বিমানে পরিবর্তনের হাওয়া, লক্ষ্য আরও কার্যকর সেবা
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। একসঙ্গে ১০ জন জ্যেষ্ঠ ও উপ-মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে বদলি, সংযুক্তি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাটির পরিচালন কাঠামোয় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাহকসেবা, জনসংযোগ, প্রশাসন-মানবসম্পদ, কার্গো এবং করপোরেট পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনকে সেবার মানোন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের পার্সোনেল শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে এসব পরিবর্তন আনা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
- গ্রাহকসেবা-জনসংযোগে শাহনুর, এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসে মহিউদ্দিন
- প্রশাসন-মানবসম্পদসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পুনর্গঠন
- সেবার মানোন্নয়ন ও পরিচালন দক্ষতায় জোর
একই নেতৃত্বে গ্রাহকসেবা ও জনসংযোগ
রদবদনের কেন্দ্রে রয়েছেন এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসের মহাব্যবস্থাপক শাহনুর আহমেদ। তাকে মহাব্যবস্থাপক (গ্রাহক সেবা) পদে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে তাকে। গুরুত্বপূর্ণ এই অতিরিক্ত দায়িত্বের সঙ্গে রয়েছে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা।
বিমানের ব্যবস্থাপনায় এই সিদ্ধান্তের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ যাত্রীসেবা ও জনসংযোগ—দুটি বিভাগই সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি এবং যাত্রী-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। একজন কর্মকর্তার অধীনে দুটি দায়িত্ব থাকায় যাত্রীদের অভিযোগ, সেবার ঘাটতি, গণমাধ্যমে উঠে আসা বিষয় এবং ব্যবস্থাপনার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, এতদিন মহাব্যবস্থাপক (গ্রাহক সেবা) এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মহিউদ্দিন আহমেদকে মহাব্যবস্থাপক (এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস) পদে বদলি করা হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও অপারেশনাল কার্যক্রমে তার অভিজ্ঞতাকে নতুন দায়িত্বে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হলো।
রদবদলের কেন্দ্রে সেবার গতি
বিমানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় এবারের পরিবর্তনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু পদ শূন্য পূরণ নয়, একাধিক বিভাগের দায়িত্বকে নতুনভাবে সাজানো। এতে কোথাও নেতৃত্ব একীভূত করা হয়েছে, কোথাও আবার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন জায়গায় পাঠানো হয়েছে।
নতুন দায়িত্ব সম্পর্কে শাহনুর আহমেদ বলেছেন, জনসংযোগ ও গ্রাহকসেবাকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয়কে গুরুত্ব দেবেন তিনি। তার এই অবস্থানকে বিমানের সেবার দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং তা নিয়ে দ্রুত যোগাযোগের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
কারণ, একটি এয়ারলাইন্সের সেবার মান কেবল উড়োজাহাজ পরিচালনা বা সময়ানুবর্তিতায় নির্ধারিত হয় না। টিকিট, চেক-ইন, বোর্ডিং, লাগেজ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং তথ্যপ্রাপ্তি—প্রতিটি ধাপ যাত্রীর সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ফলে এসব জায়গায় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসন-মানবসম্পদেও নতুন সমীকরণ
গ্রাহকসেবার পাশাপাশি প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। পোল্ট্রি কমপ্লেক্সের মহাব্যবস্থাপক এ.এইচ.এম. শফিউল বারীকে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) পদে বদলি করা হয়েছে। উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. জহুরুল আলমকে উপ-মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ উপ-মহাব্যবস্থাপক (পার্সোনেল) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংযুক্ত মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলামকে পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ)-এর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এই বিন্যাসে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পার্সোনেল কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বড় জনবল কাঠামোর প্রতিষ্ঠানে দ্রুত পদায়ন, দায়িত্ব নির্ধারণ ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে এ ধরনের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কার্গো ও পরিকল্পনায়ও বদলের ছাপ
বিমানের রাজস্ব ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্গো বিভাগেও নেতৃত্ব বদলেছে। স্টোর অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক ইকবাল আহমেদ আলিজাকে মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পার্সোনেল বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক খন্দকার বাকী উদ্দিন আহমেদকে মূল দায়িত্বের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক হিসেবে স্টোর অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
করপোরেট পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরেও এসেছে নতুন নেতৃত্ব। বোয়িং-৭৮৭-এর ক্যাপ্টেন শেখ আব্বাস হোসেনকে মূল দায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই পরিদপ্তরে উপ-মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এম. এম. আরিফুর রহমানকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএফসিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক এ জেড এম আরিফকে উপ-মহাব্যবস্থাপক (পোল্ট্রি কমপ্লেক্স) পদে বদলি করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংগঠিত করতে
বিমানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রমে গতি আনা, সেবার মান উন্নত করা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংগঠিত করতেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। দায়িত্বের ধরন বিশ্লেষণ করলেও একই লক্ষ্য সামনে আসে—গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নেতৃত্বকে আরও কার্যকর করা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ সহজ করা।
তবে বড় কোনো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় মাঠপর্যায়ের ফলাফলে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কত দ্রুত বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারেন, যাত্রীদের অভিযোগ ও সেবার ঘাটতি কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেন এবং পরিকল্পনাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারেন—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
বিশেষ করে গ্রাহকসেবা ও জনসংযোগে একই নেতৃত্বের অধীনে নতুন কাঠামোটি কার্যকর হলে যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে প্রশাসন-মানবসম্পদ, কার্গো ও পরিকল্পনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্ব দেওয়া হলে পরিচালন দক্ষতাতেও গতি আসতে পারে। এবারের রদবদল বিমানের জন্য নিছক প্রশাসনিক পদায়ন নয়; বরং সেবাকেন্দ্রিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার দিকে একটি নতুন সাংগঠনিক ছক।
কালের আলো/এমএইচ/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array