দুর্গাপূজার আগে নারিকেলের দামে আগুন, জোড়ায় বেড়েছে ১০০ টাকা
শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম অনুষঙ্গ নারিকেল। পূজার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে নারিকেলের নাড়ু তৈরি—সব ক্ষেত্রেই ফলটির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। কিন্তু এবার উৎসবের আনন্দের মধ্যেই নারিকেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রংপুর বিভাগের ক্রেতা ও পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর জন্য। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় নারিকেল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে মণ্ডপের নির্ধারিত আয়োজন বজায় রাখতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে পূজা কমিটিগুলোকে।
বাজারে বর্তমানে এক জোড়া নারিকেল কিনতে গুনতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। অথচ সেপ্টেম্বরের শুরুতেও একই পরিমাণ নারিকেল বিক্রি হয়েছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়। গত বছরের একই সময়ে জোড়াপ্রতি দাম ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি জোড়ায় দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
রংপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে নারিকেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যে নারিকেলের জোড়া ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এমন মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা।
রংপুর প্রেসক্লাব এলাকার পাদুকা ব্যবসায়ী সুকুমার রায় বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার নারিকেলের দাম অনেক বেশি। দুই সপ্তাহ আগেও দাম কম ছিল। দুর্গাপূজায় নারিকেলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেও এখন বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।’
ক্রেতাদের ভাষ্য, পূজার জন্য নারিকেল কেনা অনেক পরিবারের নিয়মিত প্রস্তুতির অংশ। কিন্তু অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি নারিকেলের বাড়তি দাম সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একসঙ্গে একাধিক নারিকেল কিনতে হলে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলায় এ বছর ৫ হাজার ৩৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে উৎসব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মণ্ডপে গড়ে ৮০ থেকে ১০০টি বা তারও বেশি নারিকেল প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি পূজা উপলক্ষে অনেক পরিবার ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত নারিকেল কেনে।
ফলে উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারে নারিকেলের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু সেই চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে দামের ওপর চাপ তৈরি হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারিকেলের চাহিদা শুধু পূজার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নারিকেলের নাড়ু তৈরি এবং অতিথি আপ্যায়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এ কারণে পূজার সময় নারিকেল কেনা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ অনেক পরিবারের জন্য সীমিত।
ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে নারিকেলের উৎপাদন কম হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফলটি সংগ্রহ করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পাইকারি বাজারে বেশি দামে নারিকেল কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও দাম কমিয়ে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার সিংহ বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নারিকেলগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। নারিকেল কিনতে গিয়ে এবার মাথায় হাত পড়েছে। দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নারিকেল ছাড়া নাড়ু তৈরি করা যায় না, তাই বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে।’
তিনি এ সময় সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানান।
রংপুরের বড়বাড়ি হাটের ব্যবসায়ী মোবারক আলী বলেন, ‘নারিকেলের উৎপাদন খুবই কম। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নারিকেল আনতে হয়। এবার পরিবহন খরচও বেড়েছে, পাইকারি বাজারেও দাম বেশি। আমরা প্রতি জোড়া নারিকেলে ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ করি। মাঝেমধ্যে পচা নারিকেলও পাওয়া যায়। বেশি দামে কিনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় এবং পাইকারি বাজারের মূল্য—সব মিলিয়ে খুচরা বাজারে নারিকেলের দাম বাড়ছে। তবে দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রতিটি কারণের প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণ করতে উৎপাদন ও সরবরাহের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন।
কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর হাটের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় নারিকেলগাছ কম, ফলনও তেমন হয় না। পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারেও দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। এতে ক্রেতারা আগের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন।’
ব্যবসায়ীদের এ বক্তব্যে স্থানীয় উৎপাদন ও বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উঠে এসেছে। যেসব এলাকায় নারিকেলের ফলন কম, সেখানে অন্য অঞ্চল থেকে পণ্য আনতে হয়। পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব খুচরা দামের ওপরও পড়ে।
অন্যদিকে বেশি দামে কেনার কারণে ক্রেতারা প্রয়োজনের তুলনায় কম নারিকেল কিনছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে সাধারণ পরিবারের পূজার প্রস্তুতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধানও বাড়ছে।
নারিকেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে পূজামণ্ডপগুলোর বাজেটে। পারিবারিক আয়োজনে প্রয়োজন অনুযায়ী নারিকেলের পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী মণ্ডপের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কমানোর সুযোগ সীমিত। ফলে দাম বাড়লেও নির্ধারিত পরিমাণ নারিকেল কিনতে হচ্ছে পূজা কমিটিগুলোকে।
রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়া দুর্গামন্দিরের কোষাধ্যক্ষ অশোক সরকার বলেন, ‘এ বছর নারিকেলসহ পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আয়োজনের খরচ অনেক বেড়েছে। আমাদের মন্দিরে প্রতিবছর পূজার জন্য ১২০টি নারিকেল প্রয়োজন হয়। এবার প্রতি জোড়া ৩০০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে, যেখানে গত বছর দাম ছিল ২০০ টাকা।’
তিনি জানান, ১২০টি নারিকেল কিনতে এবার ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। গত বছর একই পরিমাণ নারিকেলের জন্য খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু নারিকেল কিনতেই মন্দিরটির অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার টাকা।
অশোক সরকারের ভাষ্য, ‘বাড়িতে ব্যবহারের জন্য নারিকেলের চাহিদা কিছুটা কমানো গেলেও মন্দিরের পূজায় তা সম্ভব নয়। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কিনতে হয়েছে।’
একটি মন্দিরের ক্ষেত্রেই নারিকেল কেনার খরচ ৬ হাজার টাকা বেড়েছে। একইভাবে বিভাগের হাজার হাজার মণ্ডপে পূজার উপকরণ কিনতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ি দুর্গা ও কালীমন্দিরের সভাপতি পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, দুর্গাপূজায় নির্দিষ্ট পরিমাণ নারিকেল ব্যবহার করতেই হয়। দাম যতই বাড়ুক, ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বছর নারিকেল কিনতেই মণ্ডপগুলোর বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
রংপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রামজীবন কুন্ডু বলেন, দুর্গাপূজায় নারিকেলের নাড়ুর বিশেষ কদর রয়েছে। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও নাড়ু খুঁজে থাকেন। তাই দাম বেশি হলেও মানুষ সাধ্যমতো নারিকেল কিনছেন। তবে নারিকেলের পাশাপাশি অন্যান্য পূজার উপকরণের দাম বাড়ায় মন্দির কমিটিগুলোকে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পূজা কমিটির সদস্যদের মতে, উৎসব আয়োজনের জন্য আগে থেকেই একটি বাজেট নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে গেলে সেই বাজেটের মধ্যে আয়োজন সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে একাধিক উপকরণের দাম একসঙ্গে বাড়লে বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, নারিকেলগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎসবকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ ও প্রতিটি কারণের প্রভাব নির্ধারণে উৎপাদন, সরবরাহ, পাইকারি মূল্য এবং বাজার তদারকির তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
উৎসবের মৌসুমে নারিকেলের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। তাঁদের প্রত্যাশা, বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহব্যবস্থার তথ্য যাচাই এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array