একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের প্রায় ৮ হাজার মানুষ। ডেবাছড়া এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কাঠের সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিকল্প পথ না থাকায় ভাঙাচোরা সেতু দিয়েই পারাপার হচ্ছেন কৃষক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এতে একদিকে যেমন কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি মায়েদের যাতায়াতেও তৈরি হচ্ছে বড় বাধা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর কাঠের সেতুটি মেরামত করতে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হলেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান মিলছে না। এ অবস্থায় ডেবাছড়া এলাকায় প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ একটি স্থায়ী স্টিল বা বেইলি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ভাঙাচোরা সেতুতে প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার
দক্ষিণ তক্তানালা থেকে রোয়াপাড়া ছড়ায় যাওয়ার পথে ডেবাছড়া এলাকায় পাড়াবাসীর উদ্যোগে নির্মিত কাঠের সেতুটি এখন ভগ্নদশায় পড়ে আছে। সেতুর বিভিন্ন স্থানের কাঠের তক্তা নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কাঠ ভেঙে গেছে, কোথাও আবার পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি ব্যবহার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সেতুটি পুরোপুরি ভেঙে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। কিন্তু বিকল্প রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এই সেতুর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পাঁচ গ্রামের মানুষকে।
স্থানীয় কৃষক ভুবনজয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, প্রতিদিন এই পথ দিয়ে শত শত মানুষ চলাচল করেন। এলাকার অনেকের ধানখেত ও বাগান সেতুর দুই পাশে রয়েছে। কিন্তু চলতি বছর সেতুটি সংস্কার না হওয়ায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প পথও নেই।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল পরিবহন করতে না পারলে এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে। সেতুটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়লে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর আয়-রোজগারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবছর মেরামতে ব্যয়, তবু মিলছে না স্থায়ী সমাধান
স্থানীয় বাসিন্দা ভারতচন্দ্র কার্বারী জানান, কয়েক বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে এখানে কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু কাঠের সেতু দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় প্রতিবছরই মেরামতের প্রয়োজন পড়ে। এ জন্য পাড়াবাসী পরিবারপ্রতি চাঁদা তুলে গাছ ও তক্তা কেনেন। সেতু মেরামতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
তবে চলতি বছর বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে এলাকার অনেকের ধানখেত, বাগান ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে স্থানীয় পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে। ফলে সেতুটি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভারতচন্দ্র কার্বারী বলেন, এই সেতু দিয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা কৃষিপণ্য মূল সড়কে নিয়ে যান। সেখান থেকে রাজস্থলী হয়ে বিভিন্ন শহরে পণ্য পরিবহন করা হয়। শুকনো মৌসুমে কলা, ফরাস শিম, বাদাম, আদা, হলুদ ও ঝাড়ু ফুলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এ পথে নেওয়া হয়। এসব পণ্যের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজার রয়েছে, কিছু পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হয়।
তাঁর ভাষ্য, সেতুটি শুধু কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি মায়েদের চলাচলে সেতুটি বড় ভূমিকা রাখে। তাই এটি ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়।
তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও নির্ভরশীল
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মনিলতা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তক্তানালা থেকে রোয়াপাড়া ছড়ায় যাওয়ার পথে সেতুটি থাকলেও এর ওপর নির্ভরশীল শুধু ওই এলাকার মানুষ নন। ফুঁছড়া, উলুছড়ি, মাইত কুমা পাড়া ও উত্তর পাড়ার বাসিন্দারাও নিয়মিত সেতুটি ব্যবহার করেন। কোনো কোনো সময় ওরাছড়ি ও ফারুয়া এলাকার মানুষও এ পথ দিয়ে চলাচল করেন।
সব মিলিয়ে পাঁচ গ্রামের প্রায় ৮ হাজার মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে সেতুটির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সেতুটি ব্যবহার করেন।
মনিলতা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে সেতুর নিচে পানির প্রবাহ বাড়ে। সে সময় ভাঙা সেতু দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে কেউ পানিতে পড়ে গেলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিকল্প পথ না থাকায় কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে শ্রমিক দিয়ে মালামাল পরিবহন করাও কঠিন।
তিনি আরও বলেন, এলাকায় একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে সরাসরি যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। সংযোগ সড়কের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে পাকা হয়েছে। তাই সেখানে একটি স্টিল বা পাকা সেতু নির্মাণ করা জরুরি।
২৫০ ফুট সেতু নির্মাণে প্রয়োজন বড় বরাদ্দ
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল চাকমা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ থেকে এখানে কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে এবং একাধিকবার মেরামতও করা হয়েছে। তবে সেতুটি দীর্ঘ হওয়ায় এখানে পাকা বা স্টিলের সেতু নির্মাণে বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।
তাঁর মতে, কাঠের সেতু বারবার মেরামত করার পরিবর্তে স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা গেলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি ডেবাছড়া এলাকায় স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে সীমান্ত সড়কের রোয়াপাড়া ছড়া থেকে তক্তানালা দক্ষিণ পাড়া পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও সহজ হবে।
বিলাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফরহাদ হোসেন বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সর্বোচ্চ ৫০ ফুট পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ডেবাছড়া এলাকায় প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ সেতু প্রয়োজন। এ কারণে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমেও সেখানে স্টিলের সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
বেইলি সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভি দাশ বলেন, প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ নতুন বেইলি সেতু নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ প্রয়োজন হবে এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে।
তবে স্থানীয়ভাবে কাঠের সেতুটি মেরামত করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিলাইছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম ফকির বলেন, উপজেলার যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কাঠের সেতু রয়েছে, যেগুলো বারবার মেরামত করতে হয়। এতে সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করতে ডেবাছড়া এলাকায় দ্রুত একটি বেইলি সেতু নির্মাণ জরুরি। এ জন্য তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের সুদৃষ্টি কামনা করেন। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থায়ী সেতুই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
ডেবাছড়ার কাঠের সেতুটি ঘিরে পাঁচ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ কেবল যাতায়াতের সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিপণ্য বাজারজাত করা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার বিষয়ও।
প্রতিবছর কাঠের সেতু মেরামতে অর্থ ব্যয় করেও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে সেখানে একটি স্টিল বা বেইলি সেতু নির্মাণ করা হোক। এতে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের অবসান ঘটার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন ও মানুষের দৈনন্দিন চলাচলও সহজ হবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array