খুঁজুন
                               
, ,
           

তৃতীয় কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে সূচকের পতন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ণ
তৃতীয় কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে সূচকের পতন

সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও কমেছে।

ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিএসইতে প্রধান সূচক কমেছে ২০ পয়েন্ট

মঙ্গলবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪২৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে অন্য দুই সূচকও নিম্নমুখী ছিল।

শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৪ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৭৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

সূচকের পতনের দিনে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ অবশ্য বেড়েছে। এদিন শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট মিলিয়ে মোট ৫৬৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে যার পরিমাণ ছিল ৫৩৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে

মঙ্গলবার ডিএসইতে মোট ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৭৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ২৭০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর কমেছে। অপরিবর্তিত ছিল ৪১টির দর।

এদিন লেনদেনের শীর্ষে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, সায়হাম টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল, এপেক্স ফুডস, মালেক স্পিনিং, সোনালী লাইফ, ইভেন্সি টেক্সটাইল, সার্প ইন্ডাস্ট্রি, সেনা ইন্স্যুরেন্স ও একমি লিমিটেড।

সিএসইতেও সূচকের পতন

অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মঙ্গলবার সূচকের পতন হয়েছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৬২ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৫৫৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

এদিন সিএসইতে হাতবদল হওয়া ১৭৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৭টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ১১০টির দর কমেছে এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অপরিবর্তিত রয়েছে।

লেনদেনের দিক থেকেও সিএসইতে কিছুটা মন্দাভাব ছিল। মঙ্গলবার সেখানে শেয়ার ও ইউনিট মিলিয়ে ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন কমেছে প্রায় ১ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে মঙ্গলবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচক ছিল নিম্নমুখী। ডিএসইতে লেনদেন কিছুটা বাড়লেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমায় বাজারে বিক্রির চাপই তুলনামূলক বেশি ছিল।

তথ্যসূত্র: ডিএসই ও সিএসই

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

বিনোদনের জায়গা রেললাইন, শিবচরে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

মাদারীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
বিনোদনের জায়গা রেললাইন, শিবচরে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

বিকেল হলেই মাদারীপুরের শিবচরের রেললাইন ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ হাঁটছেন, কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছেন, আবার কেউ রেললাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়েও অনেকে আসছেন স্টেশন এলাকায়। নতুন রেলপথকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলে তৈরি হয়েছে বিনোদনের নতুন জায়গা। তবে আনন্দের এই ভ্রমণই অনেক সময় পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে।

রেললাইন চালুর পর শিবচরে ট্রেনে কাটা পড়ে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রেললাইনে ঘোরাঘুরি ও ছবি তুলতে গিয়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত শিবচর অংশে ট্রেনে কাটা পড়ে কমপক্ষে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের কেউ রেললাইন পার হতে গিয়ে, আবার কেউ আত্মহত্যার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।

শিবচরের পুলিয়া, মালিগ্রাম, সূর্যনগর ও পাঁচ্চর এলাকায় বিকেল হলেই রেললাইনের পাশে মানুষের জটলা দেখা যায়। সন্ধ্যার পর কোথাও কোথাও সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়। ট্রেন আসার সময় অনেকে সরে গেলেও কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। গত মাসেও সূর্যনগর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। রেল পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরেই এ এলাকায় রেল দুর্ঘটনায় অর্ধডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে শিবচরে রয়েছে পদ্মা ও শিবচর স্টেশন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে পদ্মা সেতু হয়ে আংশিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ পথে পুরোপুরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী ও খুলনা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে।

রেললাইনে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ‘বাড়ির কাছেই রেললাইন। বান্ধবীরা মিলে এখানে এসেছি। একটু সময় কাটানো ও ছবি তোলার জন্য আসা। রেললাইনে ঝুঁকি আছে, তারপরও অনেকেই এখানে ঘুরতে আসে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় রেললাইন নতুন। এ কারণে মানুষের কৌতূহলও বেশি। মাঝেমধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়েও স্টেশনে ঘুরতে আসি। তবে ট্রেন আসার সময় দূরত্ব বজায় রাখি। প্রথম দিকে শিবচরের পাঁচ্চর এলাকায় রেললাইনে ছবি তুলতে গিয়ে কয়েকজন মারা গেছেন। একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুও হয়েছিল।’

শিবচর-ভাঙ্গা রেলপথে দায়িত্ব পালনকারী রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক নাসির উদ্দিন বলেন, প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হয়। মানুষের অসচেতনতার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। বিকেল হলেই অনেকে রেললাইনে আড্ডা দেন, হাঁটাহাঁটি করেন। অনেকেই ট্রেনের সময়সূচি জানেন না। আবার ট্রেন আসতে দেখেও কেউ কেউ রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। ট্রেনের গতি সম্পর্কেও অনেকের ধারণা নেই। এসব কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে।

শিবচর স্টেশনের মাস্টার মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘এই রেলপথটি খুবই গতিশীল। এখানে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে মানুষের হাঁটাহাঁটি বন্ধ করতে হবে। মানুষের অসচেতনতার কারণেই প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। স্টেশনের আশপাশে দর্শনার্থীরা এলে আমরা তাঁদের সচেতন করার চেষ্টা করি।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনে মানুষের অবাধ বিচরণ বন্ধে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয়দেরও রেললাইনে হাঁটাহাঁটি, আড্ডা ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। তা না হলে বিনোদনের জন্য রেললাইনে আসা মানুষের ভিড় আরও প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভর ফটিকছড়ির প্রতিষ্ঠান, গ্রিডে যাবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪০ অপরাহ্ণ
সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভর ফটিকছড়ির প্রতিষ্ঠান, গ্রিডে যাবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বাড়ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের মালিকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার।

ফটিকছড়ির আল মাহাদুল ইসলামি বালক-বালিকা মাদরাসায় আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হতো। বছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তবে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদরাসার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর বিদ্যুৎ বিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

মাদরাসাটির হেফজ ও এতিমখানায় প্রায় ৯৫০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক ভবন, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় নিয়মিত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবাসিক হওয়ায় দিন-রাত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা সাশ্রয় হওয়ায় বছরে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় কমছে। সে হিসাবে প্রায় ৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাদরাসার সহকারী পরিচালক হাফেজ মো. এমদাদ বলেন, আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতো। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পর বিল প্রায় শূন্যে নেমেছে। এতে নিয়মিত ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও আবাসিক কার্যক্রমও নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

শুধু মাদরাসা নয়, ফটিকছড়ির আবাসিক ভবনেও বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। উপজেলার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এক প্রবাসীর ছয়তলা ভবনের ছাদে সাড়ে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভবনটির বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ কিলোওয়াট। বাতি, ফ্যান, ২৬টি সিসি ক্যামেরা, লিফট ও পানির মোটর চালানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।

ভবনের মালিক মো. আলম বলেন, সৌর প্যানেল স্থাপনের পর বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ ফটিকছড়ি জোনাল কার্যালয়ের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাসার শামছুদ্দিন আহম্মদ বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিং কার্যকর একটি পদ্ধতি। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে তা নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, বড় ভবন ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে অব্যবহৃত জায়গাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় এ ধরনের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৭ অপরাহ্ণ
ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নাটোরসহ চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয়, বিল, নদী ও ফসলের মাঠে বাড়তে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবছর শীত মৌসুমে এসব এলাকায় পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। তবে পাখির এই আগমনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির অসাধু শিকারি। ফাঁদ, জাল, বিষটোপ ও এয়ারগান ব্যবহার করে নির্বিচারে পাখি শিকার ও বিক্রি চলছে। এতে দিন দিন কমছে পাখির সংখ্যা, হুমকিতে পড়ছে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।

শীতকালে অতিথি ও দেশীয় পাখি শিকার এবং কেনাবেচা সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকার করছে চক্রটি। স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে শিকারিদের কারাদণ্ড, জরিমানা এবং পাখি উদ্ধার করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এ অবৈধ কর্মকাণ্ড।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং লালপুর উপজেলার পদ্মাচরে শীতের শুরু থেকেই ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার করা হয়। পরে এসব পাখি স্থানীয় হাট-বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও চায়ের দোকানে গোপনে বিক্রি করা হয়। পাখির চাহিদা থাকায় শিকারিরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

গত শনিবার (৩ অক্টোবর) থেকে সোমবার পর্যন্ত চলনবিল ও হালতিবিল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ বা ‘কিল্লাঘর’ তৈরি করা হয়েছে। এসব ফাঁদে একটি জীবন্ত পাখিকে আটকে রেখে তার ডাকের মাধ্যমে অন্য পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। পরে জালে ধরা পড়া পাখি খাঁচায় বন্দি করে বিক্রি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিকারিরা কখনো কখনো ধরা পড়া পাখির চোখ অন্ধ করে দেয়। আবার কোনো পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাখিটি ছটফট ও ডাকাডাকি করলে আশপাশের অন্য পাখি কাছে আসে এবং জালে আটকা পড়ে।

চলতি সপ্তাহে সিংড়া উপজেলার পাটশাঐল মৌজার ধানক্ষেতে কয়েকজন শিকারিকে বড় পাতার ফাঁদ ও টোপ হিসেবে ব্যবহৃত পাখি নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে প্রতি জোড়া পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। এক শিকারি জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে শখের বশে পাখি শিকার করছেন। প্রতিদিন ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় হয় বলেও জানান তিনি।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির বিভিন্ন অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বক, ৭৩৯টি ঘুঘু, ১০৫টি শামুকখোল, ২২০টি টিয়া, ১৭১টি শালিক, ৮৫টি পাতি সরালি, ৫৫টি ডাহুক, ৩৫০টি চাকলা, ৩০টি মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পেঁচা, মদনটাক, হিমালয় গৃধিনী শকুন, পানকৌড়ি ও হটটিটিসহ বিভিন্ন বিরল প্রাণীও উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাখি শিকারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, ৪২ জনকে জরিমানা এবং ৭২ জনের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি এয়ারগান জব্দ, ১৬০টি কিল্লাঘর ফাঁদ ধ্বংস এবং প্রায় ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১০টি বাটুল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে, আবার কিছু পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি জানান, ২০১২ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ (রাজশাহী বিভাগ) থেকে লাইসেন্স নিয়ে সংগঠনটি পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করছে।

সিংড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। শনিবার চলনবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন শিকারিকে একদিন করে কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় অর্ধশতাধিক বক পাখি অবমুক্ত এবং ১০টি কিল্লাঘরের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়।

রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার সম্পূর্ণ অবৈধ। বন বিভাগ সচেতনতামূলক প্রচার, নিয়মিত টহল, মোবাইল কোর্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেমিনার ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াত বলেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনগুলোকে জলাশয় ও পাখির আবাসস্থলে নিয়মিত নজরদারি এবং পাখি কেনাবেচা বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই চলনবিলকে দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাজারে শিকার করা পাখি কেনা থেকে বিরত থাকা এবং কোথাও পাখি শিকার বা বিক্রি হতে দেখলে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বন বিভাগকে জানানো প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি