এক দলের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, বারবার বহিষ্কার; পরে সেই দল ও নেতৃত্বের প্রকাশ্য সমালোচনা। এরপর নির্বাচনে নিজের মতো করে অবস্থান নেওয়া। সবশেষে যে দলকে একসময় সমালোচনা করেছেন, সেই জামায়াতে যোগদান। আর যোগ দেওয়ার পরও নতুন দলটির পক্ষ থেকেই বলা হলো—তিনি নেতা নন, প্রাথমিক সহযোগী সদস্য। মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের রাজনৈতিক জীবন যেন একাধিক বাঁকের সমষ্টি।
কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে দুবার সংসদ সদস্য হওয়া, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন এবং পরে পাঁচবার দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায়। ২০২২ সালে বিএনপি থেকে সর্বশেষ বহিষ্কারের পরও রাজনীতি থেকে দূরে থাকেননি। বরং প্রকাশ্য বক্তব্য, টকশো ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দিয়েছেন। এখন বিমানবন্দরের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সেই রাজনৈতিক অতীতই নতুন করে সামনে এসেছে।
- বিএনপির সাবেক এমপি আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক পথচলায় বারবার বাঁক
- জামায়াত বলছে, তিনি নেতা নন, প্রাথমিক সহযোগী সদস্য
- গ্রেপ্তারের পর পুরোনো রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোও সামনে
যে দল থেকে পাঁচবার বহিষ্কার
আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক উত্থান বিএনপিকে ঘিরেই। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরপর দুবার সংসদ সদস্য হন তিনি। একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
কিন্তু দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো স্থায়ীভাবে মসৃণ ছিল না। দলীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিরোধের জেরে বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন। ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। বহিষ্কারের পরও নিজেকে বিএনপির রাজনীতির বাইরে ভাবেননি—এমন বক্তব্যও তাঁর কাছ থেকে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক পরিচয় আর ধরে রাখেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর গন্তব্য হয় জামায়াতে ইসলামী।
যে জামায়াতকে সমালোচনা, সেখানেই যোগ
আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক আসে জামায়াতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। একসময় জামায়াতের সমালোচনা করা এই মুক্তিযোদ্ধা পরে দলটির প্রাথমিক সহযোগী সদস্যের ফরম পূরণ করে সংগঠনটিতে যোগ দেন। জামায়াতে যোগ দেওয়ার ব্যাখ্যাও তিনি নিজেই দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিএনপির নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর মতের মিল নেই; সেই অবস্থানের প্রতিবাদেই তিনি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জামায়াতকে ‘দেশপ্রেমিক’ দল হিসেবে বর্ণনা করেন।
ফলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে পুরোনো বক্তব্যের তুলনা সামনে আসে। একই ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানে এমন পরিবর্তন কেন—এ প্রশ্ন ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়। তবে তাঁর নিজের ব্যাখ্যায়, এটি ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
এবার জামায়াতের কাছেই পরিচয় পরিষ্কার
সাম্প্রতিক ঘটনায় আখতারুজ্জামানের পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে জামায়াতের ভেতর থেকেই। গত ৩ অক্টোবর দলটির নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন; তিনি দলের প্রাথমিক সহযোগী সদস্য। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর আখতারুজ্জামান জামায়াতে যোগ দিয়ে প্রাথমিক সহযোগী সদস্যের ফরম পূরণ করেন।
জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ের সদস্য থেকে পরবর্তী ধাপে কর্মী, সদস্য এবং এরপর নেতৃত্বের পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান আজহারুল ইসলাম। অর্থাৎ সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জেলা সভাপতির যে রাজনৈতিক পরিচয় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিল, জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোয় তাঁর বর্তমান অবস্থান সেই পর্যায়ের নয়।
বিমানবন্দরের ঘটনা: নতুন বিতর্কের কেন্দ্র
এর মধ্যেই গত ১ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মদিনা থেকে আসা ওমরাহযাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা যায়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, হুমকি ও নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
গত শনিবার আদালতে নেওয়ার সময়ও নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর আগে মাথায় পরানো হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেন। সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে নিজের অবস্থানও জানান। পরে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল।
অবস্থানের ধারাবাহিক পরিবর্তন?
আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক জীবনকে শুধু দলবদলের তালিকা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। তাঁর ক্ষেত্রে বারবার দেখা গেছে—দলের সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেই মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়েছে। বিএনপিতে তিনি ছিলেন সংসদ সদস্য ও জেলা সভাপতি। একই দল থেকে পাঁচবার বহিষ্কৃতও হয়েছেন। বিএনপি ছাড়ার পর নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন। পরে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। আবার সেই জামায়াতই এখন তাঁর সাংগঠনিক পরিচয়কে ‘নেতা’ হিসেবে স্বীকার করছে না। এখানেই তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে।
সামনে এখন কোন পরিচয়?
আখতারুজ্জামানের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাসকে আবারও জাতীয় আলোচনায় এনেছে। কিন্তু ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য শুধু মামলায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর দীর্ঘ দলীয় ইতিহাস, একাধিকবার বহিষ্কার, প্রকাশ্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং সর্বশেষ জামায়াতে যোগদানের পর দলটির পক্ষ থেকে নিজের সাংগঠনিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার বিষয়টি।
একসময় যিনি সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন, এখন তাঁর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ও দলীয়ভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে—প্রাথমিক সহযোগী সদস্য। অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়, বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক আইনি জটিলতা—এই তিনটি বাস্তবতা এখন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। ফলে আখতারুজ্জামানের সামনে প্রশ্নটি শুধু কোন দলে আছেন, তা নয়; নতুন দলে তাঁর ভূমিকা কতটা এবং সেই পরিচয় তিনি কীভাবে প্রতিষ্ঠা করেন, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/এএএন/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array