয়াজ উৎপাদনে গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা

দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষি গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, একসময় পেঁয়াজ আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হতো। বর্তমানে আমদানির প্রয়োজন না হওয়ার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।

কৃষি গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, কৃষির উন্নয়ন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; উৎপাদিত পণ্যকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারযোগ্য করা এবং কৃষকের আর্থিক লাভ নিশ্চিত করাও জরুরি।

কৃষি গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো, উপযোগী জাতের সম্প্রসারণ এবং উৎপাদিত ফসলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।

অতিরিক্ত রাসায়নিক সারে মাটির ক্ষতির আশঙ্কা

কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অতিরিক্ত সার মাটির ক্ষতি করে এবং ফসলের গুণগত মান নষ্ট করে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য কৃষকদের উপযুক্ত পরামর্শ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগের বিষয়ে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান

কৃষি গবেষণার অগ্রগতি ধরে রাখতে বিজ্ঞানীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কৃষি বিজ্ঞানীরা যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না পেলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।

এ সময় কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশন-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে কৃষিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতির মতে, কৃষি গবেষণায় দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের এ খাতে যুক্ত করতে বিজ্ঞানীদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে কৃষি বিজ্ঞানীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন ও গবেষকদের প্রণোদনা নিশ্চিত করার বিষয়টি কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

কৃষি উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ স্মরণ

রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি ও উচ্চফলনশীল ধানের বীজ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি খাতে পরিবর্তন এনেছিলেন।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি এবং আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনা করেন।

বারি পরিদর্শন, গার্ড অব অনার ও চারা রোপণ

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

পরে তিনি বারির জিন ব্যাংক ও বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্রের (পিজিআরসি) প্রাঙ্গণে বারি কাঁঠাল-৬ জাতের একটি চারা রোপণ করেন। অনুষ্ঠানে বারির মহাপরিচালক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য দেন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বারির মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল কাদির এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম।

সূত্র: বাসস

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে প্রাণ গেল ২৭ শিশুর, আহত ১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৩ অপরাহ্ণ
পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে প্রাণ গেল ২৭ শিশুর, আহত ১৯
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ার শহরে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৭ জন শিক্ষার্থী ও একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৯ জন। দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ডন-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে এ ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

আফ্রিদি আবাদে স্কুল ভবন ধস, শ্রেণিকক্ষে ছিল শিক্ষার্থীরা

পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় অবস্থিত আল খায়ের নামের বেসরকারি স্কুলটির ছাদ ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির সংবাদমাধ্যম ডনকে জানান, ছাদ ধসে পড়ার সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করছিল। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছান। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শিক্ষার্থী ও অন্যদের উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

৪০ জনকে উদ্ধার, অভিযান চলছে

উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফাইজি জানান, এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি জীবিতদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম ডনকে জানান, এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ হয়েছে। আহত ১৯ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

তিন মেয়েশিশুকে উদ্ধার করেন এক অভিভাবক

দুর্ঘটনার পর সন্তানদের খোঁজে স্কুলে ছুটে যান অভিভাবকেরা। তাঁদেরই একজন সামিউল্লাহ। ডনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, স্কুলের ছাদ ধসের খবর পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে আট বছরের কম বয়সী তিনটি মেয়েশিশুকে উদ্ধার করেন তিনি।

সামিউল্লাহ বলেন, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে তিনি বাড়ি থেকে ফোন পান। এর প্রায় ১০ মিনিট পর, সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁর ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ে।

স্কুল ভবনের অবস্থা দেখে নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথাও জানান তিনি। সামিউল্লাহ বলেন, ‘ভবনটি দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমার ছেলেও মারা গেছে।’

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে স্বজনদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

ছাদধসের কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি দুর্ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন এবং কী কারণে স্কুলটির ছাদ ধসে পড়েছে, তা খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

পাশাপাশি আহত শিশুদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে তাঁদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের পাশাপাশি ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

শিশুদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ইসহাক দারের

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

ইসহাক দার বলেন, ‘আমাদের সন্তানেরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের এমন প্রতিটি মৃত্যু পুরো দেশের জন্যই এক দুঃখজনক ঘটনা।’

তিনি আরও বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা, আহতদের উন্নত চিকিৎসা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

স্কুল ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

পেশোয়ারের এ দুর্ঘটনায় একসঙ্গে এত শিক্ষার্থীর প্রাণহানি পাকিস্তানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্কুল ভবনের নির্মাণমান, ছাদের স্থায়িত্ব, নিয়মিত পরিদর্শন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

তবে স্কুলটির ছাদ ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে, সে বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো জানা যায়নি। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এবং দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

কালের আলো/জেএন/এসএ

একসময় অফিস-আদালতের প্রাণ, আজ বিলুপ্তির পথে টাইপরাইটার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৭ অপরাহ্ণ
একসময় অফিস-আদালতের প্রাণ, আজ বিলুপ্তির পথে টাইপরাইটার

একসময় আদালত প্রাঙ্গণ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—প্রায় সর্বত্রই ছিল টাইপরাইটারের কদর। ছোট ছোট আঙুলের চাপে একের পর এক অক্ষর ফুটে উঠত কাগজে। চারপাশে শোনা যেত যন্ত্রটির চিরচেনা ‘খটখট’ শব্দ। মামলার আর্জি, হলফনামা, চুক্তিনামা, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরিতে টাইপরাইটার ছিল অপরিহার্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, কম্পিউটারের বিস্তার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতিতে একসময়ের জনপ্রিয় এই যন্ত্র এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

জেলা ও উপজেলা শহরের আদালতপাড়া কিংবা অফিস-আদালতের আশপাশে ঘুরলেও আগের মতো টাইপরাইটার নিয়ে বসে থাকা টাইপিস্টদের দেখা মেলে না। যন্ত্রটির সেই পরিচিত শব্দও এখন অনেকটাই অতীত। একসময় যে টাইপরাইটার ছিল বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন, আজ তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে ঠাঁই নিচ্ছে স্মৃতিতে।

তবে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের কিছু স্মারক এখনো টিকে আছে। মৌলভীবাজারের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ নামের একটি আগর-আতর কোম্পানিতে যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি প্রাচীন টাইপরাইটার। বর্তমানে এটি দিয়ে কোনো কাজ করা হয় না। প্রতিষ্ঠানের শোভা বাড়ানোর পাশাপাশি অতীতের প্রযুক্তি ও কর্মজীবনের স্মৃতি ধরে রাখতেই যন্ত্রটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

টাইপরাইটারের উত্থান, বদলে গেল লেখার জগৎ

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৬৮ সালে মার্কিন উদ্ভাবক ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস টাইপরাইটারের নকশা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর পাঁচ বছর পর, ১৮৭৩ সালে রেমিংটন অ্যান্ড সন্সের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে টাইপরাইটার বাজারজাত শুরু হয়। পরে ব্রিটিশদের হাত ধরে ১৮৯০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে টাইপরাইটারের প্রচলন ঘটে বলে জানা যায়।

ক্রমে এই যন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। দাপ্তরিক চিঠিপত্র, আবেদন, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং নানা ধরনের দলিল তৈরি করতে টাইপরাইটার হয়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। হাতে লেখার তুলনায় দ্রুত ও গোছানোভাবে নথি প্রস্তুত করার সুবিধার কারণে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে।

বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর বড় একটি সময়জুড়ে টাইপরাইটার ছিল দাপ্তরিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টাইপিস্ট ও সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত ব্যক্তিরা এই যন্ত্রের সাহায্যে নথিপত্র প্রস্তুত করতেন। দক্ষ টাইপিস্টদের চাহিদাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু আশির দশকের পর থেকে কম্পিউটার ও আধুনিক লেখালেখির প্রযুক্তির প্রসারে টাইপরাইটারের ব্যবহার ক্রমে কমতে থাকে। কম্পিউটারে লেখা সংশোধন, সংরক্ষণ, পুনর্মুদ্রণ এবং দ্রুত নথি তৈরি করার সুবিধা থাকায় দাপ্তরিক কাজের ধরন বদলে যায়। একসময় যে যন্ত্র ছাড়া অফিসের কাজ কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে।

আদালতপাড়ায় টাইপরাইটারেই চলত সংসার

মৌলভীবাজার আদালতের পাশে দীর্ঘদিন টাইপরাইটার দিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন কনকপুর ইউনিয়নের অজিত দাশ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই প্রবীণ টাইপিস্টের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাইপরাইটারকেন্দ্রিক কর্মজগতের দীর্ঘ স্মৃতি।

অজিত দাশ জানান, স্বাধীনতার আগ থেকেই আদালতের পাশে একটি ছোট টেবিল ও টুল নিয়ে বসতেন তিনি। নিজের টাইপরাইটারে লিখতেন মামলার আর্জি, হলফনামা, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ, চুক্তিনামাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় আদালতে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা এখনকার তুলনায় কম থাকলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি মামলার আর্জি ও অন্যান্য নথি টাইপ করতেন তিনি। তাঁদের পরিবারের একটি টাইপরাইটারই ছিল জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় টাইপের কাজের পাশাপাশি মামলার আর্জি গুছিয়ে লেখার ক্ষেত্রেও দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন অজিত দাশ। তিনি জানান, অনেক সময় জুনিয়র আইনজীবীরা বাদীপক্ষের লোকজনকে তাঁর কাছে পাঠাতেন, যাতে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে মামলার আর্জি গুছিয়ে লিখে দিতে পারেন।

এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পেশার দক্ষতার গল্প নয়; এটি এমন এক সময়ের চিত্র, যখন আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমে টাইপিস্টদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হতো অসংখ্য নথি, যা আদালত ও মানুষের আইনি কার্যক্রমের অংশ হয়ে থাকত।

দুজন থেকে বেড়েছিল টাইপিস্টের সংখ্যা

অজিত দাশের স্মৃতিতে, তিনি যখন টাইপরাইটার নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন আদালতের পাশে এ পেশায় ছিলেন আর একজন। তাঁরা দুজন দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পরে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন এবং দাপ্তরিক কাজের পরিমাণও বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় আদালতপাড়ায় টাইপরাইটার ও টাইপিস্টের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

সরকারি বিভিন্ন অফিসে টাইপরাইটার ছিল নিয়মিত কাজের অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে সাঁটমুদ্রাক্ষরিকেরা টাইপরাইটারে চিঠিপত্র, প্রতিবেদন, আদেশ ও অন্যান্য দাপ্তরিক নথি তৈরি করতেন। দ্রুত ও নির্ভুলভাবে টাইপ করতে পারা ছিল তাঁদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

কিন্তু কম্পিউটার চালু হওয়ার পর সেই কর্মপরিবেশ বদলে যায়। এখনো বিভিন্ন দপ্তরে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা থাকলেও তাঁদের কাজের ধরন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। টাইপরাইটারের জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা।

অজিত দাশের মতো প্রবীণ টাইপিস্টদের কাছে তাই টাইপরাইটার কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি তাঁদের কর্মজীবন, পারিবারিক জীবিকা এবং সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী।

মৌলভীবাজারে স্মৃতি হয়ে টিকে আছে প্রাচীন টাইপরাইটার

প্রযুক্তির বিবর্তনে টাইপরাইটারের ব্যবহার কমে গেলেও মৌলভীবাজারের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ কোম্পানিতে একটি প্রাচীন টাইপরাইটার এখনো যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি আর দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হয় না। বরং অতীতের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার স্মারক হিসেবে রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে।

‘আগর ফ্রেগরেন্স’-এর সঙ্গে যুক্ত শামীম আক্তার হোসেন জানান, তাঁদের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু সব সময় প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে আগ্রহী। সেই ধারাবাহিকতায় টাইপরাইটারটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, মৌলভীবাজারের কার্যালয়ে সংরক্ষিত টাইপরাইটারটি এখনো চকচকে এবং দেখতে অনেকটা নতুনের মতো। নতুন প্রজন্মের অনেকে যন্ত্রটি দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হন। অন্যদিকে, প্রবীণেরা এটি দেখে অতীতের কর্মজীবন ও স্মৃতিচারণ করেন।

শামীম আক্তার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগর ফ্রেগরেন্সের কার্যালয়ে আসা অনেক দর্শনার্থী তাঁদের মুঠোফোনে টাইপরাইটারটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। এভাবেই একসময়ের বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তির একটি নিদর্শন নতুন প্রজন্মের সামনে অতীতের গল্প তুলে ধরছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি, হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্কৃতি

টাইপরাইটারের বিলুপ্তির পথে যাত্রা মূলত প্রযুক্তির পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। কম্পিউটার লেখালেখিকে করেছে দ্রুততর, সম্পাদনাযোগ্য ও সহজে সংরক্ষণযোগ্য। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার নথি তৈরি এবং আদান-প্রদানের পদ্ধতিকেও বদলে দিয়েছে।

তবে প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিচিত কর্মসংস্কৃতি। টাইপিস্টের টেবিল, কাগজ সাজিয়ে রাখা, কার্বন কপি তৈরি, টাইপের ভুল সংশোধনের জন্য বিশেষ কৌশল—এসবই এখন অনেকের কাছে অতীতের স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বাস্তবে টাইপরাইটারে লেখা দেখেনি; তাদের কাছে যন্ত্রটি এখন কৌতূহলের বিষয়।

একসময় আদালতপাড়া ও অফিসের পরিচিত দৃশ্য ছিল টাইপরাইটার নিয়ে বসে থাকা কর্মীদের ব্যস্ততা। আজ সেই দৃশ্য বিরল। কোথাও পুরোনো যন্ত্র পড়ে আছে, কোথাও তা সংগ্রহে রাখা হয়েছে স্মারক হিসেবে। আর অজিত দাশের মতো প্রবীণদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে সেই সময়, যখন একটি টাইপরাইটারই ছিল সংসার চালানোর ভরসা।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি