আড়াল থেকে কি ফের সংগঠিত হচ্ছেন নাথান বম?
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বমকে ঘিরে আবারও বাড়ছে আলোচনা। সংগঠনটির ইউনিফর্ম তৈরির কাজে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফের তৎপরতা বাড়ার তথ্য পাওয়ায় নতুন করে সতর্ক হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাথান বম দেশের বাইরে অবস্থান করেও সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কি না, অর্থের জোগান সচল করার চেষ্টা চলছে কি না এবং এর পেছনে অন্য কোনো পক্ষের ভূমিকা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
- পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফের তৎপরতা বাড়ার তথ্য
- নতুন করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টার অভিযোগ
- সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
গত ৮ অক্টোবর নাথান বমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে সিআইডি। মামলার এজাহার অনুযায়ী, কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির কাপড় ও সেলাইয়ের কাজে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মামলায় নাথান বমকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং সম্ভাব্য যোগসাজশের তথ্য অনুসন্ধান করছেন।
পোশাক তৈরির সূত্র ধরে আর্থিক তদন্ত
কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির বিষয়টি সামনে আসে ২০২৫ সালের ১৮ মে। ওই রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে পোশাক তৈরির কাজে জড়িত একজনকে আটক করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হালিশহরের ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার একটি গোডাউন ও একটি পোশাক কারখানা থেকে ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট পোশাক জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানে নামে সিআইডি।
এজাহারে বলা হয়েছে, ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করে লেনদেনের যোগসূত্র খোঁজা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মতিউর রহমান ও তৌহিদুল ইসলাম।
মিজোরামে অবস্থান, যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ
পুলিশ সূত্রের দাবি, নাথান বম বর্তমানে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের আইজলে অবস্থান করছেন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিনি আত্মগোপনে যান। প্রথমে মিয়ানমারের মংডুতে অবস্থান করলেও পরে মিজোরামে চলে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সেখানে তাঁর উপদেষ্টা পিংলিয়ান জুং বমও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, দেশের বাইরে থেকেও নাথান বম কেএনএফের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন। সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় কিংবা অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার ইডেনপাড়ার বাসিন্দা নাথান বম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ২০০৮ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একই বছর তিনি কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে একটি উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কেএনএফের নেতৃত্বে আসেন। ২০১৮ সালে বান্দরবান আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। ২০২২ সালের মে মাস থেকে কেএনএফের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে সংগঠনটিকে ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ে।
পাহাড়ে নজরদারি, অর্থের উৎস নিয়ে উদ্বেগ
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকায় কেএনএফের তৎপরতা নিয়ে সম্প্রতি নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে সংগঠনটি যেন নতুন করে সংগঠিত হতে না পারে, সে জন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়।
সংগঠনটির অর্থ সংগ্রহের সম্ভাব্য পথ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পুলিশের দাবি, অতীতে বিভিন্ন এনজিও ও সমর্থক গোষ্ঠীর কাছ থেকে রসিদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে তথ্য পেয়েছে তারা।
ইন্টারপোলের রেড নোটিসের উদ্যোগ
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নাথান বমকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ আগে থেকেই ছিল। নতুন করে তাঁকে ঘিরে আলোচনা শুরু হওয়ায় রেড নোটিস জারির বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হচ্ছে।বান্দরবানের পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানিয়েছেন, কেএনএফের বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্র লালজানের বম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কালের আলো/আরআই/এমকে





আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]