দৃষ্টিহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে সুরের আলোয় কাজল মিত্র
জন্ম থেকেই চোখে আলো নেই। পৃথিবীর রং, প্রিয়জনের মুখ কিংবা ভোরের সূর্য—কোনোটিই দেখা হয়নি কখনো। তবে দৃষ্টিহীনতা থামাতে পারেনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম শাকপুরা গ্রামের কাজল মিত্রকে। গানকে অবলম্বন করে জীবনের ৫৫ বছর পার করেছেন তিনি। এখনো হারমোনিয়াম আর কণ্ঠের সুরেই চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার।
১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া কাজল মিত্র পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই। জন্মের পরই তার দৃষ্টিহীনতার বিষয়টি বুঝতে পারেন পরিবারের সদস্যরা। ছেলের চোখের আলো ফেরাতে বাবা-মা দেশের বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে ছুটেছেন, এমনকি দেশের বাইরেও চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু কোনো চেষ্টাতেই দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসেনি।
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগও হয়নি তার। বইয়ের অক্ষর পড়া কিংবা খাতায় নিজের নাম লেখার অভিজ্ঞতা নেই। তবে শৈশব থেকেই তার কণ্ঠে ছিল অসাধারণ সুরের মায়া।
কাজলের বয়স যখন ১১-১২ বছর, তখন বাড়ির ঘাটের পাশে আমগাছের নিচে বসে গান গাইছিলেন তিনি। সে সময় পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন সংগীতশিল্পী লক্ষ্মীপদ আচার্য। শিশুটির কণ্ঠ শুনে তিনি থেমে যান। কাজলের গানের প্রতিভা বুঝতে পেরে তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং সংগীতের তালিমের ব্যবস্থা করেন।
এরপর একে একে বিভিন্ন গুরুর কাছে গান শেখেন কাজল মিত্র। ধীরে ধীরে গান হয়ে ওঠে তার পরিচয়, জীবিকা ও বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে হারমোনিয়াম হাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান গেয়েছেন তিনি।
রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লালনগীতি, আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও ভক্তিমূলক গানের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও গেয়ে থাকেন কাজল। নিজের কিছু গান লিখে তাতে সুরও দিয়েছেন।
তবে দীর্ঘ সংগীতজীবনে তার কিছু স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ। ভালো মানের একটি হারমোনিয়াম কেনা এবং নিজের গাওয়া গান নিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশের ইচ্ছা রয়েছে তার। সীমিত আয়ের সংসারে সেই সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি।
বয়সের সঙ্গে এখন শরীরও আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না। নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যেও গানের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। সুযোগ পেলেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসেন। আঙুলের ছোঁয়ায় যন্ত্র থেকে ভেসে আসে সুর, আর সেই সুরেই যেন ফিরে পান জীবনের চেনা ছন্দ।
কাজল মিত্রের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে একটি দোকানে চাকরি করেন। পরিবারের সীমিত আয়ে তার গানের উপার্জনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বয়স ও অসুস্থতা বাড়লেও জীবিকার তাগিদে গানকে আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি।
চোখে পৃথিবীর আলো না দেখলেও সুরের ভুবনে কাজল মিত্রের পথচলা থামেনি। যে গান একদিন আমগাছের নিচে বসা শিশুটির কণ্ঠ শুনে এক সংগীতশিল্পীকে থামিয়ে দিয়েছিল, সেই গানই আজও তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
চোখের আলো না থাকলেও সুরের আলোয় পথ চলছেন কাজল মিত্র। তার স্বপ্ন এখনো—একটি ভালো হারমোনিয়াম, নিজের গানের একটি অ্যালবাম এবং জীবনের বাকি সময়টুকু সংগীতের সঙ্গেই কাটিয়ে দেওয়া।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array